চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বীর উত্তম কাদের সিদ্দিকীর কাছে রব-মান্না প্রিয় কেন?

৫ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেনানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহধন্য ‘বঙ্গবীর’ খ্যাত কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম সব জল্পনা ও কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন। তার যোগদান অনুষ্ঠানে একপাশে বসা ছিলেন তার স্ত্রী নাসরিন সিদ্দিকী, অন্যপাশে ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজনৈতিক দল জাসদ প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম একজন আ স ম আব্দুর রবসহ অন্যান্যরা। বেশ কয়েক দিন ধরেই রাজনীতির মাঠে গুঞ্জন চলছিল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমকে নিয়ে। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে কোনদিকে অগ্রসর হবেন তিনি ঠিক সেটা বুঝা যাচ্ছিল না। তিনি কী বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দল আওয়ামী লীগের সাথে জোটবদ্ধ হবেন, নাকি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যাবেন-বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের দোদুল্যমানতা দৃশ্যায়িত হচ্ছিল।

আজ নয় কাল সিদ্ধান্ত জানাবেন-এভাবে সময়ক্ষেপন করছিলেন তিনি। কেন করছিলেন সেটা বোধ হয় কারো অজানা থাকার কথা নয়। তবে ৫ নভেম্বর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের জোটগত অবস্থান পরিষ্কার করেন। ৫ নভেম্বর গণমাধ্যমের ছবিতে দেখা যায়, জাসদের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা আ স ম রবের ডান হাতটি তিনি ধরে আছেন। হাস্যজ্জল ভঙ্গিতে আছেন আ স ম আব্দুর রব। যোগদান পর্বে কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম অনেক কথার ভিড়ে আরও বলেন, লড়াইয়ে জেতা আমার জন্য কোনো কঠিন কাজ নয়। আইনের সহায়তা করবেন কামাল হোসেন। আর লড়াই করব আমরা, যুদ্ধ করব আমরা। আমাদের হাতে যদি টিক্কা খান হেরে থাকে, ইয়াহিয়া খান হেরে থাকে, নিয়াজী যদি নতজানু হয়ে আত্মসমর্পণ করতে পারে, তাহলে আজকের দিনে যারা স্বৈরাচার সাজছেন তাদেরকেও আম্মসমর্পণ করতে হবে।

বীর উত্তম কাদের সিদ্দিকীর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগদান নিতান্তই তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সামনের দিনের রাজনৈতিক লাভ-লোকসানের কথা জেনে বুঝে-শুনেই তিনি এটি করেছেন। কিন্তু যে স্ববিরোধী বিষয়টি মেনে নিতে কষ্ট হয়েছে তাহলো-জাসদের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা রবের হাতে নিজের হাতটি রেখেই যে তিনি আগামী দিনের রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজেছেন সেটি। জাসদের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রখ্যাত নেতা রবের হাতটি জাসদ বিদ্বেষী বীর উত্তম কাদের সিদ্দিকী এতোটা আস্থার সাথে ধরলেন কীভাবে? একি রাজনৈতিক স্ববিরোধীতা নয়?গত কয়েক বছর ধরে দেখছি মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তী বীর উত্তম কাদের সিদ্দিকী বিভিন্ন জনসভায়, মিটিংয়ে জাসদের বিরুদ্ধে ভীষণ বিষোদাগার করেন। শুধু বিষোদাগার নয়, জাসদ ৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য দায়ী বা প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল এ কথাগুলো তিনি অনবরত বলেন। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে।

২৮ অক্টোবর রোববার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বীর উত্তম কাদের সিদ্দিকীর উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী ও প্রতিরোধকারীদের নিয়ে ঢাকায় এক মিলনমেলার আয়োজন করেছিলেন। সেখানে তিনি কী বলেন একটু দেখা যাক। তিনি বলেন, আজকের অবস্থা দিয়ে পঁচাত্তর সালের পরিস্থিতি বিবেচনা করা যাবে না। সে সময়ে রক্ষীবাহিনীও কিছু বাড়াবাড়ি করেছিল, আওয়ামী লীগের কতিপয় বড় নেতার আচরণ মানুষ মেনে নেয়নি। জাসদ গণবাহিনী সৃষ্টি করে ২০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ও ১০ হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে হত্যা করেছিল। ওই গণবাহিনীর প্রধান ছিলেন কর্নেল তাহের ও ডেপুটি লিডার ছিলেন আজকের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

Advertisement

আবার এ বছরের ২৫ জানুয়ারি নাটোরের কানাইখালিতে তিনি বলেন, মাত্র ১৩ পার্সেন্ট ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনাকে মানায় না। আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে না, তারা ভালোবাসে ক্ষমতা। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এখন আর আওয়ামী লীগ করে না বলেই সেই দলে বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য দায়ী হাসানুল হক ইনু আর বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে জুতা বানানোর শ্লোগান দেওয়া মতিয়া চৌধুরীর মতো মন্ত্রী আছেন। আমাকে ইনু-মতিয়াদের সঙ্গে বেহেশতে যেতে বললেও যাব না। এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে।

প্রশ্নটা হলো যে জাসদের বিরুদ্ধে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর এত ক্ষোভ, রাগ সেই জাসদ নেতাদের হাতেই তিনি হাত রাখলেন কেন? জাতীয় ফ্রন্টের অন্যতম দুই নেতা আ স ম আব্দুর রব এবং মাহমুদুর রহমান মান্না। এর মধ্যে আ স ম আব্দুর রব জাসদ এবং মাহমুদুর রহমান মান্না বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা। ৭ নভেম্বর এ দুজনই বীর উত্তম তাহেরের সাথে কারাগারে ছিলেন। এ দুজনই এখন শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় সমালোচক। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর চোখে জাসদের এ দুজন পরিশুদ্ধ আর একই দলের হাসানুল হক ইনু পরিতাজ্য-এটি কেমন কথা? তাহলে কি হাসানুল হক ইনু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের অন্যতম রুপকার বলেই তার প্রতি এত ঈর্ষা, রাগ, ক্ষোভ?

হাসানুল হক ইনু শেখ হাসিনার মন্ত্রীসভার মন্ত্রী বলেই কি আপনি তাকে সহ্য করতে পারেন না? আর সহ্য করতে পারেন না বলেই কি বিষোদাগার করে চলেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সাথে জাসদ বা ইনুর দায়-দোষ থাকলে আ স ম রব আর মাহমুদুর রহমান মান্নার কি দায় নেই? জাসদে হাসানুল হক ইনুর চেয়েতো আ স ম রবই অনেক বড় নেতা ছিলেন। জাসদের অন্যতম নীতি-নির্ধারকতো তিনিই ছিলেন। তাহলে রব-মান্না আপনার এত প্রিয় কেন? মুক্তিযুদ্ধে বীর উত্তম কাদের সিদ্দিকীর অবদান অসামান্যই নয়, কিংবদন্তী সমতূল্য। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পায়ের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করার সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তিটিও তিনি। যে ছবি নতুন প্রজন্মের কাছে অন্যরকম এক ইতিহাসের কথা বলে। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার আবেগ, অভিব্যক্তি নিয়ে প্রশ্ন করাও অবান্তর। গত ২৮ অক্টোবর জাতীয় মুক্তিবাহিনী’ ৭৫ এর মিলনমেলার কথা বলে যে পোস্টারটি প্রকাশ করে সেখানেও লেখা ছিল ‘কামাল-জামাল-রাসেলকে হত্যা করতে পারলেও বঙ্গবন্ধুকে নির্বংশ করতে পারেনি। আমি কাদের সিদ্দিকী বঙ্গবন্ধুর চতুর্থ সন্তান। পিতৃহত্যার বদলা নেবই নেব।’

কিন্তু বঙ্গবীরের এসব আবেগের মাঝে স্বচ্ছতা পাওয়া যায় না, তার সবকিছুই এলোমেলো, অস্বচ্ছ, বিভ্রান্তিকর মনে হয়। জানি আওয়ামী লীগ নিয়ে আপনার মনে অনেক ক্ষোভ, অভিমান। অভিমান করেই আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেছিলেন। আওয়ামী লীগে ফেরার রাস্তা আপনার আর তৈরি হয়নি। হ্যাঁ, বঙ্গবন্ধুর বিরোধীতাকারীদের নিয়ে আপনি এখন বঙ্গবন্ধু কন্যার যে চরম বিরোধীতা করছেন-এটিই ইতিহাসের ট্রাজিডি। আর ৬ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দীতে যা বললেন তাও মনে থাকবে সবার। ‘আল্লামা শফি ভুলে যেতে পারেন, আমি কাদের সিদ্দিকী ভুলি নাই। ওই শাপলা চত্বরে ইমানদারদের রক্ত ঝড়েছে, শাপলা চত্বরের বদলা না নিতে পারলে আমরা বেঈমান হয়ে যাব।’

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)