চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘নিরপেক্ষ সরকারের’ দাবি থেকে সরছে সকলে

‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের’ দাবি থেকে ক্রমে সরছে রাজনৈতিক জোট ও দলগুলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে রাজনৈতিক জোটগুলোর সংলাপ শুরুর পর থেকে বিস্ময়কর এই অগ্রগতি হচ্ছে। এ পর্যন্ত সরকারবিরোধী দুই জোটের সঙ্গে সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জোটে সংলাপের পর এই অগ্রগতির বিষয়টি লক্ষণীয়, যদিও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এটা স্বীকার করেনি, তবে তাদের বাচনভঙ্গিতে সেটা পরিস্কার; তারাও নির্বাচন করতে চায়। আর যুক্তফ্রন্ট তাদের প্রতিক্রিয়ায় ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে তারা শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচনে যেতে প্রস্তুত।

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মূল দাবি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। যুক্তফ্রন্টেও একই দাবি; আবার বাম গণতান্ত্রিক জোটের দাবিও অনুরূপ। এই তিন জোটের মধ্যে প্রথম দুই জোটের মধ্যে সরকারের সংলাপের প্রথম পর্যায় এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এবং তারা দুই রকমের বক্তব্য দিলেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে কোনো কথা বলেনি। ‘সমাধান পাইনি’ বললেও এই সংলাপের মধ্যেও আশার আলো দেখেছেন ফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা, যদিও ফ্রন্টের শরিক দল বিএনপি ইতিবাচক কথার চাইতে নেতিবাচক কথাতেই আগ্রহী।

তাদের এই প্রতিক্রিয়াগুলো যতটা না সংলাপকে কেন্দ্র করে তারচেয়ে বেশি রাজনৈতিক। কারণ সরকারের সঙ্গে সংলাপে তাদের মূল দাবি যেখানে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি সেখানে এটা নিয়ে সংলাপে আশাবাদী হওয়ার মত কিছু পায়নি তারা। এবং অনুমিতভাবে সেটাই ঘটছে। সংলাপে ক্ষীণ স্বরে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি ওঠলেও সরকারি তরফে এনিয়ে ইতিবাচক কিছু না বলে আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

সংলাপের পর পরই ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বলছিলেন, ‘আলোচনা ভালো হয়েছে’, যদিও তাৎক্ষণিকভাবে শরিক দল বিএনপির মহাসচিব বলেছিলেন ‘তারা সন্তুষ্ট নন’। মির্জা ফখরুলের এই অসন্তুষ্টি মূলত খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয় নিয়ে সরকারের সরাসরি কিছু না বলা, কিংবা দায়িত্ব না নেওয়া। তবে খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে দায় নাই কামাল হোসেনের। তিনি বিএনপি নেতা নন, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতেই তার রাজনীতি বা এই ফ্রন্ট গঠন তাও নয়। তার নেতৃত্বাধীন ফ্রন্টের শরিক দলের চেয়ারপারসন হিসেবে খালেদা জিয়ার প্রতি তার ‘সহানুভূতি’ থাকতে পারে, কিন্তু এই সহানুভূতিকে কেন্দ্র করে তার জোটের কার্যক্রম নির্দিষ্ট হওয়ার কথা নয়। এবং সেটাই ঘটছে। আর এটা কেবল সরকারের সঙ্গে সংলাপের সময়েই নয়, এর আগে থেকেই। ফলে দেখা যায় সিলেট, চট্টগ্রাম কিংবা আইনজীবী ফ্রন্টের আলোচনা সভায় দেওয়া বক্তৃতায় তিনি খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানাননি। অন্যেরা মনে করিয়ে দেওয়ার পর বলছেন, ‘এটা বলার কী আছে, সাত দফা দাবিতে ত আছে’! কোথাও এমনও বলছেন, ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়’! ড. কামাল হোসেনের এই ভূমিকা মূলত খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া। তিনি ভালো করেই জানেন সরকার খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কোন দায়িত্ব নেবে না, আদালতের ওপর ছেড়ে দেবে।

ফ্রন্টের প্রধান শরিক বিএনপির প্রতিনিধিরা ড. কামাল হোসেনের এই ভূমিকায় এখনও নিজেদের অসন্তুষ্টির কথা প্রকাশ করেনি প্রকাশ্যে। তবে এর প্রভাব যে খুব শিগগির পড়তে শুরু করবে তা বলাই বাহুল্য। এটা সময়ের অপেক্ষা কেবল, আর এ সময় আসবে হয়ত তখন যখন ঐক্যফ্রন্ট পুনর্বার সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসবে, অথবা আগে-পরে!

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে সক্রিয় থাকা নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না কেবল খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কথা বলছেন। কোন আলোচনায় খালেদার মুক্তি নিয়ে কথা উঠলে কামাল হোসেন নিজে এ নিয়ে কথা না বলে মান্নাকে বলতে বলছেন, অর্থাৎ ফ্রন্টের শীর্ষ নেতা হিসেবে কামাল এটা নিয়ে কথা বলতে তার অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন। ফলে কামাল হোসেনের কাছে খালেদার মুক্তি যে সর্বশেষ এবং প্রধান দাবি নয় সেটা প্রমাণ হচ্ছে। এমন অবস্থায় আগামির সকল আলোচনায় বিএনপির দাবি গুরুত্বহীন হিসেবে প্রতিপন্ন হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। নিজে দায়িত্ব না নিয়ে মান্নাকে যিনি আবার ফ্রন্টের মুখপাত্রও নন তাকে কেবল খালেদার মুক্তি নিয়ে কথা বলতে কামালের দায়িত্ব দেওয়ার এই ধারাবাহিকতায় এই সম্ভাবনাটা আরও প্রবল হচ্ছে।

সংলাপের পর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জানিয়েছে তারা ‘প্রকৃত সমাধান পাননি’। তবে সকল দাবির মধ্যে কেবল সভা-সমাবেশে সরকারের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে না বলে প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মামলাগুলো সম্পর্কে সরকার তাদের কাছে তালিকা চেয়েছে।

এদিকে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপের পরের দিনই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারার সভাপতি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপ করেছে। এই সংলাপ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন সংলাপে যুক্তফ্রন্টের নেতারা ‘ডমিনেট’ করেছে, এবং সরকার তাদের দাবিও মেনে নিয়েছে। ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ভিন্নমত খুঁজে পাওয়া যায়না বি. চৌধুরীর বক্তৃতায়ও। তিনি জানিয়েছেন ‘আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে’। বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান বলেছেন, তারা শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতেও রাজি। অর্থাৎ দায়িত্বশীলদের সকলের বক্তব্যে কোনো ভিন্নতা পাওয়া যায় না বলে যুক্তফ্রন্ট যে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি হয়ে গেছে সেটা পরিস্কার।

Advertisement

সংলাপে যুক্তফ্রন্টের বি. চৌধুরীও সাত দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। সে দাবিগুলোর মধ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি ব্যতিরেকে অনেকগুলো দাবির মিল পাওয়া যায়। যুক্তফ্রন্টের দাবির মধ্যেও আছে সংসদ ভেঙে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। এই সংসদ ভাঙা সম্পর্কে ওবায়দুল কাদের বলছেন, সংসদ বর্তমানে নিস্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে, আলাদা করে সংসদ ভাঙার দরকার নাই। নির্বাচনে সরকার নিরপেক্ষ ভূমিকায় থাকবে বলেও আশ্বস্ত করা হয়েছে, নির্বাচনে সেনা মোতায়েন না করে সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার কথাও বলছে সরকার। এসব বিষয়ে রাজি হয়েছে যুক্তফ্রন্ট।

এই দুই জোটের বাইরে ৫ নভেম্বর এরশাদের সঙ্গে সংলাপের সূচি রয়েছে সরকারের। গণভবনে আমন্ত্রণ পাওয়ার পর এরশাদ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমালোচনা করে বলেছেন ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপ সফল হবে না কারণ তারা শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে চায় না। এরশাদের দল জাতীয় পার্টি শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচনে যাবে বলে সংলাপের আগেই জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। দলের উদ্দেশ্য সম্পর্কেও ইঙ্গিত দিয়েছেন এরশাদ, বলছেন কোথায় কোন আসন চান তিনি এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন। অর্থাৎ এরশাদের এই আমন্ত্রণ গ্রহণের উদ্দেশ্য মূলত ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রশ্নে। নির্বাচন হলেও তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছেন, নির্বাচন না হয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেউ নির্বাচিত হলেও তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছেন।

সংলাপের চলমান এই হাওয়ার আঁচ লেগেছে বাম গণতান্ত্রিক জোটেও। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সহ আটটি দল আছে এই জোটে। বাম জোট নিজেরা সংলাপের চিঠি দেবে না জানালে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে টেলিফোনে তাদেরকে সংলাপের জন্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এরবাইরে ‘আসল বিএনপি’ নামের কথিত একটি দলও প্রধানমন্ত্রীকে সংলাপের জন্যে চিঠি দিয়েছে। কেবল এই দল ও জোটগুলোই নয় এ পর্যন্ত ৩২ দল সংলাপের জন্যে সরকারের কাছে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এত এত দল ও জোটের সংলাপের এই আগ্রহ আদতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সরকারের সংলাপের গুরুত্বকে হালকা করে দিচ্ছে। যদিও এ ফ্রন্টই সর্বাধিক গুরুত্বের দাবি রাখে।

সংলাপের এই সম্প্রসারণ আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর থেকে ‘চাপ’ সরিয়ে দিচ্ছে। তার ওপর বি. চৌধুরীর যুক্তফ্রন্ট সহ এরশাদের জাতীয় পার্টি যখন শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি হয়ে আছে সেক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেরও এই পথে পা দেওয়া ছাড়া উপায় থাকছে না। এর অন্যথা হলে আন্দোলন, কিন্তু এই আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করাটা তাদের পক্ষে অসম্ভব প্রায়, অন্তত আমাদের অতীত সেটাই বলে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা জানানোর ক্ষমতা বিএনপির নেই, তারা সরকারবিরোধী এই ফ্রন্টের শরিক দল। এমনকি এই ফ্রন্টের মুখপাত্রও নন বিএনপির কেউ। ফ্রন্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ড. কামাল হোসেন ও আ স ম রব ছাড়া আর কারও বক্তব্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অফিসিয়াল বক্তব্য নয়। এমন অবস্থায় ফ্রন্টের মাহমুদুর রহমান মান্না কিংবা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যতই বক্তব্য দিন না কেন দিনশেষে সেটা ঐক্যফ্রন্টের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়, এবং কামাল হোসেনও বলতেও পারবেন ‘ওগুলো তাদের নিজস্ব বক্তব্য’।

সংলাপের আগে থেকেই সরকার বলছে সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নাই তাদের, তারা সংবিধানের বাইরে যাবে না। বর্তমানে সংবিধানেও সুযোগ নাই দল নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের। এটা কামাল হোসেন সহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সকলে জেনেই গেছেন সংলাপে। এমন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়া ছাড়া পথও সীমিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেরও।

এমন অবস্থায় ঐক্যফ্রন্ট শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে শরিক দল বিএনপিকে হয় সিদ্ধান্ত মেনে নির্বাচনে যেতে হবে, না হয় ফ্রন্ট ছাড়তে হবে। নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে ফ্রন্ট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা নির্বাচনে অংশ নেওয়া দুটোই তাদের জন্যে কঠিন বিষয় বৈকি! এছাড়া শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে গেলে তারা কেন ২০১৪ সালের নির্বাচনে গেল না, প্রশ্ন ওঠাও তাই স্বাভাবিক।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর তাদের একাধিক কর্মসূচি সরকারের দায়িত্বশীলদের কপালে চিন্তার যে ভাঁজ ফেলেছিল সেটা উবে গেছে সংলাপ শুরুতেই। এই সংলাপ প্রধানমন্ত্রীকে আরও ক্ষমতাশালী করেছে। একই সঙ্গে দেশের রাজনীতির পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এখন তাই ‘দল নিরপেক্ষ সরকারের’ দাবি থেকে ক্রমে সরতে হচ্ছে সকলকেই। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কিংবা বাম গণতান্ত্রিক জোট আসবে কীনা এটা এখনও নিশ্চিত না হলেও তারাও হয়ত ঝুঁকবে সে পথেই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)