চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জীবিকার অনিশ্চয়তা তাড়া করছে প্রতিদিন

বেসরকারি অফিসে কাজ করত সীমা আর শাহেদ (ছদ্মনাম)। বেশ ভালোভাবেই পরিবার চলত দুজনের আয়ে। তবে বেতনের অংক অনুপাতে জীবন যাত্রার মান রাখতে গিয়ে সঞ্চয় তেমন ছিল না। আর্থিক সচ্ছলতা থাকায় তাদের বিশ্বাস আর স্বপ্ন ছিল স্বামী স্ত্রী চাকরি করে ২ ছেলেকে ভালোভাবেই পড়াশোনা করাতে পারবে। কিন্তু কোভিড-১৯ তাদের জীবনে প্রলয় তুলে দিয়েছে। লকডাউনের পর থেকে চাকরি নিয়ে দুশ্চিন্তা শুরু হয়।

সার্বিকভাবে সারা বিশ্ব স্থবির হয়ে গেছে। ব্যবসা বাণিজ্য কবে স্বাভাবিক হবে তা কেউ জানে না। এ অবস্থায় শাহেদের বেতন অনিয়মিত হয়েছে। আর সীমা এখন জবলেস। স্বল্প সঞ্চয় দিয়ে পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে দুজনে। দৈনন্দিন জীবনের চাহিদাকে কাটছাট করতে গিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে বাচ্চাদের কাছে। শাহেদের চাকরিটা থাকবে কিনা তাও এখন বলা মুশকিল। সব মিলিয়ে তাদের এ করুণ দশা কাউকে বলা সম্ভব না সামাজিক মর্যাদার কারণে। চাইলেও কারো কাছে হাত পাতা সম্ভব নয়। সীমা নতুন করে কবে চাকরি পাবে তা বলা যায় না।

সীমা শাহেদের মতো পরিস্থিতিতে আছে এখন এদেশের অসংখ্য পরিবার। কোভিড-১৯ মানুষের আয় রোজগারের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ কর্মহীন হবার শঙ্কায় ভুগছে। কেউ চাকরি হারিয়ে আবার কেউ ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবার কারণে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষকে সরকারিভাবে ত্রাণ ও সাহায্য সহযোগিতা করা হয়েছে লকডাউনকালীন সময়ে, যা এখন ও চলমান। তবে কর্মসংস্থান ছাড়া বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য খরচ মেটানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণ নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হলে চাকরি বা ব্যবসা বাণিজ্য স্বাভাবিক পরিস্থিতি থাকা দরকার। সব কিছুই বদলে গেছে। এখন কোনভাবে বেঁচে থাকাটাই মুখ্য বিষয়।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাব অনুপাতে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ছিলো ২৭ লাখ। কিন্তু কোভিড-১৯ এর মহামারীতে বিশ্বে প্রতি ছয়জনের একজন বেকার হয়েছে, আর বাংলাদেশের প্রতি চারজন যুবকের মধ্যে একজন কর্মহীন বা বেকার রয়েছে। আইএলও’র সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে এক ঘন্টা কাজের সুযোগ না পেলে এই ব্যক্তিকে বেকার হিসেবে ধরা হয়।

অন্যদিকে পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ২০১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৬ কোটি ৩৫ লাখ। এর মধ্যে কাজ করেন ৬ কোটি ৮ লাখ নারী পুরুষ আর ২৭ লাখ বেকার। বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ৪.২% হলেও যুব বেকারত্বের হার ১১.৬ শতাংশ। করোনাভাইরাসের কারণে সেটি আরও কয়েক গুণ বেড়েছে। কারণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন নিয়োগ হচ্ছে না। বরং চাকরি হারাচ্ছে অনেকেই। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেশের বড় একটি সেক্টর হলো গার্মেন্টস শিল্প। সেখানে সরকারী প্রণোদনা খুব বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। করোনাভাইরাসের কারণে এই শিল্পের বিশ্ব বাজার মন্দা। যার ফলে চাকরি হারাচ্ছে গার্মেন্টসের শ্রমিক ও কর্মকর্তারা।

বিজ্ঞাপন

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট এর মতে বাংলাদেশের প্রায় দেড় কোটি মানুষ চাকরি হারিয়ে আর্থিক অনিশ্চিয়তাতে সম্মুখীন হবে। যার প্রভাব পড়বে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের উপর (প্রতি পরিবারে গড়ে ৪ জন করে সদস্য)।

বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানসমূহ সীমিত পরিসরে তাদের কার্যক্রমকে সচল করতে পারছে না। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হোটেল, পর্যটন, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠা, পরিবহন ব্যবসা সহ অন্যান্য ছোট আকারে বিভিন্ন ধরনের সেবা ও পণ্য বিনিময় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে কোভিড-১৯ এর স্থবির পৃথিবীতে। আগামীতে সব কিছু কবে ঠিক হবে তা বলা অসম্ভব। এমন অবস্থা প্রণোদনা প্যাকেজের ব্যাংক ঋণ নিয়ে আরও হুমকির মুখে পড়তে চায় না। উল্টো ব্যয় সংকোচন করতে কর্মী ছাটাই করছে নানা ভাবে।

সুতরাং চাকরি বা ব্যবসার বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের অনিশ্চিত জীবনের তাড়ানো কেবল সীমা শাহেদের পরিবারের কথা নয়। এ অনিশ্চিয়তা প্রায় প্রতিটি পরিবারে প্রতিদিনের দুশ্চিন্তা। জীবনের টিকে থাকার লড়াইতে করোনা ভাইরাসমানুষকে দারিদ্রতার মুখে দাঁড় করে দিয়েছে। যেখান থেকে মুক্তি পাবার উপায় বলা তেমনই মুশকিল, যেমন করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার কবে হবে বলা অসম্ভব।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

শেয়ার করুন: