চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মমতা নিজেই এখন তার সমর্থকদের কাছে সংশয়ী চরিত্র

বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যখন জয়ের পরেও অপর দল থেকে জনপ্রতিনিধি ভাঙিয়ে আনেন, তখন সব থেকে যেটা প্রকট হয়ে ওঠে, সেটি হল, যে জনগণ তাঁকে বা তাঁর দলকে জেতালো, সেই জনগণের প্রতি সীমাহীন অনাস্থার বিষয়টি। এভাবে নির্দিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা স্বত্ত্বেও যদি অপর দলের জনপ্রতিনিধিদের ভাঙিয়ে আনা হয়, তাহলে এটাই প্রমাণ হয় যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার ঘটনাক্রমের ভিতরে নিশ্চয়ই কোনো জল মেশানো গল্প আছে। তা না হলে, এতো বিপুল গরিষ্ঠতা থাকা স্বত্ত্বেও কেন তাঁকে অপর দল থেকে জনপ্রতিনিধি ভাঙিয়ে আনতে হবে?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গত দশ বছরের কার্যক্রমের ভিতরে অপর দলের বিধায়ক ভাঙিয়ে আনার , কর্মী- সমর্থকদের ভাঙিয়ে আনার যে প্রবণতা চলেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এই বিষয়টিই খুব বড়ভাবে ফুটে উঠছে। ভারতে দলত্যাগ বিরোধী আইনের বর্তমান যে পরিকাঠামো রয়েছে, তাতে একজন দলত্যাগী বিধায়ক আইনসভার ভিতরে কোনো অবস্থাতেই স্বাধীন আচরণ করতে পারেন না। যে দলের পক্ষ থেকে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই দলের হুইপ মেনে চলতে তিনি সর্বতোভাবে বাধ্য থাকেন। তিনি যদি সেই দলের হুইপ অমান্য করে চলেন, সেক্ষেত্রে তাঁর আইনসভার সভ্যপদ বাতিল হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এইরকম একটা অবস্থার ভিতর দিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিজের দলে টেনে মানুষের কাছে নতুন করে কি বার্তা দিতে চান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? জনগণ যে বিপুল সমর্থন দিয়ে তাঁর দলের লোকেদের বিধায়ক করলেন, সেইসব মানুষদের প্রতি কি এতোটুকু আস্থা নেই মমতার? যার জন্যে তিনি বিরোধী দলগুলির থেকে নানা উপঢৌকনের ললিপপ দেখিয়ে বিধায়কদের নিজের দলভুক্ত করছেন?

নিজের দলের মানুষদের প্রতি আস্থা থাকলে কি অপর দল থেকে লোক ভাঙিয়ে আনার কোনো দরকার থাকে? যে মানুষেরা বিপুল জনসমর্থন দিয়ে তাঁর দলের প্রতিনিধিকে আইনসভাতে পাঠিয়েছেন, সেই মানুষদের আস্থার প্রতি অমর্যাদা প্রকাশ করা কি হয় না, অপর দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কার্যত বেআইনিভাবে নিজের দলের অন্তর্ভুক্ত করে? কাদের অন্তর্ভক্ত করা হচ্ছে? এইসব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দিনের আলোতে , প্রকাশ্যে নিজেদের দলগত অবস্থানটুকু পর্যন্ত প্রকাশ করতে পারছেন না। এইরকম মানুষদের নিজের দলের অন্তর্গত করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি রাজনৈতিক স্বচ্ছতার পরিচয় দিচ্ছেন? যে দলীয় সভ্যদের তিনি প্রকাশ্যে দলীয় সভ্য হিসেবে দেখাতেই পারছেন না, তেমন মানুষদের দলীয় সভ্য করে লাভ টা কি আছে? যে দলীয় সভ্যদের আইনসভার ভিতরে নিজের দলের সদস্য হিসেবেই তিনি তুলে ধরতে পারছেন না, সেই ব্যক্তিদের নিজের দলের অন্তর্গত করে নিজে বা নিজের দলের কাছে কোন ইতিবাচক বার্তা দিতে চাইছেন মমতা?
এই আস্থাহীনতার রাজনীতিকেই ‘ আস্থা’ র লেবেল সেঁটে মানুষের সামনে তুলে ধরার রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের মানুষদের সামনে দীর্ঘদিন ধরে করে চলেছেন মমতা। তিনি যখন বিরোধী নেত্রী ছিলেন, তখন ও এই রাজনীতিকেই একাংশের অবাম রাজনীতিক আর একাংশের সংবাদমাধ্যমকে সাথে করে নিজের রাজনীতির টি আর পি বাড়াতে করে গিয়েছেন তিনি। শাসক অবস্থাতেও তাঁর এই রাজনৈতিক পদচারণার ভিতরে এতোটুকু অদলবদল আমরা বিগত প্রায় দশ বছরে দেখতে পেলাম না।যে পুলিশ এবং আমলাবাহিনীর বিরুদ্ধে একদা মমতার দুরূহ অভিযোগ ছিল, একে একে সেইসব তথাকথিত অভিযুক্তদের মমতা তাঁর নিজের দলে শামিল করেছেন। মনীশ গুপ্ত থেকে সত্যজিৎ ব্যানার্জী– সেই ট্রাডিশন মমতা সমানে বয়ে নিয়ে চলেছেন।

বিজ্ঞাপন

মমতা বাম আমলে মহাকরণ দখল করতে চেয়ে তান্ডব চালিয়েছিলেন। সেই সময়ে বামফ্রন্ট সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব ছিলেন মনীষ গুপ্ত। সেই মহাকরণ অভিযানে পুলিশের গুলি চালনাকে ঘিরে মমতার দুস্তর অভিযোগ ছিল। সেইসব অভিযোগের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিলেন, তদানীন্তন স্বরাষ্ট্র সচিব মনীষ গুপ্ত। এই মনীষবাবুকেই কিন্তু ক্ষমতায় আসার আগে মমতা নিজ দলভুক্ত করেন। ২০১১ র বিধানসভার ভোটে এই মনীশবাবুর কাছেই কিন্তু সেই সময়ের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিলেন। বুদ্ধবাবুকে পরাজিত করে জেতা মনীশবাবুকে মমতা মন্ত্রী পর্যন্ত করেন। মনীশবাবুকে মন্ত্রী করা বা তাঁকে এতোখানি গুরুত্ব আরোপ করা ঘিরে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে প্রবল চাপান উতোর ছিল।।কিন্তু মমতা , সেইসব চাপান উতোরকে এতোটুকু মূল্য দেননি। যে মনীশবাবুর বিরুদ্ধে একটা সময়ে মমতা নিজের দলের উনিশজন বিশ্বস্ত কর্মীকে গুলি করে হত্যা করবার গুরুতর অভিযোগ করতেন, ক্ষমতায় আসবার লক্ষ্যে সেই মমতাই, সেই মনীশ গুপ্তকে নিজের দলের দুঃসময়ের নেতা, কর্মীদের থেকেও শতগুণ বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এই মনীশ গুপ্তই বিগত ২০১৬ সালের নির্বাচনে হেরে যান। তারপর মমতা তাঁকে রাজনৈতিক পুনর্বাসন দেন রাজ্যসভাতে পাঠিয়ে।

বিজ্ঞাপন

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি সত্যিই তাঁর দলের নেতা কর্মীদের আত্মত্যাগের প্রতি প্রকৃত অর্থে শ্রদ্ধাশীল হতেন, তাহলে কি তাঁর পক্ষে ২১ শে জুলাই গুলি চালানোর নির্দেশ যিনি দিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়, সেই মনীশ গুপ্তকে তৃণমূল কংগ্রেস দলের ভিতরে অতোখানি মর্যাদা দেওয়া সম্ভবপর হতো? নাকি, মমতা নিজের দলের কর্মীদের যূপকিষ্ঠে বলি দিয়ে তার বিনিময়ে নিজের রাজনৈতিক সাফল্য কিনেছেন? আজ পর্যন্ত বিশ্বের ইতিহাসে এমন কোনো আন্দোলনের কথা কি লিপিবদ্ধ আছে যেখানে, সংশ্লিষ্ট দলের নেতা, কর্মীদের গুলি করে হত্যার অভিযোগ যে সরকারি আমলার বিরুদ্ধে আছে, ক্ষমতায় আসার প্রাক মুহূর্তে সেই নেতাকেই মর্যাদা সহকারে, সেই দলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়? সেই দলের টিকিটে বিধায়ক করা হয়? মন্ত্রী করা হয়? হেরে গেলে আবার পিছনের দরজা দিয়ে রাজ্যসভাতে পাঠানো হয়? তাহলে কি মমতার সবটাই গট আপ খেলা ছিল? তাঁর ২১ শে জুলাই এর মহাকরণ অভিযানের সমস্ত কর্মকাণ্ড ছিল সাজানো? এই গোটা পর্যায়ক্রমকে তিনি নিজেদের রাজনৈতিক মাইলেজের সিঁড়ি হিসেবেই কেবলমাত্র ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন? যে সমস্ত আমলাদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছেন বলে, মমতা দাবি করেন, কার্যত সেইসব আমলাদেরই হয় ক্ষমতায় আসার আগে, নয় তো বা ক্ষমতায় এসে মমতা তাঁর নিজের দলের অন্তর্গত করেছেন। মনীশ গুপ্ত থেকে রচপাল সিং কিংবা হালের নন্দীগ্রাম পর্ব ঘিরে বিতর্কিত সত্যজিৎ বাবু, প্রত্যেকের সম্পর্কে একই কথা বলতে হয়।

কোনো রাজনৈতিক দল যদি তার দুরবস্থার সময়ে যাদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছে বলে মনে করে, সুসময় আসার প্রাক মুহূর্ত থেকেই, সেইসব মানুষজনের প্রতি সহৃদয় হয়ে ওঠে, তাহলে কি মানুষের কাছে, বিশেষ করে দলের কর্মী, সমর্থকদের কাছে সেইদলের কোনো ইতিবাচক ক্যারিশমা তৈরি হতে পারে? দলের দুর্দিনের কর্মী, যারা সেইসব প্রভাবশালীদের হাতে নির্যাতিত বলে দলের সর্বস্তর থেকে প্রচার চালানো হয়েছে, সেইসব তথাকথিত নির্যাতনকারীরা যদি দল ক্ষমতায় আসার প্রাক মুহূর্ত থেকেই দল নেত্রীর দ্বারা বিশেষভাবে সম্মানিত হতে থাকে, রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হতে থাকে, তাহলে , সেইদলের কর্মকর্তাদের সম্পর্কে দলের দুঃসময়ের নেতা, কর্মীদের কি প্রকৃতপক্ষে এতোটুকু শ্রদ্ধাপূর্ণ মানসিকতা অক্ষুন্ন থাকতে পারে? সেটা যে অক্ষুন্ন নেই, তা কিন্তু ক্রমশঃ পরিস্কার হতে শুরু করেছে।যে নন্দীগ্রাম পর্ব ঘিরে মমতার বিস্তর অভিযোগ, সেই কালপর্বে অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারকে তিনি বিশেষ মর্যাদা দিয়ে নিজের দলের অন্তর্গত করলেন। এই বিষয়টি কি মমতার দলের যাঁরা সত্যিকারের আত্মনিবেদিত কর্মী, সমর্থক, তাঁদের পক্ষে মেনে নেওয়া আদৌ সম্ভবপর হবে?মমতার দলের কর্মী , সমর্থকদের কাছে এই প্রশ্ন ই কি তীব্র হয়ে উঠবে না যে, মমতা কি গোটা নন্দীগ্রাম পর্বে কোনো বোঝাপড়ার খেলা খেলেছিলেন? তা না হলে, সেইদিন, তিনি নিজে, বা তাঁর দলের প্রথম সারির নেতারা, যে সমস্ত পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে দলীয় কর্মী, সমর্থকদের হত্যা, নির্যাতনের অভিযোগ এনেছিলেন, সেইসমস্ত অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারদের কেন ২০২১ এর বিধানসভা ভোটের আগে মমতা তাঁর দল , তৃণমূল কংগ্রেসের অন্তর্ভূক্ত করছেন?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)