চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘নিজেরাই বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছি’

পাইরেসির শিকার ‘রেহানা মরিয়ম নূর’: অভিযুক্তদের চিহ্নিত করতে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

গেল জুলাইতেই কান চলচ্চিত্র উৎসবের বদৌলতে দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করে বাংলাদেশের সিনেমা ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। সিনেমা বিষয়ক পৃথিবীর দাপুটে সব কাগজ ও অনলাইনে ছবিটি নিয়ে কথা বলেন সিনে-সমালোচকরা। সিনেমাটি নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন দেশের মানুষও।

‘রেহানা মরিয়ম নূর’ এর অর্জনে গৌরববোধ করেছেন দেশের সিনেমা সংশ্লিষ্ট সংগঠন থেকে শুরু করে সচেতন নাগরিক সমাজও। সিনেমার নির্মাতা ও কলাকুশলীদের বাহবা দিতে কার্পণ্য করেননি কেউ। এমন অর্জন আর গৌরব বোধের এক মাস পূর্ণ না হতেই ‘অঘটন’ এর শিকার ‘রেহানা মরিয়ম নূর’।

হ্যাঁ, সিনেমার সবচেয়ে বড় শত্রু ‘পাইরেসি’র কবলে পড়েছে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের পরিচালনায় বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। সোমবার (১৬ আগস্ট) থেকে সিনেমাটি ইন্টারনেটে ছেড়ে দিয়েছে একটি চক্র। বিভিন্ন ওয়েব সাইট ছাড়াও গুগল ড্রাইভে রেখে তার লিঙ্ক ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে মানুষের ইনবক্সে। শুধু তাই নয়, ইউটিউবেও একের পর এক আপলোড করা হচ্ছে বলে চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান সিনেমার নির্বাহী প্রযোজক এহসানুল হক বাবু।

মঙ্গলবার দুপুরে তিনি জানান, আমরা সোমবার আচমকাই জানতে পারি ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ পাইরেসির শিকার হয়েছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। এটা আমাদের কল্পনাতেও ছিলো না। শুনি, মানুষের ইনবক্সে ইনবক্সে সিনেমাটির গুগল ড্রাইভ শেয়ার করা হচ্ছে। মর্মাহত হয়ে পড়ি। দেরী না করে প্রশাসনের দারস্থ হয়েছি। তারা পাইরেসি ঠেকাতে সব রকম ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছেন।

কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পর চলতি সপ্তাহে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ মেলবোর্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অনলাইন স্ট্রিমিং হয়েছে। সেখানে অনলাইনে টিকেট কেটে বাংলাদেশের দর্শকরাও সিনেমাটি দেখার সুযোগ পেয়েছেন। তাহলে কি সেখান থেকেই সিনেমাটি হাতে পেলো ফাঁসকারী চক্রটি? এ বিষয়ে বাবু বলেন, ‘আমরা এখনও এ বিষয়ে নিশ্চিত নই। কীভাবে কোথা থেকে ছবিটি ফাঁস হলো।’

‘রেহানা মরিয়ম নূর’ এর পাইরেসির সাথে কারা যুক্ত, এ বিষয়ে প্রশাসন থেকে ধারণা পাওয়া গেছে কিনা? এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রযোজক জানান, ডিএমপি’র কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) থেকে একটা শর্টলিস্ট প্রস্তুত করা হয়েছে। খুব দ্রুতই তারা তাদের কাজ শুরু করবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেলের দিকে তারা আমাদের ডেকেছেন। তখন বিস্তারিত জানতে পারবো।

পাইরেসির শিকার হওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ এর পুরো টিম। বিপর্যস্ত নির্বাহী প্রযোজক বাবু ও।

বিজ্ঞাপন

হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, নিজেরাই বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছি। এসব কারণেই আমাদের চলচ্চিত্রের উন্নতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, হবে। নিজের দেশের, নিজের চেনাগণ্ডির মানুষেরা জানতে পারছে যে সিনেমাটা পাইরেট হয়ে গেছে; তারপরেও সহযোগিতামূলক আচরণ না করে দেখা গেছে এফটিপি সার্ভারে দিয়ে দিচ্ছে, গুগল ড্রাইভে রেখে সেটার লিঙ্ক বিতরণ করছে অন্যদের! এটা সত্যিই দুঃখজনক। আমরা যেভাবে সিনেমা করি, তাতে একজন প্রযোজকের সর্বস্ব ইনভেস্ট থাকে। এরকম অঘটনের শিকার হলে কী অবস্থা হয়, কেউ ভেবে দেখেছেন!

তবে পুরো টিম আশায় আছেন, যারা অনলাইনে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ সিনেমাটি ছড়িয়েছেন, আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনী খুব দ্রুতই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন। এ বিষয়ে তৎপরতার কথা জানিয়েছেন কাউন্টার টেররিজমের অতিরিক্ত উপকমিশনার খন্দকার আরাফাত লেনিন।

অভিযোগ পাওয়ার পরেই লেনিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছেন, সম্প্রতি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাংলাদেশি সিনেমা ‘রেহেনা মরিয়ম নূর’ কিছু অসাধু ব্যক্তি কতৃর্ক পাইরেসির শিকার হয়েছে এবং অনেকে তা নিজ ডিভাইসে ডাউনলোড করেছেন। সিনেমাটির প্রযোজক, পরিচালকের অভিযোগের ভিত্তিতে ডিএমপি’র কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের চীফ উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক জনাব মো. আসাদুজ্জামান বিপিএম (বার) স্যারের সার্বিক নির্দেশে এ সংক্রান্ত আইনানুগ ব্যাবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন। এই চক্রকে অতি দ্রুত আইনের আওতয়া নিয়ে আসা হবে।

যারা বিভিন্নভাবে সিনেমাটি নিজেদের ডিভাইসে ডাউনলোড করেছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা অবৈধভাবে বিভিন্ন ডিভাইসে উক্ত সিনেমাটি ডাউনলোড করেছেন, তাদের বিনীত অনুরোধ করবো দ্রুত আপনার ডিভাইস থেকে সিনেমাটি ডিলেট করে দিন।’

কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথম বাংলাদেশি সিনেমা হিসেবে অফিশিয়ালি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ দেখার জন্য মুখিয়ে ছিলেন বাংলাদেশের বিরাট এক দর্শকশ্রেণি। বিষয়টি মাথায় রেখে সিনেমাটি মুক্তির পরিকল্পনাও করা হচ্ছিলো সেভাবে। কিন্তু তার আগেই এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনার শিকার হলো সিনেমাটি।

তবে যাই ঘটুক না কেন, আগামি অক্টোবরে সিনেমাটি দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পরিকল্পনার কথাও জানালেন নির্বাহী প্রযোজক। এ বিষয়ে তিনি বলেন, অক্টোবরেই সিনেমাটি মুক্তির পরিকল্পনা ছিলো আমাদের। এরমধ্যেই যেহেতু এমন অঘটন ঘটে গেলো, তবু আশা করি অক্টোবরেই প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটি রিলিজ দিয়ে দিবো।

প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষক রেহানা মরিয়ম নূরকে কেন্দ্র করেই আলোচিত ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ সিনেমার গল্প। যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন আজমেরী হক বাঁধন। এছাড়াও আরো অভিনয় করেছেন আফিয়া জাহিন জাইমা, কাজী শামী হোসেইন, আফিয়া তাবাসসুম বর্ণ ও সাবেরী আলম প্রমুখ।

পোটোকল ও মেট্রো ভিডিও’র ব্যানারে ছবিটি প্রযোজনা করেছেন সিঙ্গাপুরের প্রযোজক জেরেমী চুয়া, নির্বাহী প্রযোজক এহসানুল হক বাবু এবং সহ-প্রযোজনা করেছেন রাজীব মহাজন, আদনান হাবিব, সাঈদুল হক খন্দকার।

বিজ্ঞাপন