চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মার্গারিটা মামুনের পর ত্রিপুরার হবু মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাশিয়ান নাগরিক মার্গারিটা মামুন রিও অলিম্পিকে রাশিয়ার হয়ে অংশ নিয়ে রিদমিক জিমন্যাস্টিকসের অল-অ্যারাউন্ড ইভেন্টে স্বর্ণ জিতেছিলেন। ওই স্বর্ণ জয়ের আনন্দ রাশিয়ার মতো বাংলাদেশেও এসে পৌঁছেছিল। তার বাবা আবদুল্লাহ আল মামুন তো এই দেশের রাজশাহীরই ছেলে। মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে সেই ১৯৮৩ সালে চলে গিয়েছিলেন রাশিয়ায়। তারপর মস্কোতেই রাশিয়ান কন্যা অ্যানাকে বিয়ে করে সংসার পাতেন। সেখানে থিতু হলেও কিন্তু বাংলাদেশকে ভোলেননি তিনি। বড় মেয়ে মার্গারিটা আর ছোট ছেলে ফিলিপ আল মামুনকে নিয়ে এসেছিলেন গ্রামের বাড়িতে। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক-টুইটারের কল্যাণে মার্গারিটা মামুনের পিতৃ পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার পরে দেশের সবাই সেই আনন্দের ভাগীদার হয়ে ওঠেন।

২০১৪ ও ২০১৫ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে মার্গারিটা রৌপ্য পদক পাওয়াতে রিওতে কী করেন, তা নিয়ে আলাদা নজর ছিল সবার। স্বর্ণপদক পাবার পরে রাশান মিডিয়াতেই জিমন্যাস্টিকসের এই স্বর্ণকন্যাকে ‘বাংলার বাঘিনী’ পদবি দেয়া হয়, যা জানাজানি হওয়ার পর বাংলাদেশেও মার্গারিটার শুভাকাঙ্ক্ষীর সংখ্যা বেড়ে যায়। ফেসবুক ফ্যানপেজে শুভেচ্ছার বন্যা বয়ে যায়। টুইটার, ইনস্টাগ্রামেও বাংলাদেশিরা এখন মার্গারিটা মামুনকে ফলো করছেন।

তবে আরেকটি তথ্য বাংলাদেশি অনেকের মন খারাপের কারণ হয়েছিল। তা হচ্ছে, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় মার্গারিটা বাংলাদেশে এসেছিলেন জুনিয়র লেভেলে খেলতে, কিন্তু ঢাকায় জিমন্যাস্টিকের অবকাঠামো থাকলেও রিদমিক জিমন্যাস্টের তেমন সুযোগ-সুবিধা নেই। তাই আবার মস্কোয় ফিরে যান মার্গারিটা।

এ তথ্য জানার পর অনেকে হাহুতাশ করেও নিজেদের মত প্রকাশ করেন সামাজিক মাধ্যমে। দেশের অবকাঠামোকে দায়ী করেন, সিস্টেমকে দায়ী করেন, অনেকে সম্ভাব্য একটি অলিম্পিক পদক হারানোর দু:খে ক্ষোভ প্রকাশও করেছেন। ষোলো কোটির দেশ হয়েও অলিম্পিকে পদক না পাওয়া একমাত্র দেশ হয়ে থাকার কষ্ট আরও বেড়েছিল এই খবরে।

এক ফেসবুক বন্ধু ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘এই মার্গারিটা দেশের হয়ে খেললে বেশিদূর যেতে পারতেন না। একটা দুইটা পদক পেলেও হয়তো কিছুদিন পর তার বাবা-মা তার বিয়ে দেয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠতেন। বিয়ের কয়েক বছর যেতে না যেতে ২/৩ বাচ্চার মা হতেন মার্গারিটা। ‘ আরেক বন্ধু লিখেছিলেন, ‘মার্গারিটা বাংলাদেশের হয়ে খেললে তার জিমন্যাস্টের পোশাক হয়ে উঠতো তার বড় বাধা।’

মার্গারিটার মতো আরেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ভারতীয় (ত্রিপুরা) নাগরিককে নিয়ে চলছে আলোচনা। তিনি ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ত্রিপুরা রাজ্যের সভাপতি বিপ্লব কুমার দেব। তিনি বাংলাদেশি বাবা-মায়ের সন্তান। তার দাদার বাড়ি চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার মেঘদাইর গ্রামে। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিপ্লব কুমার দেবের বাবা-মা ত্রিপুরা পাড়ি জমান। দেশ ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমানোর কয়েক মাসের মাথায় শরনার্থী হয়ে জন্মগ্রহণ করেন বিপ্লব। এরপর জীবন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

১৮ ফেব্রুয়ারি ত্রিপুরা বিধানসভার নির্বাচনে ৬০ আসনের মধ্যে তার তরুণ নেতৃত্বে বিজেপি ৪৩ আসনে জয়লাভ করে। তিনিও ত্রিপুরার বনমালিপুর আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী হবার দৌড়ে তিনিই এগিয়ে আছেন। বিজেপির কেন্দ্রীয় কমিটি আগামী বুধবার এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুরের মেঘদাইর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘মাস্টার বাড়ি’র কবিরাজ গোবিন্দ চন্দ্র দেবের নাতি বিপ্লব কুমার দেব। কবিরাজ গোবিন্দ চন্দ্র দেবের পারিবারিক সব অনুষ্ঠানেই তাদের আসা-যাওয়া রয়েছে। ২০১৬ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে থাকা দলটির ত্রিপুরা রাজ্যের সর্ব-কনিষ্ঠ সভাপতি নির্বাচিত হন। ত্রিপুরার রাজ্য সভাপতি হওয়ার কিছুদিন আগে চাচাতো ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন বিপ্লব। সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আসেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতও করেছিলেন।

মার্গারিটা মামুনের মতো সেই মাত্রায় না হলেও বিপ্লব কুমারকে নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে বেশ আগ্রহ দেখা গেছে। বিপ্লবের ছবি, তাকে নিয়ে সংবাদের লিংক শেয়ার করে ও এক-দুই লাইনে স্ট্যাটাসে অনেকেই তার শুভ কামনা করেছেন। প্রকাশ করেছেন স্বস্তি। বিষয়টি সিনেমায় দেখা মেলায় হারিয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যের অনেকবছর পরে মিলনের মতো আনন্দ রেশ মনে হয়েছে অনেকের কাছে।

বিপ্লব বাংলাদেশে থাকলে কী হতো? এ বিষয়েও অনেকে লিখছেন। এক বন্ধু ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের উত্তরাধিকারের রাজনীতিতে বিপ্লব কুমার দেব যদি বাংলাদেশেই থেকে যেত, তবে সে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হতে পারতো কিনা সন্দেহ থেকে যায়। এখানে চাকরির জন্য “কোটা” এবং রাজনীতিতে “উত্তরাধিকার” ব্যবস্থা পাকাপোক্ত অবস্থান করে নিয়েছে। সম্পদের সুষম বন্টন ও নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারপরও মিডিয়ার সাথে সুর মিলিয়ে বলতে হয় দেশ ও জাতি এগিয়ে যাচ্ছে।’

মার্গারিটা মামুন থেকে শুরু করে বিপ্লব কুমার দেবের জন্য দেশের মানুষের ভালোবাসাতে কোনো খাদ নেই, এটা যেমন সত্য; তেমনি দেশে থাকলে তাদের ওইসব সাফল্যের পরিণতি কী হতো, তা নিয়ে শঙ্কাও শতভাগ ঠিক বলে মনে হয়েছে।

প্রয়োজনীয় অবকাঠামো আর সুবিধা পেলে ১৬ কোটির এই দেশে অলিম্পিক পদক না পাবার দু:খ হয়তো অদূর ভবিষ্যতে কেটে যেতে পারে। তেমনি তৃণমূল (ভারতীয় তৃণমূল নয়) থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়ার সংস্কৃতিও গড়ে তোলা সম্ভব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক ধারা বজায় থাকলে। হয়তো অচিরেই সে ধারায় ফিরবে বাংলাদেশ, আশাবাদী হতে দোষ কী?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন