চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য: চরমোনাই-মামুনুলদের ষড়যন্ত্র

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে মূর্তি আখ্যা দিয়ে সেটার নির্মাণ কাজ বন্ধ, এবং নির্মিত হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ধর্মভিত্তিক কিছু সংগঠনের কয়েকজন নেতা। এই নেতাদের মধ্যে আছেন ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের মুফতি রেজাউল করিম পির সাহেব চরমোনাই, খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক, মুফতি নূর হোসেইন নূরানিগং। সম্প্রতি রাজধানীর পৃথক স্থানের একাধিক কর্মসূচিতে তারা এই দাবি ও হুমকি দিয়েছেন।

তাদের ওই দাবি ও হুমকি তারা একবারমাত্র দিয়েই ক্ষান্ত হননি, এটা বারবার বলছেন এবং এই ভাস্কর্য ইস্যুতে মাঠ গরমের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন। তাদের উদ্দেশ্য পরিস্কার- যেকোনো মূল্যে তারা দেশে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য রাখবেন না। এজন্যে তারা পূর্বের নানা ঘটনার উল্লেখে বলছেন আগেও তারা ভেঙেছেন, আবারও ভাঙবেন, বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেবেন। এই হুমকির সঙ্গে তারা পরোক্ষভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাণনাশেরও হুমকি দিতে পিছপা হননি। প্রধানমন্ত্রীকে দেখে নেওয়া হবে, প্রধানমন্ত্রী সূর্য ওঠা দেখবেন কিন্তু সূর্য ডুবা দেখবেন না- ধৃষ্টতাপূর্ণ হুমকিতে এমনও বাক্য ছিল তাদের।

বিজ্ঞাপন

অবাক করা বিষয় হচ্ছে জাতির পিতার ভাস্কর্য ইস্যুতে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে টু-শব্দটিও করল না। আওয়ামী লীগের মুখপাত্রদের এনিয়ে বক্তব্য নাই। দলটির সাধারণ সম্পাদক বলছেন- তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। সারাদেশে এত এত আওয়ামী লীগার, অথচ এনিয়ে কয়েকটি জায়গায় ব্যক্তিগতভাবে ও বিচ্ছিন্ন কিছু প্রতিবাদ বাদে আর কোন কর্মসূচি নাই।

চরমোনাই পীর-মামুনুল হকরা যখন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিল, শেখ হাসিনাকে প্রাণনাশের হুমকি প্রকাশ্যে দিচ্ছিল তখন সারাদেশের আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের যুব সংগঠন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়েই ব্যস্ত। হুমকির অব্যবহিত পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভেসেছিল অভিনন্দনের বার্তায়। একদল লোক যুবলীগের নেতাদের অভিনন্দন জানাচ্ছিল, নেতারা তাদের অভিনন্দন গ্রহণ করছিল। ভাবখানা এমন যে বঙ্গবন্ধুকে অপমান তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর নেতারা বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিলেও তাদের কিছুই যায় আসে না!

এরপর গত শুক্রবার যখন প্রধানমন্ত্রীর বড়শিতে তেলাপিয়া মাছের এবং সেলাই মেশিন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বসা ছবি ফেসবুকে প্রকাশ হলো তখন সেই নেতাকর্মীরা ফের ভেসেছে উচ্ছ্বাসে। সাধারণের মাঝে অসাধারণসহ নানা অভিধা জুটেছে ওই দুই ছবিকে কেন্দ্র করে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছবি শেয়ার করে লিখেছেন ক্যাপশন দেওয়ার বিদ্যা তার নাই; আইসিটি প্রতিমন্ত্রী লিখেছেন, এসব নিয়মিত করেন প্রধানমন্ত্রী। এই উচ্ছ্বাস, এই তোষামোদ জীবিত প্রধানমন্ত্রীর জন্যে নেতা ও নেতা হতে চাওয়া আওয়ামী লীগারদের মধ্যে দেখেছি। অথচ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য সত্ত্বেও তাদের বেশিরভাগই চুপ।

এরা কেন চুপ সেটা বুঝতে পারি। কারণ বর্তমান আওয়ামী লীগ প্রগতিশীলদের চাইতে প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠতে মরিয়া। তারা নামের সঙ্গে মুসলিম শব্দটি যোগ করতে পারছে না ঠিক তবে আচার-আচরণে বুঝাতে চাইছে দল হিসেবেও তারা ধর্মপালন করে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, এমপি-মন্ত্রীদের দেখে আসছি তারা তুলনামূলক একটা আবহ তৈরি করে বলতে চায় খালেদার চাইতে হাসিনা ধার্মিক। প্রধানমন্ত্রী তাহাজ্জুদ নামাজ পড়েন, তেলাওয়াত করেন- এসব প্রচারের দিকেও মনোযোগী হয় তারা মাঝেমাঝে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন এমন আলোচনা সামনে আনতে চায় তারা। ইসলামের খেদমতে বঙ্গবন্ধু- এমন আলোচনার আয়োজন করতেও দেখেছি সরকার নিয়ন্ত্রিত টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভিতে।

এতে কী লাভ হয়েছে আওয়ামী লীগের? কোনো লাভ হয়েছে বলে ত মনে হয় না; বরং ক্ষতিই হয়েছে ঢের! তাই চরমোনাই-মামুনুল-নূরানিরা যখন ভাস্কর্যকে মূর্তি বলে আখ্যা দিয়ে এটা স্থাপন ও সমর্থন শিরকের মত অপরাধ বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে তখন এই আওয়ামী লীগের বিশাল একটা শ্রেণি এই প্রচারেই মজেছে, তারাও বিশ্বাস করতে শুরু করেছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন শিরকের সমান; এটা গুনাহের কাজ। এখানে একটা শ্রেণির লোকের উদ্ভব হয়েছে যারা প্রথমত ভাস্কর্যকে মূর্তি বলে মনে করছে।

আরেকটা শ্রেণি আছে যারা ভাস্কর্য ও মূর্তির তফাৎ না বুঝে দুইটাকেই একীভূত করে ফেলেছে। আরেকটা শ্রেণি আছে তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে ভাস্কর্যই মনে করছে তবে মূর্তি নিয়ে তাদের আপত্তিও আছে। আরও একটা শ্রেণি আছে যাদের ভাস্কর্য ও মূর্তিতে আপত্তি নাই, দুইটাই যথাস্থানে সম্মানের। বলে রাখা দরকার শেষোক্ত শ্রেণির বিশ্বাসীরা প্রকৃতপক্ষে সংখ্যায় কম।

আওয়ামী লীগ যত বেশি ধর্মের দিকে দলীয়ভাবে ঝুঁকেছে ততবেশি ক্ষতি হয়েছে দলটির। ফলে দলে ধার্মিকের চাইতে বকধার্মিকের সংখ্যা বেড়েছে। তাই ধর্মব্যবসায়ীরা গুনাহ বলে যা কিছুই দাবি করুক না কেন সবার আগে বিশ্বাস করছে এই আওয়ামী লীগের সমর্থকেরাই। তাই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মিত হলে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার মত ধৃষ্টতা, শেখ হাসিনাকে হত্যার হুমকির কোনোকিছুই আওয়ামী লীগারদের কাছে প্রতিক্রিয়া দেখানোর মত বিষয় হয়ে ওঠছে না।

আওয়ামী লীগের এই দুরবস্থা দলটির ভবিষ্যতের জন্যে ভালো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। শেখ হাসিনাই বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার হিসেবে একমাত্র নেতা। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছাড়া বঙ্গবন্ধুর আর কোন উত্তরাধিকার না থাকার কারণে এই দলটির নেতৃত্বজনিত ভবিষ্যৎ এমনিতেই অনিশ্চয়তায় মুখে, তার ওপর ধর্মব্যবসায়ীদের এই হুমকিতে শেখ হাসিনার জীবদ্দশায়ই আওয়ামী লীগ প্রতিক্রিয়াহীন থেকে গেছে। এটা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্যে সহায়ক কোন ঘটনা যে নয় সেটা বলাই বাহুল্য।

শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালেও যদি বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে মামুনুল হকরা এমন হুমকি দিতে পারে সেক্ষেত্রে অনাগত দিনগুলোতে কী হতে পারে, ভাবা যায়? বিশেষ করে এই শ্রেণির লোকেরা জন্মগতভাবেই মুজিববিদ্বেষী। তাদের এই মুজিববিদ্বেষ মূলত বাংলাদেশের জন্মপ্রক্রিয়ার সকল স্তরে বঙ্গবন্ধু মুজিবের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণের কারণে। তারা তাদের পূর্বসূরিদের আদর্শিক ধারাটাই অক্ষুণ্ণ রেখেছে।

বিজ্ঞাপন

কারণ একাত্তরে ধর্মভিত্তিক দেশ পাকিস্তান ধর্মের নাম নিয়েই বাংলাদেশের মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, গণহত্যা চালিয়েছে; এবং সেই ধর্মের নাম নিয়েই মামুনুল হক-চরমোনাই পীরদের পূর্বসূরি জামায়াতে ইসলামি-নেজামে ইসলাম নেতারা সেই গণহত্যার সহযোগী হয়েছিল। একাত্তরের ঐতিহাসিক সত্য মামুনুলদের পূর্বসূরিদের যেমন বঙ্গবন্ধুকে শত্রুজ্ঞান করেছিল তেমনই এইকালেও সেই একাত্তর মামুনুলদের বঙ্গবন্ধুবিদ্বেষকে উসকে দিচ্ছে।

অনুভূতিপ্রবণ বিভ্রান্তজনদের স্রেফ তথ্য জানাতে বলছি ‘ভাস্কর্য মূর্তি নয়, শিল্প’। এই তথ্যোল্লেখ জায়েজিকরণ অর্থে নয়, বলছি জ্ঞানদানের নিমিত্তে। এরবাইরে যা বলছি তা হলো- কেবল ভাস্কর্যই নয়, মূর্তি ভাঙারও অধিকার কারও নাই। কে সম্মান প্রদর্শন ও শৈল্পিক চিন্তায় ভাস্কর্য নির্মাণ করবে, কে আরাধনার জন্যে মূর্তি নির্মাণ করবে সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। এই ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ রাষ্ট্র কাউকে দেয়নি। এই হস্তক্ষেপ অপরাধতুল্য, এর শাস্তিও আছে বিধানে। চরমোনাই-মামুনুল কিংবা একই গোত্রের ধর্মব্যবসায়ীরা এই বিধানের বাইরে থাকার সুযোগ নাই।

সরকার বঙ্গবন্ধুর মূর্তি নয় ভাস্কর্য নির্মাণ করতে চায়- এই আলোচনা বিভ্রান্তজনদের জন্যে প্রাসঙ্গিক হলেও দূর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলে অপরিণামদর্শী। কারণ এতে করে যে বার্তা প্রকাশ পায় তা হলো কেবল ভাস্কর্য হলে ভাঙা যাবে না, মূর্তি হলে সেটা ভাঙা যাবে; এটা শুভ লক্ষণ নয়। এই বার্তা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে ভাস্কর্য হোক, মূর্তি হোক এর কোনোকিছুই ভাঙা যাবে না, এই অধিকার কারও নাই।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে চরমোনাই পীর, মামুনুল হকসহ ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতাদের যে আপত্তি সেটাকে স্রেফ ঘটনাক্রমে তোলা কোনো দাবি নয়। তারা এবার রাজধানীতে যে শোডাউন করেছে সেটা পূর্বপরিকল্পিত এবং সরকারকে চাপে ফেলে দাবি আদায়ের কৌশল। এর প্রমাণ মেলে খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নবগঠিত কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হকের কথাতেই। ২২ নভেম্বর মামুনুল হক তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে ‘‘ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলন, মাহফিলে বাধা, একজন মাশরাফি বিন মর্তুজার আলাপন ও আমাদের পরবর্তী ভাবনা’’ শিরোনামের নাতিদীর্ঘ এক লেখায় এই আন্দোলন যে তাদের পরিকল্পিত এক আন্দোলন এবং মাঠ গরমের আন্দোলন সে সত্য স্বীকার করেছেন।

ওই লেখায় মামুনুল হক জানাচ্ছেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনায় পরিস্থিতি তৈরি করতে তিনি এবং চরমোনাই পীর রেজাউল করিম দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন, এবং সে লক্ষ্যে তারা ধূপখোলা মাঠে বড় সমাবেশ করেছেন। মামুনুল হক ওখানে লিখেন, ‘‘…ফরিদ মসউদ সাহেবের কথা তাদের কাছে যুক্তিপূর্ণ মনে হয়েছে বিধায় তারা আমার সাথে কথা বলতে এসেছেন। আমি তাদের দীর্ঘ কারগুজারী শুনলাম। তাদের মনোভাব বুঝলাম। আর তাদের প্রতি আমার সমর্থন ও যে কোনো সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলাম।

সেমতে প্রাথমিক কথা এমনই সাব্যস্ত হলো যে, আমি এবং ফয়জুল করিম ভাই আমাদের দুজনকে রেখে একটা বড় রকমের মাঠ প্রোগ্রাম করা হবে। এমন একটা খসড়া পরিকল্পনার আলোচনা করে তারা আমার কাছ থেকে বিদায় নিলেন। এরপর ১৩ নভেম্বর বাদজুমা ধুপখোলা মাঠে বড় রকমের সমাবেশ হল।’’ এই মাঠগরমের পরিকল্পনার মাঝে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মসউদও যে আছেন সেটা মামুনুল হকের এই স্বীকারোক্তি থেকেই স্পষ্ট। হেফাজতের এই নেতার লেখায় আরও জানা যাচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর সেতুর পাশে নির্মিতব্য বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়েও তাদের আপত্তি এবং তারা সেটা যেকোনো মূল্যে রুখে দিতে চায়।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ বন্ধ করতে এবং সেটা নির্মাণ করা হলে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া হবে বলে যে হুমকি দিয়েছেন ধর্মব্যবসায়ী চরমোনাই পির, মামুনুল হকগংরা সেখানে তারা ধর্মকে উপস্থাপন করেছে সুক্ষ্ণভাবে। তাদের ধর্মযোগের প্রচারণায় খোদ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই বিভক্ত ও বিভ্রান্ত। কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক পর্যায়ে এই বিভ্রান্তিটা এমনভাবে ছড়িয়েছে যে তারা এর বিরুদ্ধে মাঠে নামার সাহস পাচ্ছে না। চট্টগ্রামে স্থানীয়ভাবে প্রতিবাদের কিছু চেষ্টা হয়েছে ঠিক, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ নামের এক সংগঠন রাজধানীতে কিছু কর্মসূচি পালন করেছে; এরবাইরে উল্লেখের মত কোন কর্মসূচি নেই। এটা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও আদর্শিক দেউলিয়াত্বে প্রমাণ বহন করে। এখনকার এই আওয়ামী লীগ এমনভাবে বিভক্ত যে এই দলের একটা অংশ যুদ্ধাপরাধী সাঈদীকে ইসলামি স্কলার ভাবে, একটা অংশ যুদ্ধাপরাধীর আদর্শিক শিষ্য মিজানুর রহমান আজহারীকে ধর্মীয় নেতা মানে, একটা অংশ হেফাজতে ইসলামের প্রয়াত নেতা আল্লামা শফীকে ধর্মীয় নেতা মনে করে, একটা অংশ হেফাজতের কোন অংশ সরকারের বন্ধু আর কোন অংশ সরকারের শত্রু এনিয়ে গবেষণা পর্যন্ত করে; যেন আওয়ামী লীগই ওই ধর্মভিত্তিক দল ও নেতাদের লেজুড়।

আদর্শিক স্খলনের এই অবস্থা একদিনে হুট করে সামনে আসেনি, এটা হয়েছে মূলত আওয়ামী লীগের ধর্মীয় অনুভূতি বিষয়ক রাজনৈতিক ভূমিকার কারণেই। এই প্রবণতা আওয়ামী লীগকে এগুতে দেবে না, এই প্রবণতা আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করবে না, দুর্বল করবে; বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মিত হলে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার হুমকির পরেও দলটির উচ্চপর্যায় থেকে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত প্রতিক্রিয়াহীনতায় সেও এক প্রমাণ।

ধর্ম ব্যক্তির, এটা রাষ্ট্রীয় চর্চার বিষয় নয়, এটা রাজনৈতিক দলের চর্চার বিষয় নয়। ব্যক্তির ধর্ম যখন রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় তখন চরমোনাই পির-মামুনুল হকগংরা তাদের ষড়যন্ত্রকে সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে। তাদের কাছে দেশের জন্মযুদ্ধের মহানায়কের ভাস্কর্যও বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার বিষয় হয়ে যায়। আর মহানায়কের প্রতি এমন অবমাননা দেখেও তার হাতে গড়া সংগঠনও চুপ করে বসে থাকে।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়ে ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ও ধর্মের নামে উগ্রবাদের যে হুমকি এসেছে সেটাকে কঠোরভাবে রুখতে হবে। এই হুমকির কারণে দেশের কওমি মাদ্রাসাসহ নানা জায়গায় সামাজিক শৃঙ্খলাবিনাশী কোন কিছু ঘটলে এর দায় কেউ এড়াতে পারবে না। এর দায় এড়াতে পারবে না চরমোনাই পীর-মামুনুল হকগংরা; চুপ করে বসে থেকে এর দায় এড়াতে পারবে না আওয়ামী লীগ এবং সরকার। মনে রাখা দরকার উগ্রবাদ প্রচারই কেবল অপরাধ নয়, উগ্রবাদকে আশকারা দেওয়াও অপরাধ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)