চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নানাবিধ সংকটে শিশুরা, অবাধ্য হচ্ছে কেউ কেউ

করোনাকাল

রাজধানী ঢাকার একটি স্কুলে পড়াশোনা করে ইমরান। গত মার্চ মাস থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া এই শিক্ষার্থীর স্কুল বন্ধ। দীর্ঘসময় ধরে ঘরে বন্দী ইমরানের মাঝে মাঝেই মন ‘খুব খারাপ’ হয়।

তার বক্তব্য, বাসায় একা একা খেলতে ভালো লাগে না। স্কুলে গেলে অনেক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়, খেলা হয়। সেটাও এখন বন্ধ। তার মন খারাপের কারণ এটাই।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ইমরান নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই বাবা-মায়ের। তার বাবা আউলাদ হক বললেন, ‘বাসায় থেকে ও নানান সময়ে নানান কিছু করতে চায়। সবতো আর করতে দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে ওর মন খারাপ হয়ে যায়।  আবার বাইরে যেতে দিতেও পারি না করোনাভাইরাসের ভয়ে। ফলে বেশিরভাগ সময় মোবাইল নিয়েই সময় কাটায় সে।’

এতটা দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ইমরানের মতো বাসায় বন্দী অসংখ্য শিশু। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ কারণে তাদের উপর বড় রকমের মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেই চাপ থেকে তৈরি হওয়া সংকট ঠিক কতটা প্রকট? কিভাবে তা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে?

এ নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন মনোবিদের সঙ্গে। তাদের একজন মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো কামাল উদ্দিন। আরেকজন ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট সাবিহা জাহান। তিনি ক্লিনিকাল সাইকোলজি বিভাগের নাসিরুল্লাহ সাইকোথেরাপি ইউনিটের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর। তারা দু’জনই এমন সংকটের নানান দিক তুলে ধরেছেন।

অধ্যাপক ড. মো কামাল উদ্দিন বলেন, ‘এটা তো পরিস্কার যে আমরা স্বাভাবিক জীবনে নেই। আর যেটা স্বাভাবিক নয়, সেটা ভালো হয় কিভাবে? একটা ভিন্ন ধরনের জীবনে আমরা সবাই আছি, আমাদের ছেলেমেয়েরাও আছে। তবে সন্তানদের উপর তার প্রভাব কতটা পড়বে তা নির্ভর করবে সন্তানের বয়স, পারিবারিক কাঠামোর উপর। স্কুলে গেলে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে তাদের ভাবের আদান-প্রদান হতো।  সেটা গত কয়েকমাসে পুরোপুরি বন্ধ। বাসায় থাকলে সন্তানদের সবকিছু করতে দেয় না বাবা মা। ফলে তাদের শারীরিক নড়াচড়াও কম হচ্ছে। এসবের তো একটা বড় প্রভাব আছে সন্তানের উপর।’

তবে পরিকল্পনা করতে পারলে সেসব থেকে কিছুটা রক্ষা করা সম্ভব হতো বলে মনে করেন এই মনোবিজ্ঞানী।

বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেই দেখেছি এই সময়ে ছেলে মেয়ে ও বাবা-মায়ের জন্য সোসাইটি থেকেই কিছু অ্যাক্টিভিটি ছিলো। সেখানে তাদের জন্য সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে বাবা-মাদের এসব সমস্যা সম্পর্কে বোঝানো এবং সমস্যা থেকে বাঁচানোর জন্য কি করা যেতে পারে সে সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। আমরাও আমাদের স্কুলগুলোর শিক্ষকদের জন্য কিছু সেমিনার আয়োজন করতে পারতাম। তাহলে তারাও বুঝতে পারতো কিভাবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আরো বেশি সম্পৃক্ত থাকা যাবে। এই লম্বা সময়ে শিক্ষকরাও পারতেন ফোনকলে বা গ্রুপ ভিডিওতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হতে। তাতে করে শিক্ষক-ছাত্রের মধ্যে লম্বা সময়ের ব্যবধানটা মিটে যেতো।’

বিজ্ঞাপন

বাবা-মায়েদের জন্য এই সময়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিলো বলে মনে করেন তিনি।

তার মতে, ‘ঘরে থাকলে অনেক কিছুই সন্তানদের করতে দেয় না বাবা-মা। কিন্তু এভাবে কিছু করতে না দেয়ার কারণে সন্তান বিচ্ছিন্ন বা একাকী বোধ করতে পারে। আবার ১৩-১৪ বছর বয়সের দিকে সন্তানের মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে, সেসব সম্পর্কেও আমাদের বাবা-মাদের ধারণা অনেক কম।  ফলে এই সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তাদের দূরত্ব তৈরি হয়, সন্তান বন্ধুদের সঙ্গে বেশি স্বতস্ফূর্ত থাকে।  করোনা মহামারীর সময়ে বন্ধুদের সঙ্গেও যোগাযোগ কম হচ্ছে। ফলে শিশুদের মনের ভাব ঠিকমতো প্রকাশ করার জায়গা থাকছে না। সেসব বিষয় বাবা-মাকে অবশ্যই বুঝতে হবে।’

সমস্যা সমাধানে ব্যক্তি পর্যায়ে তো বটেই রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে তাহলে সমাধান সহজ হবে জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এই করোনা মহামারীর সময়ে সিটি কর্পোরেশনগুলো পারতো স্কুলগুলোকে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে মনোবিজ্ঞানীদের সঙ্গে সেশনে বসাতে। তাহলে একসাথে অনেকের অনেকগুলো সমস্যার সমাধান উঠে আসতো।  অনেকের শেয়ারিংও হতো। স্থানীয় সমস্যা তো স্থানীয়ভাবেই সমাধান করতে হবে।’

আবার আমাদের গণমাধ্যমেরও এই সময়ে অনেক কিছু করার ছিলো জানিয়ে তিনি যোগ করেন, ‘টিভিতে আমরা এখন এমন কোনো অনুষ্ঠান পাই না, যেটা শিশুদের ব্যস্ত রাখবে।  বা ছেলেমেয়েরা কিছু শিখতে পারবে। তারা সারাদিন ওই বড়দের জন্য বানানো নাটক-সিনেমাই দেখে অথবা বিজ্ঞাপনচিত্র দেখে। ফলে গৃহবন্দী থেকে বিজ্ঞাপন দেখে দেখে আরো বেশি বেশি জাঙ্কফুড খাওয়ার অভ্যাস হয় বা স্থূলতায় আক্রান্ত হয়। মানুষ বড় বড় সমস্যার সমাধান করে সামনের দিকে এগিয়েছে। ফলে এসব সমস্যার সমাধানও মানুষ খুব সহজেই করতে পারবে। শুধু দরকার সঠিক পরিকল্পনা।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিকাল সাইকোলজি বিভাগের নাসিরুল্লাহ সাইকোথেরাপি ইউনিটের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট সাবিহা জাহান মনে করেন, ‘শিশুরা যদি স্কুলে যেতো তাহলে তাদের সাথে অনেক শিক্ষার্থীর ভাব আদান প্রদান হতো, খেলাধূলা হতো, তাতে অন্তত তাদের কিছুটা এনার্জি বার্ন হতো। সেই সবের কিন্তু শরীর ও মনের উপর বেশ প্রভাব রয়েছে আর একটা অন্যটার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।  ফলে বাসায় থেকে থেকে সন্তানেরা দুইটা জিনিসের উপর নির্ভর হয়ে পড়ছে।  কখনো কখনো তার একটি হয়ে পড়ছে ডিভাইস। অনেকের মধ্যে হতাশার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। আবার যারা আর একটু ছোট। যেমন যাদের বয়স হয়তো ৭-৮-৯ বছরের মধ্যে। তারা অভিভাবকের কোনো কথাই শুনতে চাইছে না। এমন সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।’

সমস্যার সমাধানে দুইটি বিষয়ে নজর দেওয়ার কথা বললেন এই মনোবিদ। সেগুলো হলো- সম্পর্ক ও সামাজিকতা। এই সময়েও শিশুর সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ঠিকঠাক রাখার চেষ্টা করতে হবে।

‘সেটা বাবা-মায়ের সাথে তার সম্পর্ক হোক বা শিক্ষকের সঙ্গে বা বন্ধুদের সঙ্গে। ফোনে বা ভিডিও কলে এর মধ্যেও সবার সঙ্গে ঠিকঠাক যোগাযোগটা রাখতে পারলে কম প্রচেষ্টাতেই সবকিছু মানিয়ে চলা খুব কঠিন হবে না। আর নজর দিতে হবে সামাজিকতার দিকে। যেসব শিশুদের আগে থেকেই সামাজিকতার খানিকটা ঘাটতি ছিলো তারা এই সময়ে বেশি ভুগেছে। ঠিকঠাক মতো সবার সঙ্গে মিশতে না পারায় শিশু আরও বেশি বিচ্ছিন্ন বোধ করছে।’

‘‘ফলে তারা সময়টা টিভি দেখে বা ইউটিউবের সবগুলো সিরিজ দেখে কাটিয়ে দিতেই পছন্দ করছে। জুম ক্লাসে শিক্ষকরাও এসব শিক্ষার্থীদের আরো বেশি কথোপকথনে আনার চেষ্টা করতে পারেন। তাদের আরো কি কি কার্যক্রমে যুক্ত করা যায় সেই বিষয়ে নজর দিতে পারেন। এভাবেই এসব শিশুদেরও মানসিক অবস্থায় পাশে থাকতে হবে।’’

বিজ্ঞাপন