চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রতিবেশী শহরের গল্প (পর্ব-২)

একটি ওষুধ কিনতে আমাকে নিউটাউনে যেতে হবে। ফোনে ওষুধ আমদানিকারক অফিসের লোকেশান জেনে নিলাম। তিনি শুধু বললেন টাটা মেডিক্যালের সামনে নামলেই হবে। পার্ক সার্কাসের এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, হাত তুলে ট্যাক্সি থামানোর সুযোগ কম। একাই যাচ্ছি বলে উবারও ডাকলাম না। মনে হলো যেকোনো একটি গাড়ি ধরে চলে যাবো। এমনকি বাসে উঠতে পারলেও কোনো অসুবিধা নেই। দূরে একটি ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল। পুরোনো অ্যামব্যাসেডার। এগিয়ে গিয়ে বললাম, যাবেন? ঠিকানা শুনে তিনি বললেন ২০০ টাকা লাগবে। স্বভাবসুলভ দরকষাকষি করলাম, যাতে না ঠকে যাই। কিন্তু ঠিকই আবার রাজি হলাম। চালক বেশ বয়স্ক। মেজাজ তিরিক্ষি। জোরে জোরে কথা বলেন। বললাম, উবার ওলা আর নতুন নতুন ট্যাক্সি এসে তো আপনাদের খুবই অসুবিধা হয়ে গেছে। এই ট্যাক্সিতে তো কেউ উঠতে চায় না। আমার এই সামান্য কথার এমন ঝাঁঝ আমি নিজেও বুঝিনি। তিনি বললেন, কেউ উঠতে চায় না, তো আপনি উঠলেন কেন? আপনি না উঠলেই পারতেন! আমার মুখে কোনো কথা নেই। বললাম, আমি তো এই গাড়ি পছন্দ করি। অনেক আগে কলকাতা এসে উঠতাম। তাই উঠেছি। তিনি বললেন, আপনার মতো সবাই পছন্দ করে। সবাই ওঠে। আমি একেবারে থেমে না গিয়ে বললাম, এগুলোর সংখ্যা তো কমে গেছে তাই না!

: কমবে না? কবে শুরু হয়েছে বলুন তো! সেকি আজকের কথা। এখনও চলছে তাই ধন্য ধন্য বলুন।
: না মানে, আপনাদের ইনকাম তো আগের মতো নেই।
: নেই তো কী হয়েছে? আমাদের ইনকাম ঠিকই আছে, বরং আরো বেড়েছে। রাস্তায় কি কোনো ট্যাক্সি থেমে আছে? সবই চলছে। গাড়ি বেড়েছে মানুষও বেড়েছে। মানুষের টাকাও বেড়েছে। সবাই ইনকাম করছে, কেউ তো বসে নেই। আগে এক অ্যামব্যাসেডারই ছিল। তাতে উঠতো কজন বলুন! সবাই তো বসে বসে ঝিমাতো।
আমি যুক্তির প্যাচে পড়ে চুপ করে যাবো, এর মাঝে মনে হলো প্রসঙ্গ পাল্টে দেখা যাক।
: কলকাতার অবস্থা তো পাল্টে গেছে। এই সরকার তো সবকিছু গুছিয়ে দিল কি বলেন? চারদিকে উন্নতি হচ্ছে ব্যাপক। বড় বড় বিল্ডিং উঠছে। পশ্চিমবঙ্গের চেহারাটাই পাল্টে যাচ্ছে। নোংরা আবর্জনা নেই। বেশিরভাগ জায়গায় ঝকঝকে তকতকে।
: আপনার কথা শেষ হয়েছে? আমার একটা প্রশ্ন শুনুন। স্বামী নেই, সংসার নেই – এত টাকা কী দরকার বলুন?

বিজ্ঞাপন

প্রশ্নটি মাথার ওপর দিয়ে গেল। তারপরও ধরার চেষ্টা করলাম। কিন্তু মন্তব্য করলাম না। তিনি বলে চললেন।

: জয়ললিতার কথা শোনেননি। সবাই বলতো, আম্মা। দেবীর মতো মনে করতো। উনি তো মারা গেলেন। বেঁচে থাকতেই যেবার ধরা খেলেন সেবার কী কী পাওয়া গিয়েছিল জানেন ? ৪/৫টি বাড়ি। ৭০ কোটি টাকার সম্পদ। ২৮ কেজি সোনা, ৮০০ কেজি রূপা, ৭৫০ জুড়া জুতো, ১০ হাজার ৫’শ শাড়ি আরো মূল্যবান কত কী! কী হলো? এগুলো কি সঙ্গে নিয়ে গেলেন?
আমি বললাম, পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা তো সেরকম না। এখানে তো বর্তমান সরকার অনেক উন্নতি করছেন।
: রাখুন তো, উন্নতি! কিছুদিন ভালো ছিল। এখন টাকার ভাগযোগ চলছে।

আমি অমনোযোগী হয়ে গেলাম। রাস্তায় অজস্র বিলবোর্ড। ‘কন্যাশ্রী এখন বিশ্বশ্রী’। সরকারি প্রকল্পের এমন প্রচারণা সত্যিই বিরল। কলকাতা নয় শুধু পশ্চিমবঙ্গ জুড়েই কন্যাশ্রীর বিলবোর্ড। শুনেছি এটি অনেক বড় একটি প্রকল্প। মেয়েদের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই প্রকল্প জাতিসংঘের পুরস্কার পেয়েছে। পৃথিবীর ৬২ টি দেশের মধ্যে জনসেবার নিরীখে সেরা প্রকল্প বিবেচিত হয় এই প্রকল্প। প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৩ সালে। ইতোমধ্যে ৩৯ লাখ মেয়েশিশুর জীবন ও স্বপ্ন পাল্টে গেছে এই প্রকল্পের সুবাদে। সে কারণেই রাজ্য জুড়ে এই সম্মান অর্জনের প্রচারণা। আজকের দিনে প্রচারণারও ইতিবাচক দিক আছে। প্রচারেই প্রসার।

বিজ্ঞাপন

সড়কে আরেকটি বিলবোর্ডের দিকে দৃষ্টি আটকালো। ‘এশিয়ায় সেরা’ বড় করে লেখা; তারপর অপেক্ষাকৃত ছোট অক্ষরে আনন্দবাজার পত্রিকা। দূর থেকে ছোট অক্ষরগুলো পড়া যাচ্ছিল না। তারপরও সংবাদপত্রের এই সেরা তকমাটি কোন প্রকারের তা বোঝার চেষ্টা করলাম। একের পর এক বিলবোর্ড পেরিয়ে যাচ্ছে পড়তে পারছি না। একবার একটি জ্যামে আটকানোর পর সুযোগ হলো পড়ার। ‘এশিয়ার সেরা আনন্দবাজার পত্রিকা। মুদ্রণের গুণগত মাণের জন্য এশিয়ার সমস্ত সংবাদপত্রের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হয়ে স্বর্ণপদক জয়’। মাথায় কোনো মন্তব্য এলো না। শুধূ মনে হলো, একসময় আনন্দবাজার বলতো ‘পড়তে হয় নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়’ আর এখন বলে ‘এশিয়ার সেরা’। দুটি বিশেষণের মধ্যে কত ফারাক। এখন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিজেরই ঘোষণা করার দিন। বাণিজ্যির প্রচার সহযোগীরা ঢোল বাজানোর পরিকল্পনা যেভাবে দেয়, ঢোল সেভাবেই বাজে।

গাড়ি চলছে, যাচ্ছি রাজারহাট এলাকায়। নিউ টাউন বলে কথা। যেন মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়ায় যাচ্ছি। মাথার ওপর অ্যানাকুন্ডার মতো প্যাচানো ফ্লাইওভার। আর দুই পাশে চোখ ধাঁধানো ভবন। নতুন কলকাতা। কর্পোরেট বাণিজ্যের অফিস একের পর এক। বিশ্ববাণিজ্যের সংযোগটি ধরতে পারা যায়। ঘিঞ্জি কলকাতায় এই খোলামেলা বিশুদ্ধ বাতাসের আবাসন আর বাণিজ্যিক তৎপরতা এক নতুন গল্প। যাচ্ছি টাটা মেমোরিয়াল। রাস্তায় আধুুনিক একটি গেইটের দেখা মিলল। ড্রাইভার জানালেন, এটি কলকাতা গেইট। আজকের দিনের স্থাপনা। শৈল্পিক হালকা কিন্তু প্রকান্ড। জ্যামিতিক স্থাপনাটি খুব মনে ধরলো। রাস্তার দুপাশে দ্রুত উঠে যাচ্ছে বিশাল বিশাল বিল্ডিং। আধুনিক অবকাঠামো। পরিকল্পিত রাস্তা।

টাটা মেমোরিয়ালের গেইট দিয়ে একেবারে প্লাটফরমের কাছে। বিশাল হসপিটাল। গাড়ি থামতে লক্ষ্য করলাম ট্যাক্সির মিটারে উঠেছে ১৯৯ টাকা। ড্রাইভারকে বললাম একেবারে সমান সমান। আপনি জানলেন কি করে, এত টাকা হবে? বললেন, সাহেব গাড়ি চালাচ্ছি ৩০ বছর, শুধু এইটুকু জেনে রাখুন।

অন্যরকম গোছানো পরিপাটি এক সুুরম্য ভবন টাটা মেমোরিয়াল। মনে হয়না কলকাতা আছি। শুধু মানুষের মুখই কলকাতার পরিচয় জানান দেয়। লোকজনের কাছে শুনে ওষুধের ফার্মেসিতে গেলাম। কিন্তু বোঝা গেল ঠিক জায়গায় আসিনি। ফোন করে বিষয়টি নিশ্চিত করারও সুযোগ হলো না -মোবাইলে ব্যালেন্স শেষ। ফার্মেসিতেই জিজ্ঞেস করলাম ব্যালেন্স লোড করা যাবে কীভাবে? একজন দেখিয়ে দিলেন প্রায় এক কিলোমিটার দূরের একটি জায়গা। উপায় নেই, অগত্যা হাঁটছি। রাস্তার দুপাশে পরিকল্পিতভাবে বৃৃক্ষায়ণ। শান্ত স্নিগ্ধ ছায়া। প্রশস্ত ফুটপাতে বেশ কিছুদূর পর পর দুয়েকজনের দেখা মিলছে। ফুটপাত থেকে নেমে নদীর মতো চওড়া একটি মোড় পার হয়ে যেতে হলো ওপারে। সেখানে ফুডকোট। ঢাকায় কিছুদিন আগে জমে ওঠা তিনশ ফিট-এর মতো। অনেকগুলি খাবারের দোকান। দূর থেকে মনে হলো, এই ফাঁকা জায়গায় খাবারের এত দোকানের মানে কী? কাছে গিয়ে দেখলাম অন্যরকম দৃশ্য। কর্পোরেট তরুণ তরুণীদের অফিস ব্রেক বা কফি আওয়ারের মোক্ষম জায়গা এটি। বোঝা যায়, কলকাতাও সেই ‘লেড়ুয়া বিস্কুট আর মাটির খুরোয় চা’ এর দিন পেরিয়ে ঠিক কোন জায়গাটায় এসে গেছে। যেখানে কাউকে আলাদা করা যায় না।

স্থাপনাগুলো সুপরিকল্পিত, অফিস এলাকা থেকে খাবারের এলাকা অনেক দূরে। রাস্তায় কেউ কিছু ফেলছে না। সবাই সিগনাল দেখে রাস্তা পার হচ্ছে বিষয়গুলো সত্যিই আশা জাগানিয়া। আরো ভালো লাগলো কর্পোরেট ছেলেমেয়েদের সমতা দেখে। ছেলে আর মেয়েকে আলাদা করা যায় না। অফিস পাড়ায় চাউমিন আর চা কফির দোকানের সামনে সারি সারি চেয়ারে অফিস ইউনিফর্মে ছেলে মেয়ে একসঙ্গে বসে আড্ডা পেটাচ্ছে। সবাই নিশ্চিন্ত উদার ও সহজ। কোনো জড়তা শংকা নিরাপত্তাহীনতা নেই কারো মুখাবয়বে। তাদের কেউ বিরক্ত করছে না। কোনো ভিক্ষুক পর্যন্ত নেই সেখানে। অনেক ঘুরে ঘুরে আমি আমার ঔষধের জায়গাটিতে পৌঁছলাম। সেটি এক সুরম্য ভবনের লিফটের তিন। লিফটের দরজা খুলতেই চোখে পড়লো একটি দরজায় ‘গুগল প্লাস’ এর লোগো। অন্যান্য দরজাগুলিতেও বড় বড় ব্রান্ডের নাম। বোঝা যায়, বাণিজ্য আর কর্পোরেট সংস্কৃতি বিকাশ দেখতে কলকাতার নতুন শহরে আসতে হবে যাকে বলে ‘নিউ টাউন’।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

Bellow Post-Green View