চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

৯২ বছরের নরেশ পালের সংসার চলে মাটির খেলনা বিক্রি করে

‘বাজান বয়স হয়ে গেছে! আমার শরীর দুর্বল, হাত-পা কাপে। হাতে পায়ে শক্তি পাই না। কষ্ট হলেও শিশুদের খেলনা বানাতে হবে। সামনে পহেলা বৈশাখ, তাই শিশুদের মাটির খেলনা তৈরি করে বিক্রি করতে হবে। বিক্রি করমু তারপর খাইতে পারমু। এখন আর আগের মতো মাটির হাঁড়ি পাতিলের বানানোর কাজ করতে পারি না। আমার শরীরও ভালো না, প্রায় সবসময় অসুস্থ থাকি। অসুস্থ শরীর নিয়ে কিছু কিছু শিশুদের মাটির খেলনা স্থানীয় হাট-বাজারে স্কুলের সামনে বিক্রি করি। মাটির জিনিস বিক্রি করে দু’এক বেলা খেলেও খাই, না পেলে নাই। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি। ‘যতদিন বেঁচে থাকি আমরা যেন দু’একবেলা খেয়ে যেতে পারি’। আমরা তো আর অন্য কোনো কাজ করতে পারি না’, কথাগুলো বলছিলেন নরেশ পাল। বাসস

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ঘারিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাঠে গেলে দেখা মিলবে ৯২ বছরের বৃদ্ধ নরেশ পালের। প্লাস্টিকের চটে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়েছে মাটির তৈরি শিশুদের হরেক রকম খেলনা। শিক্ষার্থীদের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন নরেশ পাল। মুখ ফুটে বলতে পারেন না আমি খুব কষ্টে আছি। দুটো জিনিস কিনে নিয়ে যাও, তোমরা কিনলেই আমার দু’মুঠো ভাতের জোগাড় হবে। বৃদ্ধ নরেশ পালের চোখের চাহনিতে কি এক তীব্র আকুতি!

বিজ্ঞাপন

এদিকে টাঙ্গাইল জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে বৃদ্ধ নরেশ পালকে আজীবনের জন্য বয়স্কভাতা কার্ড প্রদান করা হয়েছে। সে টাকা দিয়ে কি সংসার চলে?
দেখা যায়, কাঁদা মাটি নিয়ে মাটির জিনিসপত্র বানানোর কাজে ব্যস্ত বৃদ্ধ নরেশ পাল। আর বাড়ির উঠানে নরেশ পালের স্ত্রী মিলন পাল কাদামাটি নিয়ে হাড়ি পাতিল বানানোর কাজে ব্যস্ত। শিশুদের হরেক রকমের খেলনা তৈরিতে ব্যস্ত নরেশ পাল। মাটির তৈরি জিনিস বিক্রি করেই চলে পাঁচ সদস্যের সংসার। তাঁর বাড়ি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার গালা ইউনিয়নের পাল পাড়ায়। তাঁদের সংসারে রয়েছে দুই পুত্র এবং তিন কন্যা। কন্যাদের সবার বিয়ে হয়েছে ছোট ছেলের সংসারেই থাকেন বৃদ্ধ নরেশ পাল। কিন্তু ছোট ছেলেটি অসুস্থ। বড় ছেলে আলাদা বাসায় থাকেন। বড় ছেলেরও একই পেশা। তিনিও মাটির জিনিসপত্র তৈরি ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বৃদ্ধ নরেশ পাল জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্থানে ছুটে যান মাটির খেলনা বিক্রি করতে। কখনো টাঙ্গাইল রেলস্টেশন কিংবা সুরুজ বাজার। কখনো আশপাশের ইউনিয়নের বিভিন্ন স্কুলের পাশে। নিজ বাড়ি পালপাড়া থেকে প্রতিদিনই মাথায় মাটির খেলনা ঝাঁপি নিয়ে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে হেঁটে যান দূর-দূরান্তে। এমন বয়সে যার হাঁটা চলাই কঠিন, সেখানে নরেশ পাল তিনবেলা পরিবারের মুখে আহার জোটাতে স্কুলে-স্কুলে, ষ্টেশন ও বাজার ঘুরে বিক্রি করেন শিশুদের মাটির তৈরি খেলনা।

বিজ্ঞাপন

বৃদ্ধ নরেশ পাল বলেন, ‘মাটির তৈরি খেলনা বিক্রির টাকায় আমাদের পরিবারের খাবার জোটে। এগুলো বিক্রি না করলে খাব কী? আমাদের পূর্ব পুরুষের আগের পেশা, মাটির জিনিসপত্র বানানো। মাটির জিনিস বিক্রি করেই আমাদের পেট চলে। আগেতো প্রায় ২০ রকমের মাটির তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করতাম। এখন আর আগের মতো মাটির তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি হয় না। আর চলেও না। বাপ-দাদার পেশা ছোটকাল থেকেই বাপ-দাদার সঙ্গে এই মাটির জিনিসপত্র বানানো শিখছি। এখন বয়স হয়ে গেছে তাই ভারী কোনো কাজ করতে পারি না। তাই শিশুদের মাটির খেলনা বিক্রি করি। মাটির জিনিস বিক্রি করে যা পাই তা দিয়েই সংসার চালাই। পরিবারে অভাব অনটনে লেগেই আছে। আমার কষ্ট হয় পরিবারে খাবার জোগাড় করতে। ছোট ছোট ছেলের কোমরে ব্যথা। তাই আমাকে উপার্জন করতে হয়।’

নরেশ পালের স্ত্রী মিলন পাল বলেন, ‘মাটির জিনিস বানাই, না বানাইলে খামু কী? কেউ তো আমাদের খাবার এনে দিবে না। আমাদের হাতের তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করেই আমাদের খেতে হয়। আর ওনারতো বয়স হয়ে গেছে, ভারী কোনো কাজ করতে পারে না। তাই বসে বসে ছোটদের মাটির তৈরি খেলনা তৈরি করে হাটে-বাজারে বিক্রি করেন। এখন আর আগের মতো মাটির জিনিসপত্রগুলোও বিক্রিও হতে চায় না।’

ছোট ছেলের বউ সন্ধ্যা রানী বলেন, ‘পরিবারে পাঁচজন মানুষ খায়। আমাদের কষ্টের সংসার। নিরুপায় হয়ে বৃদ্ধ শ্বশুরকে মাটির খেলনা বিক্রি করতে হয়। আমাদের টাকা-পয়সা থাকলে তো শ্বশুরকে এমন কষ্ট করতে হতো না।’

টাঙ্গাইল জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আব্দুল হামিদ জানান, এ বিষয়ে আমরা দরিদ্র নরেশ পালের খোঁজ খবর নিয়েছি। ইতোমধ্যে নরেশ পালকে আজীবনের জন্য বয়স্কভাতা কার্ড প্রদান করা হয়েছে।