চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিজেপির ফড়েরা কী ধর্মঘট থেকে সতর্ক হবে?

সমরেশ বসুর ‘ শুভ্রা-সন্ধ্যা সংবাদে’ র অন্তিম পর্বে এসে সন্ধ্যা খুব আন্তরিক ভাবেই চিন্তা করেছিল যে,’ শুভ্রা এত শক্তি কোথা থেকে পেল? অথচ আমাদের মধ্যে সমাজ সংসারের তফাৎ কতটুকু? জানি না, ঈশ্বর বলে সত্যি কেউ আছেন কী না। থাকলে জিজ্ঞেস করতাম, আমাকে কি শুভ্রার মত শক্তি দিতে পার না? ২৬ নভেম্বর গোটা ভারতব্যাপী যে ধর্মঘট হল, তার প্রেক্ষিতে সমরেশের ছোটগল্পের চরিত্র সন্ধ্যার অন্তিম উপলব্ধি গুলি যেন বিশেষ রকমের বাস্তবতার ধুলো কাদা মেখে ভারতের মানুষদের সামনে হাজির হয়েছে। সন্ধ্যা চেয়েছিল শুভ্রাকে কুপথে নামাতে। নিজের জন্মদাতা পিতার জীবনমরণ লড়াইতেও পাঁকে নামে নি শুভ্রা, সন্ধ্যার শত প্রলোভন ছাড়া। তাই এই ধর্মঘটের সাফল্য যেন সমরেশের ছোটগল্পটির মতোই শাসকের শত প্রলোভন কে উপেক্ষা করে প্রতিবাদীর দৃঢ়তা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে শুভ্রার মেরুদণ্ডকে।

ভারত সরকারের লাগামহীন অর্থনৈতিক ব্যর্থতার প্রেক্ষিতে যে বন্ধ হয়ে গেল, সেই বন্ধ যেন সমরেশের গল্পের চরিত্র সন্ধ্যার শুভ্রাকে নষ্ট পথে ঠেলে দেওয়ার সব রকমের চেষ্টা অথচ, প্রবল দারিদ্র্যতাকে উপেক্ষা করে শুভ্রার দৃঢ় প্রত্যাখ্যানের চিত্রকল্পকেই স্পষ্ট করে দিল।বন্ধ মানেই সর্বনাশা, কর্মনাশা-এই যে বাজার অর্থনীতি প্রসূত মানসিকতা গত বেশ কয়েকবছর ধরে আমাদের মনে ধীরে ধীরে গেঁথে দেওয়া হচ্ছিল, সেই মানসিকতাকেও একটা চপেটাঘাত দিল ২৬ নভেম্বর ২০’র বন্ধ। একটা সময়ে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বন্ধ ঘিরে কিছু দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তীব্র বিতর্ক উঠেছিল। বুদ্ধজায়ার বামপন্থীদের ডাকা বন্ধের দিন অফিসে যাওয়া এবং সাংবাদিকদের কাছে করা কিছু মন্তব্য ঘিরে প্রবল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।সাম্প্রতিক বন্ধ যেন সেইসব অতীতের বিতর্ককে ম্লান করে দিয়ে অর্থনৈতিক প্রশ্নে মানুষের দুরবস্থার বিষয়টিকেই জান্তব বাস্তব হিশেবে মেলে ধরল।

বিজ্ঞাপন

ভারতে কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকার নয়া উদার অর্থনীতির উগ্র সমর্থক। সেই সমর্থনের ধারা কোবিদ ১৯ জনিত সঙ্কটের আগে যে পর্যায়ের ছিল, অপরিকল্পিত লক ডাউনের জেরে, দুটি সরকারের নয়া উদার অর্থনীতির কাছে আত্মসমর্পণ একদম পুরোমাত্রায় হয়ে গেছে। শিল্প, কলকারখানা ইত্যাদি জনিত যে অর্থনৈতিক সঙ্কট, সেই সঙ্কটের মাত্রাকে অপরিকল্পিত লক ডাউন সম্পূর্ণ বল্গাহীন করে দিয়েছে। দেশের একটা বড়ো অংশের মানুষ পেশাবিচ্যুতির ভয়াবহ সঙ্কটের ভিতর দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এই পেশাবিচ্যুতির গ্রাস থেকে উচ্চ বেতনের লোকজন ও বাদ পড়েন নি। মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত কোন জায়গাতে আছে, তা সহজেই বুঝতে পারা যাচ্ছে।

এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার লাভজনক রাষ্ট্রয়ত্ত শিল্পগুলিকে তাদের পেটোয়া শিল্পপতিদের কাছে কার্যত জলের দরে বেঁচে দিচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে বেসরকারিকরণের দিকে তাদের সবধরণের চেষ্টা চালাচ্ছে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুকরণে ব্যাঙ্কের সুদের হার কার্যত শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলেছে। সংশোধিত কৃষি বিলের মাধ্যমে দেশের কৃষি ব্যবস্থায়, তথা সামগ্রিক অর্থনীতিতে তারা ডেকে আনছে ভয়াবহ সঙ্কট। আর এস এস তালের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ‘ সাম্প্রদায়িকতা’ কেই ভারতের মূলমন্ত্রে পরিণত করতে আত্মনিবেদিত। অথচ তাদের এই নষ্টবুদ্ধির প্রচেষ্টা, উদ্যোগ-এগুলির যথার্থ স্বরূপ যাতে কেউ বুঝতে না পারে তাই লক ডাউনের কালে চোরাকারবারী, যারা চিরদিনই হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির খুব ঘনিষ্ঠ, তারাই কার্যত গোটা ভারতের বাজারটা দখল করে রেখেছিল। আর ছিল আর এস এস বা তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির বহু পুরনো বন্ধু, মধ্যস্বত্ত্বভোগী ফড়ে সম্প্রদায়। লক ডাউনের কালে এই দুটি গোষ্ঠী কেন্দ্রের বিজেপি আর রাজ্যের তৃণমূল, দুই শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে মিতালি পাতিয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের দামে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।

কোবিদ-১৯ জনিত এই ভয়াবহ সঙ্কটকালে বাজার দর নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার বা রাজ্যের তৃণমূল সরকার কারো কোনো হেলদোল নেই। বস্তুত কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এই অনিয়ন্ত্রিত বাজারদরের ভিতর দিয়ে তাদের মূল শ্রেণিমিত্র, মধ্যস্বত্ত্বভোগী ফড়েদের খুশি রেখেছে। মজুতদারদের খুশি রেখেছে। কালোবাজারিদের খুশি রেখেছে। অর্থনীতির এই গভীর সঙ্কটে দেশবাসীর যাপনচিত্রকে তারা এতোটাই গভীর সঙ্কটে ফেলেছে যে, দেশবাসীর পক্ষে আর এস এস বা তালের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির মূল রাজনৈতিক কর্মসূচি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ ঘিরে ততোখানি দৃষ্টিক্ষেপ করতেই সমর্থ হচ্ছে না সাধারণ মানুষ।এভাবে কালো ভাজারিদের উৎসাহিত করতেই ‘৪৩ সালে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, হিন্দু মহাসভা, মুসলিম লীগের ত্রিবিধ উদ্যোগে যে মন্বন্তর হয়েছিল, সেই পরিস্থিতিই ফিরিয়ে আনতে তৎপর দুই শাসক। এই সময়কালে প্রবল জনবিক্ষোভের ফলে অত্যাবশ্যক পণ্যের উপর সরকারী নিয়ন্ত্রণে বাধ্য হয় ব্রিটিশ সরকার। জাতীয় কংগ্রেস আর বামপন্থীদের সমন্বিত চাপের ফলে এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন না করলেও একটি লোকদেখানো পণ্য নিয়ন্ত্রণের পথে হেঁটেছিল ব্রিটিশ। সেদিনের প্রয়োজনের তুলনায় এই ব্যবস্থা বা তার প্রয়োগ যথেষ্ট না হলেও আইনটির প্রাসঙ্গিকতা স্বাধীন ভারতে কোনো অংশে কমে নি।

এই পটভূমিকায় স্বাধীন ভারতে খাদ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের যোগান স্বাভাবিক রাখতে জওহরলাল নেহরুর প্রধানমন্ত্রীত্বকালে ১৯৫৫ সালে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন চালু হয়। ট্রেডার্স সম্প্রদায়, যারা আর এস এস-বিজেপির সমর্থনের মূল ভিত্তি ছিল, তাদের স্বার্থের দিকে তাকিয়েই অটলবিহারি বাজপেয়ীর আমলে এই আইনটি স্বাধীন ভারতে প্রথম সংশোধিত হয় ২০০২ সালে। সেই সংশোধনের ভিতর দিয়ে বাজপেয়ী সরকার ধান, গম, চিল, বাজরা এবং রাগিকে নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করেছিল। বিশ্বব্যাপী যে খাদ্য সঙ্কট তৈরি হয়েছিল, তাতে আগের নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে বাধ্য হয়েছিল ডঃ মনমোহন সিং প্রথম দফার সরকার। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউ পি এ সরকার আর বিজেপি নেতৃত্বাধীন এন ডি এ সরকারের ভিতরে অর্থনৈতিক প্রশ্নে মৌলিক ফারাক না থাকলেও প্রথম ইউ পি এ সরকারের উপর যেহেতু বামপন্থীদের যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ছিল, তাই আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় ক্রমবর্ধমান খাদ্য সঙ্কটের প্রেক্ষিতে বামপন্থীদের দাবিকে মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়েছিল প্রথম ইউ পি এ সরকার। বাজার অর্থনীতির সমর্থক ডঃ মনমোহন সিং সেই সময়ে তাঁর সরকার চালানোর বাধ্যবাধকতা থেকেই নিজের জেদ ধরে রাখেন নি। বামপন্থীদের দাবি মেনে চাল, গম, ধান, বাজরা, রাগি ইত্যাদির উপর বাজপেয়ী সরকারের ২০০২ সালে নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার আগে অবস্থা আবার কায়েম করবার ফলে, আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় খাদ্য সঙ্কটের যে প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল, সেই প্রভাব অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতে ততোটা তীব্রভাবে পড়ে নি তখন। বাজপেয়ী নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার ফলে সেইসব খাদ্যশষ্যের দাম যেভাবে আকাশ ছোঁয়া হতে শুরু করেছিল, তা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। এই অত্যাবশ্যক পণ্য আইনটা নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় দফার শাসনকালে তুলে দেওয়া হল। ফলে চাল, ডাল, বজরা, আলু, ভোজ্য তৈল, বীজ ইত্যাদির উপর এখন আর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

অত্যাবশ্যকীয় পণ্যে যেমন সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই, তেমনিই খোলা বাজারে চোরাকারবারী এবং ফড়েদের দাম বৃদ্ধির যে শয়তানি, তার উপরেও কোনো অবস্থাতেই কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। পুলিশের পর্যবেক্ষণ, এইসব কোনো কিছুই কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার আনতে চাইছে না। কারণ গোটা দেশব্যাপী এই মধ্যস্বত্ত্বভোগী ফড়েরা বিজেপির জন্মলগ্নের বন্ধু হিশেবে, সুদে আসলে সবকিছু এখন উসুল করে নিতে চায়। আর রাজ্যের ক্ষেত্রে এই অংশের দালাল চক্রের সঙ্গে রাজ্যের শাসকদের ও একটা ভালো রকমের বিলি ব্যবস্থা রয়েছে। এই দালালেরা একই সঙ্গে কেন্দ্রের শাসক আর রাজ্যের শাসকদের খুশি করে চলছে। এই অবস্থায় গত ২৬ নভেম্বর যে ধর্মঘট হয়ে গেল, তাকে ভেস্তে দিয়ে, বিজেপির নেক নজরে থাকার সব রকম চেষ্টাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল এবং প্রশাসন চালালো।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)