চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Cable

ন্যায়বিচার নিশ্চিত ব্যর্থ হলে গণতান্ত্রিক সভ্যতা পরাজিত হবে: প্রধান বিচারপতি

Nagod
Bkash July

ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে গণতান্ত্রিক সভ্যতা পরাজিত হবে বলে সতর্ক করেছেন নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

Reneta June

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে দেয়া সংবর্ধনায় তিনি একথা বলেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন: রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের একটি অঙ্গ যদি দূর্বল বা সমস্যাগ্রস্ত হয় তাহলে রাষ্ট্রটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হতে পারে না। সে কারণে আমি বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রের অপর দু’টি বিভাগ তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিচার বিভাগের সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। রাষ্ট্রের সকল বিভাগ ও ব্যক্তিকে অবশ্যই বারবার স্মরণ করতে হবে যে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে গণতান্ত্রিক সভ্যতা পরাজিত হবে।

ন্যায়বিচার জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া জনগণের প্রতি দয়া নয় বরং এটি জনগণের সহজাত অধিকার উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন: এই অধিকারকে কেবল সাংবিধানিক অধিকার বলে সাব্যস্ত করতে রাজি নই। ন্যায়বিচারের সৌন্দর্য এবং আইনের রাজকীয়তা প্রকৃতপক্ষে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন বটে। সে কারণে দেশের সকল বিজ্ঞ বিচারককে নিরপেক্ষতার সাথে, নির্মোহ হয়ে, নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সহজাত অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার।

বিচার বিভাগে কোনো দুষ্ট ক্ষতকে ন্যূনতম প্রশ্রয় দেয়া হবে না উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন: সুপ্রিম কোর্টের সকল শাখাসমূহের অস্বচ্ছতা, অনিয়ম, অলসতা এবং অযোগ্যতাকে নির্মূল করতে যেকোন পদক্ষেপ গ্রহণে আমি সকলকে পাশে পাবো এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় যারা নিয়ামক শক্তি রয়েছেন তারা সকলে আমাদের প্রতি ইতিবাচক ও গঠনমূলক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিবেন এটা আমার একান্ত আবেদন। ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয় এমন সকল কারণ চিহ্নিত করে তা দূর করার জন্য আমরা বদ্ধপরিকর হবো।

দেশের অধস্তন আদালতে মামলা জট নিরসন তথা বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে ৮টি বিভাগে একজন করে হাইকোর্টের বিচারপতিকে প্রধান করে মনিটরিং সেল গঠন করা হবে জানিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন: প্রতিমাসে আমি তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রতিবেদন গ্রহণ করবো। পুরাতন মামলাগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে নিষ্পত্তির বিষয়ে সুপারভাইস এবং মনিটরিং করা হবে।

বিচার বিভাগকে নিয়ে আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে যেকোনো গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন: আপনারা যারা বিচার বিভাগের আলোচক ও সমালোচক বন্ধু রয়েছেন তারা বিচার বিভাগের সমস্যা উপলব্ধি করবেন। নিঃসংকোচে আলোচনা বা সমালোচনা করবেন, তবে রাষ্ট্র ও জনগণের বৃহত্তর কল্যাণকামীতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আদালত কক্ষে আয়োজিত এই সংবর্ধনায় উভয় বিভাগের বিচারপতিগণ, আ্যাটর্নি জেনারেল, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দসহ সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

‘রাজনৈতিক কারণে’ নিয়োগ থেকে বঞ্চিত
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতিকে অভিবাদন জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন: দুর্ভাগ্যজনকভাবে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে তৎকালীন প্রধান বিচারপতির সুপারিশ অগ্রাহ্য করে ২০০৩ সালে আপনাকেসহ ১৬ জন বিচারপতিকে স্থায়ী বিচারপতি নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। সেসময় আপনাদের তথা বিচার বিভাগের উপর এরূপ আঘাত ও হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সংবিধান অনুসৃত পথে আপনি এবং অন্য কয়েকজন বিচারপতি একটি রিট করেন এবং জনস্বার্থে সুপ্রিমকোর্টের একজন আইনজীবী মরহুম ইদ্রিসুর রহমান আরেকটি রিট করেন। সেই রিটের আদেশের ধারাবাহিকতায় স্থায়ী বিচারপতি হন।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন: ‘মাননীয় প্রধান বিচারপতি, আমাদের সকলেরই স্মরণ রয়েছে যে কয়েকদিন আগে সুপ্রিম কোর্ট দিবসের অনুষ্ঠানে মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্যে রায় ঘোষণার পর তার অনুলিপির কপি পাওয়ার জন্য বিচারপ্রার্থী জনগণের আদালতের বারান্দায় দীর্ঘ অপেক্ষার কথা বলেছিলেন। উন্মুক্ত আদালতে রায় ঘোষণার মাধ্যমে পক্ষগণ তা জানতে পারলেও, ঐ রায় সাক্ষরিত হয়ে বিচারপ্রার্থীর হাতে না পৌঁছানো পর্যন্ত তা কার্যকর করা যায় না। তাই ঘোষিত রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি দ্রুত প্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রয়োজন। আমি আশা করবো এ বিষয়ে আপনি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেবেন। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তিতে ও বিচারাধীন মামলার সংখ্যা হ্রাসের ক্ষেত্রে পুরনো মামলাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করলে দ্রুততম সময়ে মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে বলে বিশ্বাস করি।’

‘প্রতিটি ক্ষেত্রেই অহেতুক অতিরিক্ত পয়সা খরচ’
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কাজল বলেন: আমরা সকলেই জানি দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট হচ্ছে একজন বিচারপ্রার্থীর সর্বশেষ আশার ভরসার স্থল। তাই এই অঙ্গনকে কুলষমুক্ত রাখা, দুর্নীতি মুক্ত রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব। তবে আইনজীবী সমিতির সদস্য হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত কিছু সমস্যার মুখোমুখি হয়ে থাকি। যেমন, জামিন আদেশ প্রাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে আদেশ নামানো, আদেশ ডেসপাস করা প্রতিটি ক্ষেত্রেই অহেতুক নানাবিধ অতিরিক্ত পয়সা খরচ করতে হয়। অথচ আদালতে ফাইল আনা, ফাইল পাঠানো কিংবা আদেশ পাঠানো আইনগতভাবে অত্র আদালতের প্রশাসনিক দায়িত্ব। এটিই যে নিয়ম নবীন আইনজীবীরা আজ সেটি ভুলতে বসেছে। অনিয়ম এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, মনে হয় এসব প্রশাসনিক কাজ সংশ্লিষ্ট আইনজীবী কিংবা আইনজীবী সহকারীর দায়িত্ব। এছাড়া মামলা এফিডেভিট করে দায়েরের পর আদালত পর্যন্ত পৌছাতে এবং আদালতের আদেশের পর আদেশ পাঠানো পর্যন্ত পদে পদে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। কোনো মামলা জামিন কিংবা স্থগিতাদেশ বৃদ্ধির জন্য সময়মত নির্দিষ্ট আদালতে ফাইল না আসা কিংবা আদেশ সময়মত নিম্ন আদালতে না পৌছানোর ফলে জামিন প্রাপ্ত ব্যক্তির অহরহ নিম্ন আদালত কর্তৃক পুনরায় কারাগারে প্রেরণের ঘটনা ঘটছে। এই সকল সমস্যা সমাধানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করণীয় নির্ধারণ করার জন্য আপনার প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।

ব্যারিস্টার রুহুল কাজল বলেন: অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতে একতরফা শুনানী হয়ে থাকে। যেহেতু প্রতিটি আবেদনপত্রে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর মোবাইল নম্বর থাকে, তাই আপিল শুনানীর পূর্বে আপিলকারী পক্ষ কর্তৃক হাইকোর্ট বিভাগে মামলা দায়েরকারী আইনজীবীকে অবহিত করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে অবহিত করার বিষয়ে সহযোগীতা প্রদান করা হবে।

কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার রমনাথপুর গ্রামের আবদুর গফুর মোল্লা ও নূরজাহান বেগম দম্পতির সন্তান হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ১৯৫৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে খোকসা জানিপুর পাইলট হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। আইএসসি পাস করেন ১৯৭৪ সালে সাতক্ষীরার সরকারি পিসি কলেজ থেকে। এরপর বিএ পাস করেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে। আর এমএ পাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে। পরবর্তীতে ধানমন্ডি ‘ল’ কলেজ থেকে এলএলবি পাস করেন।

এরপর ১৯৮১ সালে ঢাকা জজ কোর্টে আইন পেশায় যোগ দেন হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। ১৯৮৩ সালে হাইকোর্ট বিভাগে এবং ১৯৯৯ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন তিনি। ২০০৯ সালে হাইকোর্ট ডিভিশনের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। ২০১৩ সালের ২৮ মার্চ আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। অবশেষে দেশের ২৩তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে গত ৩১ ডিসেম্বর শপথ নেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। তার বড় ভাই বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী আপিল বিভাগের বিচারপতি থেকে অবসরে গিয়েছেন।

BSH
Bellow Post-Green View