চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নারায়ণগঞ্জে অস্ত্র প্রদর্শনের প্রভাব কি সংসদ নির্বাচনে পড়বে?

আলোচিত ত্বকী হত্যা, সাত খুন, গুম-অপহরণসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য ‘আতঙ্কের নগরী’তে রূপান্তরিত হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ। ফলে অন্যান্য জেলাবাসীর কাছে নারায়ণগঞ্জ মানেই দমবন্ধ করা এক আতঙ্কের নাম। মাঝে কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকায় নারায়ণগঞ্জ সম্পর্কে কিছুটা ভয়, আতঙ্ক সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে দূর হতে শুরু করেছিল। কিন্তু মঙ্গলবার হকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও সংসদ সদস্য শামীম ওসমান গ্রুপের মধ্যে যে সংঘর্ষের সৃষ্টি হলো তাতে করে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ খ্যাত এই শিল্প নগরী।

এই সংঘর্ষের জন্য শামীম ওসমানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উস্কানিই দায়ি বলে মনে করেন অনেকে। কেননা, হকার সমস্যা নিয়ে চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে সোমবার প্রকাশ্যেই চাষাড়ায় হকার সমাবেশ থেকে মঙ্গলবার ফুটপাত দখল করার নির্দেশ দিয়ে তার সমর্থিত নেতাকর্মীদেরকেও হকারদের সাথে মাঠে থাকার হুকুম দিয়ে বলেছিলেন, “হকারদের সিটি করপোরেশন কিংবা পুলিশ যারাই উচ্ছেদ করতে আসবে তোমরা যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রতিরোধ করবে।” মূলত তার এই মারমুখি নির্দেশনা পেয়েই উজ্জীবিত হয়ে ওঠে হকারসহ তার কর্মী বাহিনী।

শামীম ওসমানের এমন ঘোষণার পরপরই মেয়র আইভী এদিন রাতেই পাল্টা ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, “ফুটপাত জনগণের। এখানে কোন হকার বসতে পারবে না। জনগণের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে নগরবাসীকে নিয়ে মঙ্গলবার ফুটপাতে নামবো। দরকার হলে গুলি খাবো তবুও ফুটপাত দখল হতে দেবো না।” যেই কথা সেই কাজ। মঙ্গলবার তিনি প্রায় দুই হাজারের মতো সাধারণ মানুষ ও তার সমর্থিত নেতাকর্মী নিয়ে নগর ভবনের সামনে জড়ো হন এবং তাদের নিয়ে নগর ভবন থেকে ফুটপাত ধরে পায়ে হেঁটে চাষাড়া অভিমুখে রওনা দেন।

অপরদিকে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ি শামীম ওসমান পন্থী বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী হকারদের নিয়ে সমবেত হন চাষাড়া শহীদ মিনারে। তারাও ফুটপাত দখল করতে গিয়ে নগরীর লুৎফা টাওয়ারের কাছে আইভী পন্থীদের মুখোমুখি হয়ে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এসময় নিয়াজুল ইসলাম পিস্তল বের করে মেয়রের দিকে তেড়ে যান এবং গুলি করার হুমকি দিলে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে যায়। সংঘর্ষ চলাকালে শামীম ওসমান পন্থী নিয়াজুল, শাহ নিজাম বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই গোটা শহর রণক্ষেত্রে পরিণিত হয়। এরমধ্যে চাউর হয় মেয়র আইভী আহত হয়েছেন। এ খবরে নগরীর সাধারণ মানুষজনও আইভী পন্থীদের সাথে এসে যুক্ত হয়ে শামীম পন্থীদের দিকে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। এক পর্যায় শামীম ওসমান সমর্থকরা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

মঙ্গলবারের এই সংঘর্ষে আইভী অথবা শামীম- কে কতোটা লাভবান হলো? সে হিসাব না কষে সোজাসুজি এটুকু বলে দেয়া যায়, এতে যা ক্ষতি হওয়ার তা সবটাই হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। যার প্রভাব আগামী একাদশ নির্বাচনে পড়বে বলেই ধারণা করছি। কেননা, উভয় গ্রুপই আওয়ামী লীগ মনোনিত মেয়র ও সংসদ সদস্য। ফলে এই দায় কোনোভাবেই ক্ষমতাসীন দল এড়াতে পারে না, সম্ভবও নয়। কেননা, সংঘর্ষ চলাকালে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে তেড়ে আসা এবং গুলি করার ব্যাপারটি সাধারণ মানুষের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। এর আগেও রাজধানীতে ডা. ইকবাল এভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে যখন হামলা চালিয়েছিলেন তা-ও মেনে নিতে পারেনি মানুষ। ফলে ডা. ইকবালের ওই ঘটনাটি ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছিলো ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, যা এখনও ঘুরে ফিরে আলোচনায় ওঠে আসে। ফলে এই সংঘর্ষে প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার আগামী নির্বাচনে যে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে কি?

বিজ্ঞাপন

তবে হকার উচ্ছেদ নিয়েই যে এমন সংঘর্ষ তা কিন্তু নয়। আইভীর প্রতি শামীম ওসমানের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ মাত্র মঙ্গলবারের এই সংঘর্ষ। বহু আগের থেকেই এমন একটা সুযোগ হয়তো খুঁজছিলেন সাংসদ শামীম ওসমান। ফলে হকার ইস্যুকে তিনি মোক্ষম হাতিয়ার করে তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে সংঘর্ষের রূপ দিলেন। মেয়র আইভী ও শামীম ওসমানের সম্পর্কে বৈরিতা বেশ কয়েক বছর ধরে। মূলত ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে আইভী’র কাছে পরাজিত হওয়ার পর থেকেই অনেকটা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন শামীম ওসমান। সেই সূত্র ধরেই কারণে অকারণে বিরোধিতার স্বার্থেই বিরোধিতায় জড়িয়ে পড়েন তারা দু’জন।

ত্বকী, আশিক, চঞ্চল, রাসেলসহ বেশ কিছু আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় ছিলেন মেয়র আইভী। আবার এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগের তীরটিও আইভী ছুড়ে আসছিলেন শামীম ওসমানের দিকে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন অবৈধ স্ট্যান্ড, দখল, চাঁদাবাজির অভিযোগের নির্দেশদাতা হিসেবে শামীম ওসমানকেই অভিযুক্ত করে বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন মেয়র। মেয়রের এমন দাবির সাথে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটিসহ বিভিন্ন সংস্কৃতি সংগঠন ও বিশিষ্টজনরাও একমত পোষণ করে এসব ঘটনার বিচার ও বন্ধের দাবি করে আসছিলেন।

মূলত এসব কারণে নানা ভাবেই ইমেজ সঙ্কটে পড়েন শামীম ওসমান। হ্রাস পেতে থাকে তার জনপ্রিয়তাও। ফলে তিনি অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন নিজের হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধারে। কিন্তু এবার উস্কানি দিয়ে এই সংঘর্ষের ঘটনা সৃষ্টি করায় এই সাংসদ নিজের হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধার তো দূরের কথা এখন অনেকটা অস্তিত্ব সঙ্কটেই পড়ে গেছেন। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন এই সংঘর্ষের ব্যাপারে স্পষ্ট করেই বলেছেন, “যেহেতু ডা. আইভী এবং শামীম ওসমান উভয়ই ‘নৌকা’ প্রতীকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি সেক্ষত্রে এমন একটি অপ্রীতিকর ঘটনা নারায়ণগঞ্জবাসীর কাম্য ছিল না। এ ঘটনার মাধ্যমে শামীম ওসমানের ব্যক্তিগত ইমেজের পাশাপাশি রাজনৈতিক ইমেজও হুমকির মুখে পড়বে বলে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে মনে করি।”

নানা ভাবে বিতর্কে জড়িয়ে পড়া সাংসদ শামীম ওসমানের সামনে হারানো ইমজে পুনরুদ্ধারে মোক্ষম একটি সুযোগ ছিলো এই হকার ইস্যু। কিন্তু তিনি সে সুযোগটি লুফে নিতে পারেননি। হকার ইস্যু নিয়ে নগরীর প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই যখন আইভীকে সমর্থন করে আসছেন সেখানে তিনি গুটি কয়েক হকারদের পক্ষে না গিয়ে হকার উচ্ছেদের ঘটনাকে সমর্থন দিয়ে হকারদের নিবৃত করতে পারতেন। এতে করে তার প্রতি নগরবাসীর নেগেটিভ ধারণা কিছুটা হলেও পরিবর্তন হতো। কিন্তু তিনি সে পথে না গিয়ে লাখো মানুষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একাই যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এতে করে তিনি একদিকে নিজের পায়ে নিজে যেমন কুড়াল মারলেন তেমনি আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অবস্থান অনেকটাই টালমাটাল করে দিয়েছেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আর বেশি বাকি নেই। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় বারের মতো দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সরকার গঠন করে। এ পর্যন্ত বর্তমান সরকার নানা উন্নয়নমুখি কর্মকাণ্ডে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতাও তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন ইস্যু নিয়েও সরকার বিরোধী আন্দোলনে তেমন একটা সুবিধে করতে পারেনি বিরোধী শক্তিরা। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে যে ঘটনা অর্থাৎ প্রকাশ্যে ক্ষমতাসীনদের অস্ত্র প্রদর্শন এবং গুলি নিক্ষেপের ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এ ঘটনা ম্লান করে দিবে সরকারের শক্তিশালী ইমজকেও। তাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উচিত, প্রকাশ্যে এমন অস্ত্রের প্রদর্শন যারাই করে থাকুক এবং যারাই সংঘর্ষের ইন্ধনদাতা হোক, তাদের বিরুদ্ধে দলগত এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

বিজ্ঞাপন