চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দেশপ্রেমের ঘাটতি

বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে অসংখ্য আন্দোলন, সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং বিসর্জনের সম্মিলনে সংগ্রামী মানুষদের যুগপৎ বিশেষ করে একাত্মতার মাধ্যমে দেশটির জন্ম ও অগ্রযাত্রা শুরু হয়। যুগে যুগে কালের বিবর্তনে, সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের জন্য নিবেদিত প্রাণের মানুষগুলোকে আমরা যেমন দেশপ্রেমিক হিসেবে আখ্যায়িত করি ঠিক তেমনিভাবে যারা গঠনমূলক কাজে বিরোধিতা করে শত্রুপক্ষকে সাহস শক্তি যুগিয়েছে, দেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যহত করছে তাদেরকে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে থাকি।

ইতিমধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে ১৯৫২, ১৯৬৬, ১৯৭০ ও ১৯৭১ সালে উদ্ভূত আন্দোলন সংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশে সৃষ্টি হবে না তথাপি আমরা নতুন প্রজন্মের তথা বর্তমানে বাংলাদেশে যারা বাস করছে তারা কিভাবে দেশপ্রেমের মহিমায় উজ্জীবিত হয়ে দেশ গঠনে ও সুন্দর রাষ্ট্র বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারি সে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের সাম্প্রতিক ক্রান্তিকালে দেশের প্রতি মমত্ববোধের চিত্র তুলে ধরে দেশপ্রেমের সবিস্তার তুলে ধরা সকলের পক্ষে সম্ভবপর হবে কর্মদক্ষতা ও গঠনমূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে।

বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিক পরিমন্ডলে করোনার ভয়াবহতায় বাংলাদেশও করোনা পরিস্থিতিকে মোকাবেলার জন্য নানাবিধ উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করেছে যদিও অনেকে বলে থাকেন সিদ্ধান্ত নিতে কালক্ষেপন করা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ জনগণ হিসেবে আমরা আমাদের দায়-দায়িত্ব কতটুকু পালন করছি সে বিষয়টা সকলের ভাবনা চিন্তাকে তথা সামগ্রিক চেতনাকে ভিত্তি ধরে দেশের প্রতি আমাদের কর্তব্যবোধের চিত্রকে তুলে ধরে। করোনা এমন এক ভাইরাস যেখানে আপনি নিজে সুরক্ষায় থাকলেও রেহাই পাওয়ার সম্ভাবনা কম, আশে পাশের সকলকে নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত নিয়মকানুন মেনে চললেই কেবল করোনা থেকে প্রতিরোধ পাওয়া সম্ভব। অন্যথায় হিতে বিপরীত হতে পারে বিশেষ করে সারা বাংলাদেশে মহামারী দেখা দিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এ সংকট মূহুর্তে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে সচেতন করা ও ঘরে রাখার কাজটি করার জন্য দেশব্যাপী কাজ করে চলেছেন তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা প্রত্যেক নাগরিকদের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করি। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভুল ত্রুটি হতেই পারে। সেসব ত্রুটিকে বড় করে দেখাই যেন বাঙালিদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক’দিন আগে একজন এসিল্যান্ড দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে মাস্ক না থাকায় দুজন বয়স্ক মানুষের কান ধরা ছবি নিজের ফোনে তুলেন এবং সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ভাইরাল হওয়ার পর থেকে হেন কোন মন্তব্য নেই যা করতে বাদ রাখেনি উক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এমনকি বিসিএস চাকুরির প্রতি বিদ্বেষ ক্ষোভ প্রকাশ ও মুখরোচক মন্তব্য করতে দেখা যায় অনেককে।

আমি হলফ করে বলতে পারি যারা বিসিএস এর প্রতি বিষেদাগার করেছে তাদের অধিকাংশের পছন্দের তালিকায় বিসিএস এর প্রত্যাশা থাকে এবং সেভাবে নিজেদের প্রস্তুত করছে অনেকে। বিষয়টা এ জন্যই বললাম যে, ব্যক্তিবিশেষের জন্য কোন পেশাকে মর্যাদাহানিকর মনে করা সম্পূর্ণ অপাঙক্তেয়। তবে এ কথাও স্বীকার করতে হবে ঐ পেশার অনেকেই জীবনের মায়া ত্যাগ করে সাধারণ জনগণকে ঘরে রাখার কাজটি করে যাচ্ছে নিরবিচ্ছিন্নভাবে। উল্লেখ্য যে, উক্ত কর্মকর্তাকে ইতিমধ্যে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গতকাল আরো একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি একজন মরুব্বীকে মাস্ক পড়ার বিষয়ে নানাভাবে যুক্তি তর্ক দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছেন কিন্তু তিনি কিছুতেই মাস্ক পড়তে চাচ্ছেন না এবং মাস্ক পড়ার বিরুদ্ধে দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রত্যেকের মাস্ক পরিধান করা এবং পারস্পারিক সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা জরুরী। সুতরাং ঐ সব লোকের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ব্যতিরেকে করোনা প্রতিরোধের নিয়মকানুন মেনে চলা দুস্করই বলা চলে। কাজেই এ ক্ষেত্রে বলা চলে, রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে মেনে চলাই দেশপ্রেমের চূড়ান্ত বহি:প্রকাশ।

সাধারণ ছুটি ঘোষণা ও গণপরিবহন বন্ধের আভাস পাওয়ায় শহরের মানুষগুলো গ্রামে চলে আসায় করোনার প্রাদুর্ভাব আরো ভয়াবহ হওয়ার আশংকা বেড়ে গিয়েছে। সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর উৎসবের ছুটির ন্যায় লঞ্চঘাট, ট্রেন স্টেশন ও বাস স্টেশনে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় করোনা মহামারী আকারে ধারণ করার ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করতে পারে। বলা হয়ে থাকে, ছুটির মানে হচ্ছে যে যেখানে আছেন সেখানে নিরাপদে থাকেন, অন্য কোথাও চলাচল করার দরকার নেই কিংবা অবস্থান পরিবর্তন করতে পারবেন না। কড়া ভাষায় বলা হয়েছে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলুন, ঘরে থাকুন-নিরাপদে থাকুন। কিন্তু মানুষজন কোনকিছুই মানতে চাইছে না। নিয়মের তোয়াক্কা না করে তারা পূর্বের ন্যায় চলাফেরা করছে যার ধরুণ গ্রামে করোনা ভীতি এবং করোনা আক্রমনের হার বেড়ে যাবার আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা। করোনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে যে সকল নিয়ম কানুন রয়েছে সেগুলো মেনে চলা প্রত্যেক দেশপ্রেমিক নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। শহর থেকে ফেরত আসা মানুষদের পরিস্থিতিকে মেনে নিয়ে ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা জরুরী এবং এটিও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতার নমুনায়ন।

গ্রামের পরিস্থিতি পূর্বের তুলনায় খানিকটা ভাল বলা চলে। কি রকম ভাল, গ্রামে এখন আর বাজারে চায়ের আড্ডা বসে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনীর নিয়মিত টহলের ভয়ে গ্রামের বাজারে যাওয়া থেকে অনেকেই নিজেদের বিরত রেখেছেন। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাজারে যাচ্ছে না, তবে বাজারের দোকানপাট অধিকাংশ বন্ধ রয়েছে। ঔষুধের দোকান ছাড়া অন্য কোন দোকান তেমন খুলছে না। তবে ইদানিংকালে যে বিষয়টা অত্যন্ত পীড়াদায়ক মনে হচ্ছে তা হল গ্রামের মানুষের চায়ের প্রতি চরম আসক্তি। সন্ধ্যার সময় চা পান ছাড়া যেন চলেই না, বাজারের বাইরে মহল্লার পাশে টংয়ের দোকানে গ্রামবাসীদের ভিড় ঠেলে চা পানের দৃশ্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আপনি নিজে সতর্ক না হলে, পরিস্থিতি অবলোকন করার পরেও যদি সাবধানতা অবলম্বন না করেন তাহলে সরকারের কি করার আছে। অন্যদিকে দেখা যায়, গ্রামে হোম কোয়ারেন্টাইনের দৃশ্য বিরল। বাড়িতে ঘরে বসে থাকার বিষয়টি কেউ মানতেই পারছে না। খবরের কাগজ কিংবা মিডিয়ার কল্যাণে করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে সজাগ থাকলেও নিজের বিষয়ে সকলেই যেন খানিকটা অবিবেচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। নিজের স্বার্থে, পরিবারের স্বার্থে, সমাজের স্বার্থে সর্বোপরী দেশের স্বার্থে হলেও দেশের অন্যান্য শহর থেকে গ্রামে ফেরত আসা মানুষগুলোর অবশ্যই ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টানে থাকা উচিত, অন্যথায় করোনার সঙ্গে সন্মুখ যুদ্ধে সকলকে পরাজয়ের স্বাদ নিতে হবে।

ভিন্ন দৃষ্টি দিয়ে দেখলে দেখা যায়, করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের ‍গৃহীত পদক্ষেপ ও তৎসংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেকেই নানারকম মন্তব্য করে থাকে। বিভিন্ন জনকে নানাবিধ পরামর্শ দিয়ে থাকি কিন্তু নিজের বেলায় সেসবের কোনরূপ প্রযোজ্যতা দেখি না। দেশের এই পরিস্থিতিতে খেটে খাওয়া, দিনমজুর শ্রেণির মানুষের মধ্যে অভাবের আশংকায় অনেকেই দুশ্চিন্তাগ্রস্থ, অমুক প্রতিষ্ঠান, অমুক সংগঠন কেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছে না সে জন্য অন্যদের দোষারোপ করে মুখরোচক বক্তব্য প্রদান করে থাকি। কেন, আমার কি কোন দায়-দায়িত্ব নেই? অবশ্যই রয়েছে, আমার নিজেদের যতটুকু সামর্থ রয়েছে সেটুকু নিয়েই আমি সাধ্যমত চেষ্টা করবো অসহায় মানুষকে সাহায্য করার। তাহলেই না দেশের প্রতি মমতাবোধের পরিচয় পাওয়া যাবে। প্রত্যেক সামর্থবান যদি জাতীয় সংকটে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে সম্মিলিত হই তাহলেই সংকট সহসাই কমে আসবে। বিশেষ করে যারা বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের মালিক, ধনী শ্রেণি তাদের প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব দেশের ক্রান্তিকালে সাহায্যের হাতকে প্রসারিত করে করোনার ভয়াবহ প্রকোপ থেকে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষকে রক্ষা করার প্রয়াস নেওয়া।

পরিশেষে বলা যায়, করোনার সংকটকে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিকের উচিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রদানকৃত নিয়মাবলী যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে দেশপ্রেমের পরিচয় দেওয়া। কেননা নিয়মের ব্যত্যয় হলে মহামারী দেখা দিবে এবং মহামারী প্রতিকারের সক্ষমতা বাংলাদেশের কেমন রয়েছে সেটা পাঠক মাত্রই অবগত রয়েছেন। কাজেই প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের দিকে নজর দেওয়ায় প্রত্যেক বিবেকবান মানুষের নৈতিক দায়িত্ব এবং এর মাধ্যমেই দেশপ্রেমিক হিসেবে নিজের কাছে স্বচ্ছ থাকা যাবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)