চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

দ্বিতীয় পর্ব

চার
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে নিয়ে এসেছিলেন। সোহরাওয়ার্দী ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনে বিপক্ষে অবদান নিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বিবৃতি দেন। সোহরাওয়ার্দী এই অবস্থানে দৃঢ় থাকলে ভাষা আন্দোলনে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারত (সূত্র: একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে আন্তর্জাতিক- ড. মোহাম্মদ হান্নান, পৃ. ৫৩)। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দীর এই মত পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তার সমর্থন আদায় করেন।

এই প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সেসময় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাষা সংক্রান্ত বিবৃতি প্রকাশিত হওয়ার পর আমরা বেশ অসুবিধায় পড়ি। তাই ওই বছর জুন মাসে আমি তার সঙ্গে দেখা করার জন্য করাচি যাই এবং তার কাছে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বাংলার দাবির সমর্থনে তাকে একটি বিবৃতি দিতে বলি।’ (তথ্যসূত্র : পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি- ৩য় খণ্ড, বদরুদ্দীন উমর, পৃষ্ঠা-৩৯৬)। বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষার প্রতি গভীর দরদ অসীম রাজনৈতিক প্রত্যয়ের ফলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে সমর্থন করে বিবৃতি দেন। ওই বিবৃতিটি ১৯৫২ সালের ২৯ জুন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৫২ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় মওলানা ভাসানীর একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়।

বিবৃতিতে ভাসানী বলেন, ‘বাংলা ভাষার পক্ষে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মত পরিবর্তনে মুজিব সক্ষম না হলে শুধু ভাষা আন্দোলন নয়- আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ত।’ বঙ্গবন্ধুর মতো দূরদর্শী নেতার পক্ষেই এটা সম্ভব ছিল। বাংলা ভাষা এবং ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর এই অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

পাঁচ
১৯৫৪ সালে বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫৬ সালের আইন পরিষদের অধিবেশনে সংসদের কার্যসুচি বাংলায় লিপিবদ্ধ করার আহবান জানান। একই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারির অধিবেসনে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী জানান। ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি বলেছেন, ‘আমার দল ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকেই সকল সরকারি অফিস আদালত ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চালু হবে।’ ১৯৭২ সালে দেশের প্রথম সংবিধান রচনা করা হয়। এই সংবিধানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়া হয়। ১৯৭৪ সালে ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের অধিবেশনে তিনি বাংলায় ভাষণ দেন। তিনি ওই বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, মাননীয় সভাপতি, আজ এই মহামহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সাথে আমি এই জন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগিদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এই পরিষদের প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন।’

বিজ্ঞাপন

পৃথিবীর বরেণ্য নেতৃবৃন্দ স্বদেশের ভাষাপ্রীতি দেখে বিস্মিত হয়েছেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিনন্দিত করেছেন। এর বহু আগেও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। ১৯৫২ সালে চীনে আয়োজিত আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে তিনি বাংলায় বক্তব্য রাখেন।

১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ অফিস-আদালতে বাংলা ব্যবহারের নির্দেশ জারি করেন। ওই আদেশে বলা হয়, দেশ স্বাধীনের দীর্ঘ তিনবছর পরেও বাংলাদেশের বাঙালি কর্মচারীরা ইংরেজি ভাষায় নথি লিখবেন সেটা অসহনীয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার বাস্তবায়ন চাইতেন।

ছয়
বাংলা, বাঙালি আর বাংলাদেশ- এই তিন ছিল বঙ্গবন্ধুর চির আরাধ্য। তিনি তার পুরোটা জীবন জুড়ে কাজে কর্মে, চিন্তাভাবনায় এর প্রমাণ রেখে গেছেন। বিশ্বের বুকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে নোবেল পেয়ে বাংলা ভাষাকে প্রথমবারের মতো মর্যাদার আসনে বসিয়েছিলেন আর সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষাকে এক গৌরবের আসনে বসিয়ে দেন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন