চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ঝিলু ‘গ্রেট’ হতে পেরেছে

দেশের জন্যে জীবন দেওয়া এক শিল্পী আলতাফ মাহমুদ। ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট তিনি পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি হয়ে আর ফেরেননি। অসহনীয় নির্যাতন সহ্য করেছিলেন তিনি তবু মাথা নোয়াননি শত্রুর কাছে।

১৯৩৩ সালে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর একাত্তরের ২৩ ডিসেম্বর বয়স হতো ৩৮ কিন্তু সেটা আর হয়নি, পৌনে আটত্রিশে থেমে গেছেন তিনি। তাইতো তার কন্যা শাওন মাহমুদ চোখের জলে বারবার বলে ওঠেন- ‘৭১ এর ডিসেম্বর মাসে তার বয়স হোতো ৩৮। নিখোঁজ মানুষের বয়স কখনই বাড়ে না। আমি তাকে সেই না বলা শুভ জন্মদিন বলার অপেক্ষায় আছি, থাকবো আমৃত্যু।’

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

ভাষা আন্দোলনের অবিস্মরণীয় গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে  ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’ কবিতা/গানের কবি/গীতিকার ছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী আর সুরকার আলতাফ মাহমুদ। আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রথমে এটা কবিতা হিসেবে লিখেছিলেন পরে এতে সুরারোপ করে কালজয়ী এই গানের স্রষ্টা আলতাফ মাহমুদই। বায়ান্নার এই ভাষাসৈনিক রাজনৈতিক জীবনে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন, ছিল প্রবল দেশাত্মবোধ আর সংগীতের প্রতি অপরিমেয় প্রেম।

এই কীর্তি সাহসিকতার পরেও ছিলেন তিনি এক মাটির মানুষ। ডাক নাম ছিল ঝিলু। বালকবেলায় গুনগুণ করে গান গাইবার ফাঁকে উঠানের এক কাঁঠালগাছে লিখেছিলেন তিনি ‘ঝিলু দ্য গ্রেট’। বাবা নাজেম আলী বললেন- ‘গাছডার গায়েতো লেইখা রাখছোস- ঝিলু দ্য গ্রেট। গান গাইয়া কি আর গ্রেট হইতে পারবি?’ আলতাফ মাহমুদ বললেন ‘দেখো একদিন ঠিকই ‘ঝিলু দ্য গ্রেট’ হবো।’ ঝিলু কি গ্রেট হতে পেরেছিলেন? নিজের জীবন দিয়ে, নিজের কর্ম দিয়ে, দেশের প্রতি অপরিসীম দরদ দিয়ে তিনি হতে পেরেছিলেন, অবশ্যই হতে পেরেছিলেন!

আলতাফ মাহমুদ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য ছিলেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেশ ছিল পরম আত্মীয় তাই চরম দুঃসময়েও তিনি ছিলেন অনড় আর অবিচল। পাকিস্তানি শত্রুপক্ষ যখন নির্যাতনের মাধ্যমে তার কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে তথ্য জানতে চেয়েছিল তখনও তিনি বলেছিলেন- আমি জানি না। পাকিস্তানিরা মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রের কথা জানতে চেয়েছিল তখনও তিনি বলেছিলেন- আমি জানি না। সবকিছু বলে দিলে হয়ত তিনি প্রাণে বেঁচে যেতেন কিন্তু প্রাণের চাইতে দেশের প্রতি ভালোবাসা ছিল বেশি। আলতাফ মাহমুদদের কাছে দেশটাই ছিল মুখ্য, স্বাধীন হওয়ার আকাঙ্ক্ষাই ছিল সর্বাগ্রে।

বিজ্ঞাপন

শহীদ আলতাফ মাহমুদ কী ধরণের নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছিলেন তার কিছুটা চিত্র পাওয়া যায় দিনু বিল্লাহ’র ‘১৯৭১: মৃত্যু ছায়াসঙ্গী’ গ্রন্থে। যেখানে তিনি লিখেছেন- ‘একজন মেজর অথবা ক্যাপ্টেন মার্কা অফিসার হুংকার দিয়ে বলল, আলতাফ মাহমুদ কোন হ্যায়? আলতাফ ভাই সেই অফিসারের সামনে একটু এগিয়ে গিয়ে বললেন, ম্যায় আলতাফ মাহমুদ হু। মেজর আলতাফ ভাইয়ের নাম শোনামাত্র হাতের পিস্তলের বাঁট দিয়ে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করলে আলতাফ ভাই ‘এক নিমেষে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মেজরের নির্দেশে কয়েকজন আর্মি আলতাফ ভাইকে ঘিরে ফেলে পেটে এবং ঘাড়ের ওপর বন্দুকের বাট দিয়ে আঘাত করতে করতে ড্রয়িং রুম দিয়ে সামনের বারান্দায় নিয়ে গেল। বাড়িতে লুকানো অস্ত্রভাণ্ডার সত্ত্বেও আলতাফ মাহমুদ ছিলেন অবিচল। কোথা থেকে মানুষ পায় এমন শক্তি, হতে পারে এতো উন্নত শির, যার সামনে নতশির এমন কি ঐ শিখর হিমাদ্রির।

আলতাফ ভাইকে আলাদা করে মেজরের জেরার পর জেরা, মাল কাহা? হাতিয়ার কাহা? আলতাফ ভাই বেশ জোরে জবাব দিল, জানি না। অমনি রাইফেলের বাট দিয়ে সজোরে আঘাত করল পেটে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে পড়ে গেলেন আলতাফ ভাই। নেকড়ের চেয়ে হিংস্র হয়ে আলতাফের ওপর (মেজর) নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়ল। আলতাফ ভাইয়ের কপাল ফেটে দরদর করে রক্ত ঝরছে। পুরো শরীর রঞ্জিত হয়ে সাদা গেঞ্জি লাল হয়ে গেল। তবুও আলতাফ ভাই বলছেন, আমি জানি না।

এবার তার শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করলো মেজর। একজন সিপাইকে ডেকে বলল, ‘ও শালাকো ইধার লে আও।’ দু’জন জওয়ান ধরাধরি করে একজনকে আলতাফ ভাইয়ের সামনে দাঁড় করালো। চেনা যাচ্ছিল না। মনে হল ওর ওপর প্রচণ্ড অত্যাচার হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই চিনে ফেলল। এ-যে এক প্লাটুনের কমান্ডার সামাদ ভাই। মেজর সামাদ ভাইকে আলতাফের সামনে দাঁড় করিয়ে জিগ্যেস করলো, ইয়ে আদমি আলতাফ মাহমুদ? সামাদ সাহেব মাথা নেড়ে জবাব দিল, জি হুজুর। এবার মেজর আবার জিজ্ঞাসা করল, হাতিয়ার ইয়ে আদমিকা পাস রাখা? সামাদ সাহেব মেজরকে মাথা নেড়ে বললেন, জি হ্যাঁ। উসকা পাস হাতিয়ার রাখা। এক নিমিষে সব শেষ হয়ে গেল। কাঁঠালগাছের নিচ থেকে লুকানো অস্ত্রের ট্রাঙ্কগুলো বের হলে রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত আলতাফ মাহমুদকে দিয়ে তা টেনে তোলানো হয়।”

আলতাফ মাহমুদ চলে গেছেন, আলতাফ মাহমুদ আর আসবেন না। কিন্তু তার জন্মতারিখ আসবে, তার অন্তর্ধান-তারিখ আসবে। বাংলাদেশ শ্রদ্ধায় নত হবে তার অবদানের জন্যে। এখন তিনি তার বাবাকে বলতে পারবেন না- দেখো বাবা, ঝিলু দ্য গ্রেট হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশ ঠিকই বলতে পারবে- ঝিলু দ্য গ্রেট হয়েছে, সত্যি সত্যি ঝিলু দ্য গ্রেট হতে পেরেছে!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)