চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

’মোড়ক উন্মোচন’ এবং টিমুনী খানের তেত্রিশ বছর

বাঙালির সপ্তম ঋতু (পর্ব-১৮)

তেত্রিশ বছর কাটছে। কারো কথা রাখার কথা ছিল না। এভাবেই চলার কথা ছিল দিন। বহু মানুষ তাকে দেখছে তেত্রিশ বছর ধরে। নবীন লেখকের কাছে তার মুখের বাক্যগুলো প্রথম চেনা আতশবাজির মতো।

নিজের বইয়ের মোড়ক খুলতে দাঁড়িয়ে অনেকেরই অন্যরকম শিহরণ ও হৃদস্পন্দন থাকে। অনেকে আবেগ ঢেলে কত কথা বলেন। কেউ জীবনের প্রথম বক্তৃতা হিসেবে অনলবর্ষি এক ভাষণ দিয়ে ফেলেন। তার সবকিছুই সুন্দর ভাঁজ করে একই মাপে সপ্রশংস চিত্তে কেটে একটি সুন্দর আকার দিয়ে দেন টিমুনী খান। অন্য কিছু দিয়ে কাটেন না। কাটেন মুখের কথা দিয়ে। হাসি হাসি মুখে থাকে কিঞ্চিৎ কঠোরতাও। একই কাজ করতে করতে এমন কাজী হয়ে উঠেছেন, নিজে ঘুমিয়ে পড়লেও মুখই যেন ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করে যায়। কোনোদিন গলা বেশি চড়ে যায়নি। কোনোদিন গলা নামেনি এতটুকু। ঠিকঠাক মাঝারি চালের বাক্য তৈরি করে ছড়িয়ে দিচ্ছেন একই পাণ্ডুলিপি একই সুরে নিয়মিত পাঠের মতো।

Reneta June

যার বই বের হয়নি, বইমেলায় নতুন এসেছেন। মোড়ক উন্মোচনের নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়েছেন। একটি মোড়ক উন্মোচন পর্ব দেখেছেন, তার মন আটকে যাবে নতুন বই প্রকাশের নেশায়। কয়েক মিনিটের বিশেষণসমৃদ্ধ ভাষায় টিমুনী খানের উপস্থাপনার প্রেমে পড়ে যাবে সে। মনে হবে নিজের একটি বই নিয়ে এসে এভাবে দাঁড়াই। আর টিমুনী খান বলতে থাকুক আমার মনের কথা। আমাকে উপস্থিতদের মাঝে উঁচু করে ধরুক।

বিজ্ঞাপন

বইমেলার এক আলাদা আকর্ষণ মোড়ক উন্মোচন। ১৯৮৯ সাল থেকে বইমেলায় মোড়ক উন্মোচনের বিষয়টি চালু হয়েছে। প্রথম থেকেই এই পর্বে উপস্স্থাপনার কাজটি টিমুনী খান করছেন। সেই হিসেবেই তেত্রিশ বছর। এটি বিশেষ এক ধরণের কাজ। প্রকাশক পাঠক ক্রেতার পরও একজন টিমুনী খান অনেক লেখকের জন্য অনেক কিছু। আলাদা এক শক্তিদায়ক চরিত্র। খুব মাপা কথা। দারুণ স্মরণশক্তি। দশ বছর আগেও যদি আপনার সঙ্গে বাতচিৎ হয়ে থাকে, দেখবেন সামনে গেলে বিষয়বস্তুসহ তথ্য হাজির করে দেবেন। মুখে হাসি এনে অথবা না এনে এক সরস বাক্য বলে দেবেন, আপনি ফিরে যাবেন দশ বছর পেছনে।

মোড়ক উন্মোচন পর্বের উপস্থাপনের সময় টিমুনী খান বই ও লেখকের ধরণ বুঝে কিছু লোভনীয় বিশেষণের প্রবাহ ছাড়েন, চুলচেরা মাপকাঠিতে ফেলতে গেলে হবে না। লেখক সেই প্রবাহে কিছু সময়ের জন্য হলেও হারিয়ে যান। এ এক অন্যরকম স্বপ্নপ্রবাহ।

বছরের অন্যান্য সময় টিমুনী খানকে দেখা যায় না। তিনি একজন কবি, ছড়াকার ও সংগঠক। সাংবাদিকতাও করেন। বইমেলাকেন্দ্রিক মানুষগুলো তাকে বইমেলায় দেখেন। বোধ করি তেত্রিশ বছর ধরে একই চেহারায়, একই চাঞ্চল্যে দেখা যাচ্ছে তাকে। পরিবর্তন কিছু তো হয়েছেই। কিন্তু সামগ্রিক পরিবর্তনের সঙ্গে সেটি মানিয়ে গেছে।

কিছু কিছু বিষয় থাকে পাল্টে গেলে অন্যরকম লাগে। সময়ের সঙ্গে সেসব জিনিসের পরিবর্তন না হওয়াই ভালো। যখন বইমেলায় গণমাধ্যমের ভীড় ছিল না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছিল না। তখন টিমুনী খানের উপস্থাপনা চিত্তাকর্ষক ছিল। নির্ভুলভাবে বড় বড় বাক্য উচ্চশব্দে ছুঁড়ে দেয়ার আলাদা মাত্রা ছিল। এখন চারদিকে কথা আর কথা। বইমেলা থেকে কতজন কতকিছু বলছেন, উপস্থাপন করছেন, মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, এই সময়ে টিমুনী খানের বিশেষত্ব বিশেষভাবে আঁকতে পারবে না নতুনেরা। তাদের কাছে অন্যরকম লাগবে। কিন্তু কাজটি এমনই হওয়া উচিৎ। এটি এক ঐতিহ্যের মতো।

মোড়ক উন্মোচনে গড়সাপটা সব লেখককে গভীর ব্যঞ্জনায় সম্মানিত করা উচিৎ। কারণ, এটি তার গ্রন্থের উন্মোচন পর্ব। এর গভীরতা টিমুনী খান যেভাবে বোঝেন, অন্য কেউ তা বোধ করি বুঝবে না।