চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ব্যাংক পরিচয়ে ৩শ’ কোটি টাকা আত্মসাৎ, কানাডায় পাচার

আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ক্রেডিট সোসাইটি লিমিটেডের সঙ্গে ‘ব্যাংক’ শব্দটি ব্যবহার করে সমিতির কার্যক্রম পরিচালনা করে, মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে  ৩শ’ কোটি টাকা প্রতারণা করা হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

এছাড়াও প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান কানাডায় অবস্থানরত তার দুই ছেলের কাছে প্রায় শতকোটি টাকা পাচার করেছেন বলেও প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে সিআইডি।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে রাজধানীর বংশাল থানায় করা অর্থ আত্মসাৎ ও প্রাণনাশের হুমকির এক মামলায় চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলামকে বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার করে সিআইডি। গ্রেপ্তারের পর আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানা যায়।

রোববার সিআইডির প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম এসব কথা বলেন।

মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘‘আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ক্রেডিট সোসাইটি লিমিটেডের কার্যক্রম ১৯৮৪ সালে শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ছিল সম্পূর্ণ এমএলএম কোম্পানির মতো। এছাড়া ব্যাংক হিসেবে এই প্রতিষ্ঠনের কোনো স্বীকৃতি নেই। কিন্তু নামের শেষে ব্যাংক শব্দটি ব্যবহার করে সমিতির কার্যক্রম পরিচালনা করে, মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে ৩শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।’’

তিনি বলেন, এই ৩শ’ কোটি টাকা প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোঃ তাজুল ইসলামের ৫০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়। পরে এসব অ্যাকাউন্ট থেকে অনলাইনে ট্রান্সফার করে টাকা স্ত্রী ও তিন ছেলের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন তিনি। এর মধ্যে তার দুই ছেলে কানাডা থাকেন, যাদের কাছে ১শ’ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এছাড়া এসব টাকার কিছু অংশ দিয়ে তিনি দেশের বিভিন্ন এলাকায় মার্কেট ও জমি ক্রয় করেন।’

গ্রাহকরা কেন এমন প্রতিষ্ঠানে টাকা জমা রাখতেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১২ শতাংশ সুদ ও ১৮ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার কথা বলে ১৬০টি শাখা থেকে টাকা নেওয়া হতো গ্রাহকদের কাছ থেকে। পরে টাকা দেওয়ার সময় হলে, গ্রাহকরা টাকা চাইলে তাদের আজ নয় কাল করে সময় দেওয়া হতো। এক পর্যায়ে গ্রাহকরা না মানলে তাদের হুমকিও দেওয়া হতো।

বিজ্ঞাপন

এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ঘটনায় তাজুল ইসলামের স্ত্রী ও তিন ছেলে জড়িত। তারাও মামলার আসামি। এছাড়া এ বিষয়ে মানি লন্ডারিং আইনেও একটি মামলা করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছি।

সিআইডি জানায়, এমএলএম কোম্পানি হয়েও ব্যাংক বলে ১১ হাজার ৪২৫ জন গ্রাহকের থেকে ৩শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম। এছাড়া অনুমোদিত ২৬টি শাখার জায়গায় সমগ্র বাংলাদেশে ১৬০টি শাখা অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়।

ব্যাংকের হিসাব বিবরণী এবং স্টেটমেন্ট পর্যালোচনা করে সিআইডি জানতে পেরেছে, আসামিরা গ্রাহকদের জমাকৃত আনুমানিক ৩শ’ কোটি টাকা নগদ ও অনলাইনে ট্রান্সফার করে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এম তাজুল ইসলাম বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবে স্থানান্তর করে নিজ নামে, স্ত্রী আফরোজা পারভীন এবং ছেলে সাজ্জাদুল ইসলাম তানভীরের পরিচালিত সাউদি বাংলা প্রপার্টিজ লি., তানভীর এন্টারপ্রাইজ ও তানভীর অটো ব্রিক লিমিটেডের হিসাবে স্থানান্তর করে।

‘এছাড়াও প্রতিষ্ঠানের অন্যান্যদের নামে চেক ইস্যু, ব্যবস্থাপনা কমিটির বর্তমান ও সাবেক সদস্য ও কর্মকর্তাদের যোগসাজসে নগদে উক্ত টাকা উত্তোলন করে সংঘবদ্ধ প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করে বিভিন্ন ব্যাংকে হস্তান্তর করে।’

সিআইডি জানায়, এম তাজুল ইসলাম ১৯৮৪ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮৪ সালে আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ক্রেডিট সোসাইটি লিমিটেডেরও কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৫ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে যুক্ত হন তাজুল ইসলাম। সমবায় অধিদপ্তর থেকে প্রতিষ্ঠানটির ২৬টি শাখার অনুমোদন থাকলেও সারাদেশে তারা ১৬০টি শাখা পরিচালনা করছেন। এম তাজুল ইসলামের নিয়োগকৃত ৮০টি শাখার ব্যবস্থাপক ও কর্মকর্তারা অধিকহারে মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে নগদ আমানত সংগ্রহ করেন। জমাকৃত টাকার মেয়াদ পূর্তিতে গ্রাহকের আসল টাকা ও লভ্যাংশ ফেরত চাইতে গেলে আজ দেবে কাল দেবে বলে কালক্ষেপণ ও তালবাহানা করেন।

এর আগে ২০১৭ সালে এম তাজুল ইসলামসহ ব্যবস্থাপনা কমিটির বর্তমান ও সাবেক ৩১ জন সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থ তছরুপ ও সমিতির অর্থ আত্মসাতের কারণে সমবায় অধিদপ্তর সমবায় আইনের ৪৯ ধারা মোতাবেক ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে জরিমানার ওই অর্থ আজও সমিতির কোষাগারে জমা দেয়া হয়নি।

আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ক্রেডিট সোসাইটি লিমিটেড এর চেয়ারম্যান এম তাজুল ইসলাম কানাডার গ্রিন কার্ডধারী এবং তার ছেলে ফারহাদুল ইসলাম ছাব্বির এবং রিয়াজুল ইসলাম রিজভী উভয়ই ২০১১ সাল হতে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

Bellow Post-Green View