চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

তাহলে তিন বিচারপতির বিষয়ে পদক্ষেপ কোন পথে?

হঠাৎ করেই গত সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে সারাদেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে উচ্চ আদালত। যাকে বলা হয় মানুষের ন্যায় বিচার নিশ্চিতের শেষ আশ্রয়স্থল, সেই বিচারালয়ের তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। যদিও স্পষ্ট করে বলা হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে ঠিক কোন ধরণের অনিয়মের অভিযোগ এসেছে। তবে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানিয়েছে, অসদাচরণের অভিযোগে প্রাথমিক অনুসন্ধানের পরিপ্রেক্ষিতেই হাইকোর্টের তিন বিচারপতিকে তাদের বিচারকার্য থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি এখানেই থেমে থাকেনি। অভিযোগ নিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানের খবরের পাশাপাশি ওই তিন বিচারপতি এরই মধ্যে নিজেরাই ছুটির আবেদন করেছেন বলেও জানানো হয়েছে। এমন বাস্তবতায় বহুল আলোচিত ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় বহালের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা রিভিউ শুনানির বিষয়টি আবার আলোচনায় আসছে।

বিজ্ঞাপন

এখন দেখার বিষয় হলো বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হল ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ কোন পথে নেওয়া হবে? কেননা, আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ অনেকেরই মত, উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অসাদচরণের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে এখন ‘সাংবিধানিক শূন্যতা’ বিরাজ করছে।

এই মতের সাথে ভিন্নমত পোষণ করা আইনজ্ঞরা জোর গলায় বলছেন, সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিচারপতিদের অসদাচরণ তদন্ত ও অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে নেওয়া আলোচিত ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় বহালের ফলে বিচারপতিদের অসদাচরণ তদন্ত ও অপসারণের বিষয়টি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতেই ফিরেছে। যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কেমলমাত্র বিচারপতিদের নিয়েই গঠিত হয়।

তবে এখানে একটা তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক রায়ে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ২, ৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭ উপ-অনুচ্ছেদ পুনবর্হাল করা হলেও তাৎপর্যপূর্ণ ৮ নং উপ-অনুচ্ছেদটি রায়ে পুনবর্হাল করা হয়নি। বিচারপতিদের পদত্যাগ সংক্রান্ত ৮ নং উপ-অনুচ্ছেদটি পুনর্বহাল না হওয়ায় কোনো বিচারপতির সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগের সুযোগ নেই বললেই চলে।

তাই ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের বিরুদ্ধে হওয়া রিভিউয়ের রায়ে এ বিষয়টির একটি তাৎপর্যপূর্ণ সমাধান অত্যাবশ্যক। কারণ, পদত্যাগ বিষয়টিও প্রকারন্তে একটি অধিকার। এছাড়াও আমরা দেখেছি, বিচারপতিদের পদত্যাগের সাংবিধানিক পথটি খোলা থাকায় এর আগের ২টি ঘটনায় দুইজন বিচারপতি পদত্যাগ করেছিলেন। এদের মধ্যে একজন জাল সার্টিফিকেটের জন্য, আরেকজন ঘুষের ঘটনায়। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পদক্ষেপ চলাকালীন সময়েই তারা পদত্যাগ করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

আবার ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় বহালের ফলে বিচারপতিদের অসদাচরণ তদন্ত ও অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে ফেরেনি বলে যারা দাবি করছেন, তারা মূলত বলতে চাচ্ছেন যে বিষয়টি আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের করা রিভিউয়ের সিদ্ধান্তের উপর অপেক্ষমাণ।

যদিও এই যুক্তিতে ভিন্নমত পোষণ করা আইনজ্ঞরা বলেছেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় আপিল বিভাগ বহাল রাখেন। কিন্তু আপিল বিভাগ তার রায়ে হাইকোর্টের রায়কে স্থগিত করেননি। যার ফলে বিচারপতিদের অসদাচরণ তদন্ত ও অপসারণের ক্ষমতা এখন আর সংসদের হাতে নেই, এটা আপনাআপনি চলে গেছে ষোড়শ সংশোধনীর আগে থাকা সেই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতির কাছে।

আইনজ্ঞদের দেয়া এমন ভিন্ন যুক্তির বাস্তবতায় তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ কোন পথে নেওয়া হবে- সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এটুকু বলার সুযোগ রয়েছে, যেহেতু রাষ্ট্রপক্ষ ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় বহালের বিরুদ্ধে রিভিউ করেছে, তাই ওই রিভিউয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি আগে আসুক। রিভিউয়ের রায়ে যে প্রক্রিয়াটি সাংবিধানিকভাবে চূড়ান্ত হবে; সে পথেই বিচারপতিদের বিষয়ে পদক্ষেপ নিলে দ্বিমতের কোনো সুযোগ থাকবে না।

অবশ্য এটাও স্বীকার করতে হবে, রাষ্ট্রপতির সাথে আলোচনা করে প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টের তিন বিচারপতিকে তাদের বিচারিক কাজ থেকে বিরত রাখার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা আশাজাগানিয়া। কারণ, কারো বিরুদ্ধে অসাদাচরণের অভিযোগ থাকা অবস্থায় তারা বিচারকাজ চালিয়ে গেলে বিচারপ্রার্থীদের মনে এমন ধারণা হতো যে, এই বিচারপতিদের কাছ থেকে তারা ন্যায় বিচার আশা করতে পারেন না।

তাই স্বাধীন বিচার বিভাগ ও দেশের জনগণের কাছে তিন বিচারপতির বিষয়ে নেওয়া পদক্ষেপ অনন্য বলেই বিবেচিত হয়েছে। তবে এই প্রত্যাশা থাকবে যে, অসাদাচরণের অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হলে এদের ব্যাপারে দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে সিদ্ধান্ত তাদের পাশাপাশি অন্য বিচারপতিদের কাছেও একটা ইঙ্গিত বা বার্তা হবে; যারা ন্যায় বিচারের পবিত্র দায়িত্ব পেয়েও সঠিকপথে থাকছেন না, তারাও আইনের ঊর্ধ্বে নন।

লেখক: চ্যানেল আই অনলাইনের সুপ্রিম কোর্ট প্রতিবেদক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View