চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘ডায়াবেটিস সেবা নিতে আর দেরি নয়’

আজ ১৪ নভেম্বর, বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। এবারের ডায়াবেটিস দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়Ñ ‘ডায়াবেটিস সেবা নিতে আর দেরি নয়’। বাংলাদেশ ডায়াবেটিকস সমিতি এই দিনটি আজ নানা কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে পালন করছে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিস সমিতি এবং তাদের অ্যাফিলিয়েটেড সব সমিতি কর্তৃক দেশব্যাপী নানান ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে র‌্যালি, বিনামূল্যে ডায়াবেটিস নির্ণয়, শোভাযাত্রা, ডায়াবেটিস সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তরের পর্ব ইত্যাদি। বারডেম মিলনায়তনে নানা কর্মসূচি চলছে। আসলেই সময় মতো ডায়াবেটিস সেবা না নিলে জীবন বিপন্ন হতে সময় লাগে না।

ডায়াবেটিস রোগ এখন সর্বত্র বিস্তৃত। কী শহর বা গ্রামÑসবখানেই ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। একসময়ে শহুরে শ্রেণীর মাঝে এই রোগ নিয়ে নানা সংশয় থাকলেও এখন একেবারে সাধারণ মানুষের জন্য এই রোগ নতুন বিপদ বললে ভুল হবে না। ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ যা একবার হলে সারাবছরই বয়ে বেড়াতে হয়। কারো শরীরে ডায়াবেটিস থাকলে বড় ধরনের রোগ-ব্যধি প্রতিরোধ বা নিরাময়েও চিকিৎসকদের বিবিধ চিন্তা করতে হয়। আর তাই জীবনের জন্য ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই জরুরি এক বিষয়।

একসময় সাধারণ মানুষ বুঝতোই না ডায়াবেটিস কী, এবং এই রোগ প্রতিরোধ কেন দরকার। কিন্তু ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট এবং বিশেষজ্ঞদের অবিরাম প্রচেষ্টায় ডায়াবেটিস নিয়ে এখন শুধু শহুরে শিক্ষিত মানুষ নয়, খোদ গ্রামের মানুষও যথেষ্ট সচেতন হয়ে উঠেছে। না হয়ে উপায়ও নেই। কেননা শহরের চৌহদ্দী পেরিয়ে ডায়াবেটিস এখন গ্রামীণ জনপদেও চিহ্নিত । গ্রামেও তাই এখন সাতসকালে দেখতে পাওয়া যায় বহু মানুষ নিয়ম মেনে হাঁটাহাঁটি করছে। রক্তে সুগারের পরিমাণ পরীক্ষা করে রোগের অবস্থান খতিয়ে দেখছে। খাবার গ্রহণে সচেতনতা অবলম্বনের পাশাপাশি নিয়মিত বা সাধ্যমতো ইনসুলিন গ্রহণ করছেন। হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিচ্ছেন। সত্যি ডায়াবেটিক হাসপাতাল বা সেন্টারে বই হাতে শত শত ডায়াবেটিক আক্রান্ত রোগী দেখলেই এই রোগ প্রতিরোধে শহর বা গ্রাম সব রোগীদেরই আগ্রহ-একাগ্রতা যে সীমাহীন বেড়েছে তা সহজেই অনুমিত হয়।
ইনসুলিন নামক এক প্রকার হরমোনের অভাব হলে কিংবা উৎপাদিত ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে গেলে রক্তের গ্লুকোজ দেহের বিভিন্ন কোষে প্রয়োজনমতো ঢুকতে পারে না। ফলে রক্তের গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতিকেই ডায়াবেটিস বলা হয়। ডায়াবেটিসের কারণে শরীরে নানান ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। বিশেষ করে রক্তে চিনির পরিমাণ বেশি হলে রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। আবার শরীরে যদি রক্ত ঠিক মতো প্রবাহিত হতে না পারে, যেসব জায়গায় রক্তের প্রয়োজন সেখানে যদি এই রক্ত পৌঁছাতে না পারে, তখন স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এর ফলে মানুষ দৃষ্টি শক্তি হারাতে পারে। ইনফেকশন হতে পারে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অন্ধত্ব, কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়া, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ইত্যাদির পেছনে একটি বড় কারণ ডায়াবেটিস।

বিজ্ঞাপন

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ঢের উন্নতি হলেও ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও আশংকাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। ডায়াবেটিস প্রধানত দু ধরনের: টাইপ-১ ও টাইপ-২। সাধারণত ৩০ বছরের কম বয়সীদের টাইপ-১ ডায়াবেটিস দেখা যায়। এ ধরনের রোগীদের শরীরে ইনসুলিন একেবারেই তৈরি হয় না। টাইপ-১ রোগীর সংখ্যা এ দেশে কম। টাইপ-২ রোগীর সংখ্যাই বেশি, প্রায় ৯০% থেকে ৯৫%। এ ধরনের রোগীদের শরীওে ইনসুলিন নিষ্ক্রিয় থাকে বা ঘাটতি থাকে। এ ধরনের রোগীদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে জন্য খাদ্যাভাসে পরিবর্তন, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং প্রয়োজনে ইনসুলিন নিতে হয়। ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪২.৫ কোটি। এর তিন চতুর্থাংশ বাস করে নি¤œ ও মধ্য আয়ের দেশসমূহে। এদিকে এক মিলিয়নেরও বেশি শিশু ও কিশোর ধরন-১ ডায়াবেটিসে ভুগছে। আবার ২১ কোটি রয়েছে অনির্ণীত অবস্থায়। ডায়াবেটিস, বিশেষত টাইপ-টু এখন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই সংখ্যা ২০৪৫ সালের মধ্যে ৫৯ কোটিতে পৌঁছানোর আশংকা রয়েছে।

বিবিসির এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে ১৯৮০ সালে ডায়াাবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ কোটি। ২০১৪ সালে সেটা বেড়ে হয় ৪২ কোটিরও বেশি। ১৯৮০ সালে ১৮ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ডায়াবেটিস হওয়ার হার ছিল ৫ শতাংশেরও কম কিন্তু ২০১৪ সালের তাদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন বলছে, প্রাপ্ত বয়স্ক যেসব মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশের, যেখানে খুব দ্রুত খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ঘটছে। সংস্থাটি বলছে, ২০১৬ সালে ডায়াবেটিসের কারণে প্রায় ১৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এবার দেখা যাক বাংলাদেশের চিত্র। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি বলছে বর্তমানে বাংলাদেশে ৭৩ লক্ষেরও বেশি লোক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতন না হলে এবং এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে যে কোনো ডায়াবেটিকস রোগীর কিডনি, চোখ, হ্নদপিন্ড, পা ইত্যাদি মারাত্বকভাবে আক্রান্ত হতে পারে। এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা এবং যথাযথ চিকিৎসার অভাবে অসংখ্য লোক অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্ব বরণ করা ছাড়াও অকালে মৃত্যুবরণ করছে। তবে আশার বিষয় হলো-ডায়াবেটিস নিয়ে এখন সাধ্যরণে অনেকে সচেতনতা যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি এই রোগ প্রতিরোধে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় ওষুধের প্রাপ্যতাও বেড়েছে। আগে ডায়াবেটিস প্রতিরোধে ইনসুলিন বিদেশ থেকে আমদানী করা হতো এবং দামও ছিল বেশ চড়া। সাধারণ মানুষের অনেকের পক্ষেই চড়ামূল্যের ইনসুলিন কেনা সম্ভব হতো না। কিন্তু দেশীয় নামকরা

ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পাণীগুলো দেশেই ইনসুলিন উৎপাদন শুরু করলে ইনসুলিনের ষভস তুলনামূলক কয়েকগুন কমে আসে এবং সহজলোভ্যও হয়ে উঠে। আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে এখন ইনসেপ্টা, বেক্সিমকো, স্কয়ারসহ বেশি কয়েকটি ্ওষুধ কোম্পানী ইনসুলিন উৎপাদন করছে। ইনসেপ্টা উৎপাদিত ওষুধের দাম ম্যাক্সুলিন। বেক্সিমকো উৎপাদিত ইনসুলিনের নাম জেন্সুলিন। ইনসেপ্টা উৎপাদিত ইনসুলিন ম্যাক্সুলিনের কথাই ধরা যাক। এই ইনসুলিন কিনতে একজন রোগীকে ৩৯০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ করতে হয়। অথচ ইনসুলিন যখন আমদানী নির্ভর ছিল তখন একটি ইনসুলিন কিনতে একজন রোগী গড়ে দুই হাজার টাকা দামে ক্রয় করতে হতো। নিয়মিত ইনসুলিন নেন রাজধানীর আদাবরের বাসিন্দা নগর পরিকল্পক তৌফিক মহিউদ্দিন। গত পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ইনসুলিন ব্যবহার করছেন। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ইনসুলিন দেশীয় ওষুধ কোম্পানীগুলো উৎপাদন করার পর এ বাবদ তার খরচ অনেক কমে এসেছে। এখন তিনি ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস উৎপাদিত ম্যাক্সুলিন নিয়মিত গ্রহণ করেন।

বলা হচ্ছে টাইপ-ওয়ান ডায়াবেটিক রোগীসহ যাদের জন্য ইনসুলিন অপরিহার্য তাদের ইনসুলিনসহ ডায়াবেটিস সেবা নিশ্চিত করাই হোক আগামী দিনের অঙ্গীকার। বোঝা যাচ্ছে ডায়াবেটিক সমিতি সব শ্রেণীর রোগীর জন্য ইনসুলিনের সহজ প্রাপ্ততার উপর জোর দিচ্ছে। অবশ্য এটি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ডায়াবেটিস সমিতি সারাদেশের জেলা-উপজেলাতে তাদের অ্যাফিলিয়েটেড সমিতিতে ইনসুলিন সংরক্ষণে ফ্রীজ প্রদানসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।
ডায়াবেটিস সমিতির গণসংযোগ বিভাগের পরিচালক ফরিদ কবির মনে করেন ডায়াবটিস রোগ প্রতিরোধের প্রথম উপায় হলো সচেতনতা এবং আক্রান্ত হওয়ার পর একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্যে চলে যাওয়া। এটা করা না গেলে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয় রোগীকে। তিনি আরও মনে করেন ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণে আনতে ইনসুলিনের সহজপ্রাপ্যতা দেশের ওষুধ শিল্পের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

বিজ্ঞাপন