চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

চেহারা বা গ্ল্যামার নয়, আমরা গল্পটাকে বিক্রি করতে চাই: বিজন

২৩ মার্চ প্রেক্ষাগৃহে আসছে ‘মাটির প্রজার দেশে’

মাটির প্রজার দেশে। সিনেমা নিয়ে খোঁজ খবর রাখেন যারা, নামটি তাদের কাছে খুবই পরিচিত। বিশেষ করে যারা একটু ভিন্ন ধাঁচের সিনেমায় আগ্রহী। তবে এই সিনেমাটির পরিচিতি মূলত পৃথিবীর বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভালে বাংলাদেশের সিনেমার প্রতিনিধিত্ব করার কারণে। বছর দেড়েক ধরেই থেমে থেমে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের ফিল্ম ফেস্টিভালে ছবিটি মনোনীত কিংবা মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে লড়াই করে আসছে। বিদেশের দর্শকরা সিনেমাটি দেখলেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে হয়নি ছবিটির প্রদর্শনী। তবে এবার আগ্রহীদের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামী ২৩ মার্চ বাংলাদেশের দুটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে যাচ্ছে সিনেমাটি। তার আগে ছবির নির্মাতা বিজন ইমতিয়াজ মুখোমুখি হলেন চ্যানেল আই অনলাইনের। বর্তমানে তিনি বাস করছেন আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলসে। সেখান থেকেই নিজের প্রথম পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিটি নিয়ে জার্নির কথা জানালেন বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে:

কেমন আছেন?
জ্বী, ভালো আছি।

কোথায় আছেন এখন? কী করছেন?
আমি থাকি লস অ্যাঞ্জেলসে। ব্যস্ততার ফাঁকে বিভিন্ন কমিউনিটিতে গিয়ে গিয়ে ফিল্মের ক্লাস নেই।

কী ধরনের?
এটা মূলত হাইস্কুল আর বাচ্চাদের ফিল্ম মেকিংটা শেখাই আর কি! বিভিন্ন এরিয়াতে গিয়ে। প্রথম সেমিস্টারে স্ক্রিপ্ট লেখে, আর দ্বিতীয় সেমিস্টারে শুট করে। থার্ড সেমিস্টারে এডিট করে। আর পুরো বছরে যে সিনেমাগুলো হয়, এগুলো নিয়ে বছর শেষে একাডেমিতে একটা স্ক্রিনিং হয়।

এটা আপনারা কোনো সংগঠন থেকে করছেন, নাকি ব্যক্তি উদ্যোগে?
আমরা অর্গানাইজেশন থেকে করি। আমাদের প্রজেক্টের নাম ইয়ুথ সিনেমা প্রজেক্ট। এটা হচ্ছে লিটারারি একটা প্রোগ্রাম। ওরা নিজেরাও জানে না যে তারা ফিল্ম মেকিংটা শিখছে। আর আমরা অ্যাকজেক্ট টিচার না, সেখানে আমরা ফিল্ম মেকার হিসেবে যাই। তাদের সাথে মিশি, সিনেমা বানাই।

আপনি তো ওইখানেই স্থায়ীভাবে আছেন?
হ্যাঁ। লস অ্যাঞ্জেলসে আছি। ঢাকাতেও যাই মাঝেমধ্যে। জাপানি একটা কোম্পানির সাথে কাজ করছি। তাদের একটা প্রজেক্ট নিয়েছি আমরা। আর এমনিতে ট্রাভেল করা হয় অনেক।

আপনার নির্মাণে ‘মাটির প্রজার দেশে’ মুক্তি পাচ্ছে ২৩ মার্চ। আপনি কবে আসছেন?
আমার আসাটা এখনো নিশ্চিত না। অনেক কিছুর উপর ডিপেন্ড করছে আসলে।

দুটো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে ছবিটি, এরকমটা শুনলাম…
বেসিকেলি এসব আমরা নিজেরা করছি। বড় আকারে ছবিটি মুক্তি দেয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। তো প্রাথমিকভাবে আমরা চেয়েছি ছবিটি একটি দুটি হলে মুক্তি দিতে। এক্ষেত্রে আমরা আমেরিকান ইন্ডিপেন্ডেন্ট মডেলকে ফলো করছি। জিরো থেকে শুরু করতে চাই। এরপর যদি ছবিটা মানুষের পছন্দ হয়, তাহলে হল বাড়বে। না হলে বাড়বে না। আপনি জানেন বোধহয়, বাংলাদেশ পৃথিবীর এমন একটা দেশ যেখানে ফিল্ম স্ক্রিনিং করলে তার প্রজেক্ট ভাড়া আলাদা দেয়া লাগে। এবং বাংলাদেশ বোধহয় একমাত্র দেশ যেখানে ডিস্ট্রিবিউটররা মার্কেটিংয়ের জন্য এক টাকাও ইনভেস্ট করে না।

আর আমরা মূলত এ ধরনের কাজ করি, এ ধরনের কাজই করবো ভবিষ্যতে। আমার বিশ্বাস সব ধরনের সিনেমার একটা আলাদা মার্কেট আছে। আনফরচুনেটলি বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছানোর যে পদ্ধতিগুলো আছে, সেইসব বুরোক্রেসিগুলো পার হওয়ার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা আমাদের নেই। আমরা শুরু করতে চাই ছোট দিয়ে। সেখানে যদি দর্শক ছবিটি দেখতে আসে, আগ্রহ বোধ করে তাহলে আমরা পরবর্তীতে হল বাড়াতে পারবো।

আপনারা কি ছবিটি বেশি পর্দায় আনতে ডিসস্ট্রিবিউটরদের সাথে কথা বলে ছিলেন?
হ্যাঁ। আমরা অনেকের সাথেই কথা বলেছি। অনেকের আগ্রহও ছিল। কিন্তু অভারঅল ডিস্ট্রিবিউটর নিয়ে যে সিন্ডিকেটগুলো আছে, এগুলো নিয়ে আমরা রিসার্চ করেছি। এবং সবশেষে আমাদের মনে হয়েছে যে আমাদের আসলে ছোট থেকেই শুরু করা উচিত। আমাদের এই পদ্ধতিই বেটার মনে হয়েছে। আর সত্যি কথা বলতে, ডিস্ট্রিবিউটিং বলতে আমরা যা বুঝি, আমাদের দেশে সেটা না। মূলত বুকিং এজেন্টকেই বাংলাদেশে ডিস্ট্রিবিউটিং বলা হয়। কিন্তু আসলে তো বিষয়টা তা না। ডিস্ট্রিবিউটিং হচ্ছে সে সিনেমাটা নিজের কাঁধে নিয়ে নিবে, মার্কেটিং থেকে শুরু করে সব সে করবে। এবং সিনেমাটা লাভ করলে তার একটা অংশ সে নিবে। মার্কেটিংয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে ডিস্ট্রিবিউটিং বিষয়টা জড়িত। সব বিবেচনায় আসলে আমরা আমাদের সিনেমাটা আমাদের মতো করেই দেখাতে চাইছি। তার মানে এই না যে আমাদের ব্যবসা করার উদ্দেশ্যটা নেই। কিন্তু ব্যবসাটা আমরা আমাদের মতো করেই করতে চাই। আমাদের এখানে তো সিনেমা হিট মানে বেশি সিনেমা হলে চলতে হবে, হিট মানে এতো টাকা কামাবে! কিন্তু আমার সিনেমায় এখন পর্যন্ত কতো টাকা খরচ হয়েছে, কতো টাকা কামিয়েছি এটা কিন্তু দর্শকরা জানে না। তো আমাদের তো নিশ্চয় একটা বিজনেস প্ল্যানও আছে। এবং আমরা চাইছি, আমাদের অনেক মানুষ আছেন যারা ‘মাটির প্রজার দেশে’ মতো ধরনের সিনেমা দেখতে আগ্রহী। আমরা আসলে তাদেরকে অনুপ্রেরণা মনে করি। আর তাদের কারণেই আমরা থিয়েটারে নিয়ে আসছি। যেন তাদের সাথে আমাদের একটা যোগাযোগ হয়। এবং সেটা যদি বড় আকারে হয় তাহলে দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে হল বাড়বে। না হলে বাড়বে না। কিন্তু আমরা মূলত ইন্ডিপেন্ডেন্ট থিওরি ফলো করছি। ছোট থেকে বড় হবো, বড় থেকে ছোট হতে চাই না। যেগুলোকে আমরা আগে থেকে ব্লকবাস্টার সিনেমা বলি, সেগুলার ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রথম সপ্তাহে একশো দুইশ হলে মুক্তি পায়। কিন্তু দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই নামতে থাকে। আমরা এমনটা চাই না। আমরা ঠিক তার উল্টো পথে হাঁটতে চাই। আর সিনেমা রিলেটেড সবকিছু নিয়ে আমরা একটা লার্নিং প্রসেসের মধ্যে আছি আসলে।

ঠিকাছে। এবার তাহলে আমরা ছবির প্রসঙ্গে আসি। মাটির প্রজার দেশ কোনটা? সেই দেশ কেমন?
আমার কাছে কালচার জিনিসটা আসলে মনে হয় যে, ভালো যা হচ্ছে বা খারাপ যা হচ্ছে এর জন্য আমরা সবাই রেসপন্সসিবল। ব্যাপারটা এরকম না যে, একজন ভিলেন আছেন, সে সব খারাপ করছেন। আবার একজন হিরো আছেন, সে সব ভালো করছেন! আমার মনে হয়, আমরা নিজেরাই মাটির প্রজা, আমরা নিজেরাই রাজা। যে ধরনের আইন কানুন প্রথা আমরা তৈরি করি, এগুলো তো মানুষেরই তৈরি। মূলত মাটির প্রজার দেশে আসলে বাংলাদেশেরই একটা মেটাফর। মাটির মানুষ বলতে যে মেটাফরটা আসলে ব্যবহার করি, এটা তাই।

মাটির প্রজার দেশের গল্প ভাবনা তো আপনারই। গল্প নিয়ে আগে একটু শুনি…
মূলত ১০ বছর বয়সের জামাল নামের একটা ছেলের গল্প। যে বাবার নাম বলতে পারে না দেখে স্কুলে যেতে পারে না, স্কুলে ভর্তি হতে পারে না। তার জীবন, এবং তার আশেপাশের নারীদের সাথে তার সম্পর্ক নিয়েই গল্পটা। তার বন্ধু, মা কিংবা তার যে স্ট্রাগল। এটাই আসবে সিনেমায়।

পাঁচ বছর সময় নিলেন সিনেমাটা নির্মাণ করতে। স্ট্রাগল করতে হয়েছে নিশ্চয়? সিনেমা নিয়ে আপনার স্ট্রাগলের গল্পটা কেমন ছিল? লস অ্যাঞ্জেল
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিলসফোর্নিয়া লস অ্যাঞ্জেলস থেকে আমি ফিল্ম ডিরেকশন পড়েছি। সেখান থেকে মাস্টার্স করেছি। যখন পড়ি সেখানে, তখন ক্যাম্পাসে বসে লেখা ‘মাটির প্রজার দেশে’র গল্পটা। তখন আমি কিছুটা দ্বন্দ্বে পড়ি। ভাবছিলাম, আমি আমেরিকায় সিনেমা নিয়ে কাজ করবো, নাকি দেশের সিনেমায় কাজ করবো। আগে থেকেই দেশে গিয়ে কাজ করার ইচ্ছে ছিল আমার। সো এই গল্পটা নিয়ে প্রথমবার আমি আরিফের সাথে কথা বলি। সে হচ্ছে এই ছবির প্রডিউসার। আমার ছোট বেলার বন্ধুও সে। সে রাজি হলে আমরা ‘গুপি বাঘা’ প্রোডাকশন নামে লিমিটেড হাউজ করি। এবং ছবিটি নির্মাণের পরিকল্পনা করি।

আর স্ট্রাগল বলতে, বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা ছেলে সিনেমা বানানোর ইচ্ছে কীভাবে হয়, তার জন্য কি করতে হয় এসব তো সবারই জানা মোটামুটি। যেটা প্রথমেই একটা থিউরিটিক্যালি জায়গা থেকে আসে, যেখানে প্রচুর অবাস্তব থাকে। এবং আপনি যখন যুদ্ধে নামবেন তখন বুঝতে পারবেন আপনার লিমিটেশনগুলো। মূল লিমিটেশন অবশ্যই অর্থ। অভিজ্ঞতা, শিক্ষার একটা ব্যাপার আছে। কোনটা কীভাবে করলে টাকা কম লাগবে এসব আমাদের শিখতে সময় লেগেছে। ২০১১ সালে আমরা প্রথম কাজ শুরু করি। প্রিপ্রোডাকশন। এরপর ২০১২ সালে প্রথম শুট করি। মাত্র দশদিন শুট করতে পেরেছিলাম। পরে আবার ২০১৩ সালে আবার আমরা দশদিন শুট করি। সেসময় আবহাওয়া খুব খারাপ ছিল রাজশাহীতে। আরো কিছু সমস্যা ছিল তখন। সব টাকা আমাদের নাই হয়ে যায়। এরপর আট মাস কাজ বন্ধ ছিল। আট মাস পর টাকা যোগাড় হলে আবার আমরা শুটে যাই।

Advertisement

প্রথম সিনেমা করতে এসে অর্থাভাবে শুট বন্ধ হয়ে যাওয়া একটা কমন ঘটনা…
টাকার জন্য হয়তো আমার প্রথম সিনেমা পাঁচ বছর লেগেছে। কিন্তু এখন যদি আমার কাছে একটা সিনেমা বানানোর টাকা থাকেও, তবু আমি তিন বছরের আগে একটা সিনেমা শেষ করতে চাই না। মানে আমার পক্ষে তিন বছরের কমে একটা সিনেমা করা সম্ভব না। ইটস অ্যা লং প্রসেস। এটা একটা ধ্যানের মতো। একটা ভালো স্ক্রিপ্ট লিখলেও তো ৬মাস সময় নেয়া উচিত। এরপরে শুট, এডিটিংয়ে আরো এক বছর করে সময় আমি নিবোই। এক কথায়, অর্থের জন্য হয়তো ছবিটা করতে পাঁচ বছর লেগেছে কিন্তু এরপরে আমাদের হাতে সিনেমার টাকা থাকলেও অন্তত আমাদের আড়াই থেকে তিন বছর সময় লাগবেই।

স্টার ইমেজ না থাকলে বড় পর্দায় কোনো সিনেমার প্রতি আগ্রহ তৈরি না হওয়ার একটা ব্যাপার আমাদের দর্শকদের মধ্যে আছে। সেই জায়গায় আপনার ‘মাটির প্রজার দেশে’তো সেইভাবে বললে কোনো তারকা মুখ নাই। মানুষ কেন আসবে সিনেমাটি দেখতে?
আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, আমাদের সিনেমায় মূল চরিত্র কিন্তু জামাল আর লক্ষ্মী। বাচ্চা দুটি। টিজারে, ট্রেলারেও দেখবেন বাচ্চা দুটিকে ছাড়া কিন্তু আমরা আর কাউকে প্রাধান্য দেয়নি। মূল গল্প যাদের, তাদের নিয়েই কিন্তু আমরা প্রচারণাটাও করছি। আসলে আমরা গল্পটা মানুষকে দেখা চাই। কিন্তু আপনি যদি গ্ল্যামার, মার্কেটিং বা স্টার কাস্টের কথা বলেন তাহলে বলবো, ওইসব দিক দিয়ে আমরা পিছিয়ে। আমরা আসলে গল্পটাকেই সেল করতে চাই। মুদ্দা কথা, চেহারা বা গ্ল্যামার নয়, আমরা এই ছবির মধ্য দিয়ে আসলে গল্পটাকেই বিক্রি করতে চাই।

সিনেমা নির্মাণে আপনি গল্প, নাকি নির্মাণ কলা কৌশলকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?
আমার কাছে মনে হয়, একটা সিনেমায় গল্পই সব। গল্পের সাথে যদি কলা কৌশল থাকে তাহলে ফাইন। অনেক সিনেমা আছে যেগুলোর কলা কৌশল হয়তো খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ না, কিন্তু ছবির গল্প ভালো। এটা কিন্তু ক্লিক করে ফেলে। দর্শককে কানেক্ট করতে পারাটাই আসলে মুখ্য। আমার মা যখন সিনেমা দেখে, তখন কিন্তু তিনি কলা কৌশল দেখতে বসেন না। তার কাছে সিনেমা মানেই একটা গল্প। একটা চরিত্রের আপ ডাউনগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি সিনেমায় কানেক্ট করেন। আমার মা আসলে এখানে সবার মায়ের কথায় বলছি। আমি খুব লক্ষ্য করে দেখেছি, তারা আসলে একটা সিনেমা থেকে কি নেয়? গল্প নাকি কলা কৌশল!

ইন্ডিপেন্ডেন্ট বা এক্সপেরিমেন্টাল সিনেমা যারা করেন, তারা একটা সিনেমায় গল্পের চেয়ে কলা কৌশলকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন। দেখেছি বিভিন্ন সময়। মাটির প্রজার দেশে আসলে কেমন সিনেমা?
আমার মতে সিনেমায় কলা কৌশলগুলো আসলে আসলে গল্পের সাব-অর্ডিনেন্ট হওয়া উচিত। গল্প যদি প্রাধান্য পায় তাহলে আপনি বুঝে নিতে পারবেন তার জন্য কি কি কলা কৌশল ব্যবহার করতে পারবেন। এখন আপনি যদি কলা কৌশল ব্যবহারের জন্য গল্প বলতে চান তাহলে তো এই সিনেমার সাথে কানেক্ট করা সম্ভব না।

প্রচুর ফেস্টিভাল, দেশে বিদেশে সিনেমাটি নিয়ে ঘুরবেন। এরকম ভাবনা সেট করেই কি ‘মাটির প্রজার দেশে’ বানানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?
এরকম ভাবনা ছিল। তার কারণ, আমরা যে ধরনের সিনেমা বানাই, সেগুলোকে আমাদের দেশের সিনেমা ব্যবসায়ীরা সিনেমায় মনে করেন না। এই সিনেমা যে ব্যবসা করবে এটা ভেবেও দেখেন না। সো আমরা যদি কন্টিনিউয়াসলি এসব কাজ করে যেতে চাই, তাহলে বিভিন্ন দেশে আমাদের ধরনের সিনেমা যারা বানায় তাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করাটা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। আমার কাছে ফেস্টিভাল কিন্তু সেখানে গেলাম, আমার সিনেমা দেখাল, কাগজে কয়টা নিউজ হলো ব্যাপারটা কিন্তু তা না। বরং সারা বিশ্বের এ ধরনের ফিল্মমেকাররা একসাথে হওয়ার একটা প্লাটফর্ম। এবং আমরা যে ধরনের সিনেমা করতে চাই, এবং একই ধরনের সিনেমা যারা প্রডিউস করতে চান তাদের একটা যোগসাজশ তৈরি করে দেয় ফেস্টিভালগুলো। হ্যাঁ, কাগজে নিউজ হলে আমাদের একটা ভ্যালু তৈরি হয়, কিন্তু তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু পৃথিবীর যেকোনো আন্তর্জাতিক মানের ফেস্টিভালগুলো।

তার মানে ফেস্টিভালগুলো ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকারদের পরবর্তী কাজের অর্থের যুগানও তৈরি করে দিতে সহায়ক?
হ্যাঁ। অবশ্যই। ধরেন, বিভিন্ন দেশ থেকে আমরা যে ধরনের সিনেমা তৈরি করি বা ভবিষ্যতে করবো। এরকম ভাবনার মানুষেরাই তো ফেস্টিভালে আসেন। আর আয়োজকরা এক্ষেত্রে খুব পজিটিভ। দেখা গেল আমি ‘মাটির প্রজার দেশে’ সিনেমাটা নিয়ে কোনো ফেস্টিভালে গেলাম। কিন্তু আমার ছবিটা পারফেক্ট না। এই ফেস্টিভালে যাওয়ার মতো না। কিন্তু আয়োজকরা হয়তো এই সিনেমায় ছোট্ট একটা ইউনিকনেস খুঁজে পেল। তো আয়োজকরা ভাবে, এই ইউনিকনেসটুকু যেহেতু আছে তাহলে ওকে আরো ইনভেস্ট করলে হয়তো সামনে আরো আরো ইউনিকনেস বেরিয়ে আসবে। এই ক্ষুদ্র সম্ভাবনাটুকু পেলেও তারা আপনাকে অন্তত সাপোর্ট দেয়। এবং ফেস্টিভালে এক ধরনের ব্যবসায়িক প্লাটফর্মও খুঁজে পাওয়া যায়। যেরকম আমরা ‘মাটির প্রজার দেশে’ নিয়ে বিভিন্ন ফেস্টিভালে ঘুরতে যেয়ে এরকম অনেক প্লাটফর্ম পেয়েছি।

‘মাটির প্রজার দেশে’ ছবিটি নিয়ে বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভালে জার্নি নিয়েও আসলে আমরা শুনতে চাই। কারণ বেশকিছু ফেস্টিভালে যাওয়ার খবর ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি?
পৃথিবীতে ত্রিশটার মতো অ্যা-লিস্টের ফিল্ম ফেস্টিভাল রয়েছে। এরমধ্যে আমরা সিয়াটল ও সিনেকোয়েস্টে দেখিয়েছি। আর এরপরে অঞ্চলভিত্তিক বেশকিছু ফেস্টিভালে গিয়েছি আমরা। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকারও কিন্তু বেশ কয়েকটা ফেস্টিভালে আমাদের ছবি পাঠিয়েছে। তাসখন্ডে, ইন্দোনেশিয়া এবং বালিতে বাংলাদেশ সরকার আমাদের ছবিটি পাঠিয়েছে। কারণ ‘মাটির প্রজার দেশে’ সেন্সর বোর্ডে দেখানোর সময় সবাই ছবিটি খুব পছন্দ করে। এরপর থেকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে কোনো ফেস্টিভাল থেকে আমন্ত্রণ এলেই তারা আমাদের ছবিটিকে পাঠায়।

দেশি দর্শকরা প্রথমবার ছবিটি দেখার সুযোগ পেতে যাচ্ছিলো এবছর ঢাকা আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে? কিন্তু দেখালেন না প্রজেকশন সমস্যার কারণে? আয়োজকরা নাখোশ হয়নি?
দেখুন, ঢাকা আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালের একটা বড় অংশ বাংলাদেশ সরকারের টাকায়। একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমার মনে হয়েছে যে এই ফেস্টিভালে আমার ফিল্মটা না দেখানো। কারণ, একটা ভালো প্রজেক্টর তাদের নেই। অথচ সরকার তাদের লক্ষ লক্ষ টাকা দেয়। আমাদের তরফ থেকে এটা আয়োজকদের প্রতি আমাদের একটা প্রতিবাদ ছিল। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে আমরা ফেস্টিভালে ছবি না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায় অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছে। বাহবা দিয়েছে। ফারুকী ভাই থেকে শুরু করে রোবায়েত, ইমন ভাই সকলেই আমার সিদ্ধান্তে সমর্থন জানিয়েছেন। কারণ তারাও এই ফেস্টিভালকে ঘিরে এরকমটা ফেইস করেছেন। সত্যি কথা বলতে আমরাও এই ফেস্টিভালে সিনেমাটা দেখানোর জন্য আগ্রহী ছিলাম। খুবই আগ্রহী ছিলাম। আয়োজকরা হয়তো আমাদের সাথে রাগ করেছে, কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে ফিল্ম ফেস্টিভালের প্রথম উদ্দেশ্য হচ্ছে স্ক্রিনিং। তার মানে এটার সাথে প্রজেকশন ব্যাপারটা গভীরভাবে জড়িত। আর আয়োজকরা সেটা ঠিকভাবে ব্যবস্থা করবেন। কারণ দর্শকেরও একটা ছবি এনজয় করতে পারতে হবে। নূন্যতম প্রজেকশন ব্যবস্থা না থাকলে সেটা কীভাবে সম্ভব! এমন তো না যে আমাদের সামর্থ্য ছিল না। দেখেন, অডিটোরিয়ামের বাইরে বিশাল বিশাল ফেস্টুন, ব্যানারে ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায় এরকম তাদের ছবি রাখে। আমার তো মনে হয়, এইসব টাকা দিয়েও প্রজেকশন করা যেত। মানে আমরা আসলে কোথায় টাকা খরচ করছি, কেন করছি এটাও কিন্তু ভাবা উচিত। আসলে এই ব্যাপারটা নিয়ে আমরা খুব দুঃখিত। অনেকেই আমাদের উপর রাগ করছেন। আমরা ছবিটা দেখাতে পারিনি। কিন্তু ভাবুন, আমার ক্রু এই সিনেমাটার জন্য পাঁচ বছর সময় খরচ করছে, আমার ফ্যামিলি প্রচণ্ড পরিমাণ সেক্রিফাইস করছে। তাদের প্রতিও তো আমার একটা দায়িত্ব আছে যে বাজে একটা প্রোজেক্টরে আমি আমার সিনেমাটা দেখিয়ে ফেলবো। আমাদের কিন্তু প্রচণ্ড চাপও নেয়া লাগছে সিনেমাটা না দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়। কারণ ছয়শ মানুষকে আমরা দাওয়া দিয়ে ফেলছিলাম। ইন্ডাস্ট্রির এমন কেউ নাই যাকে আমরা দাওয়াত করিনি ছবিটি দেখতে। তারপর স্ক্রিনিংয়ে আগে গেইটের সামনে আমাদের দাঁড়িয়ে থাকা লাগছে দাওয়াতি অতিথিদের ফিরিয়ে দিতে যে, আমরা সিনেমাটা দেখাচ্ছি না।

সিনেমায় মিউজিক করলেন ভারতের অর্ক মুখার্জী এবং সত্যকি ব্যানার্জী। তাদের সাথে কোলাবোরেট কীভাবে, আর তারাই বা কেন?
এই সিনেমায় কিন্তু গান নেই। জাস্ট মার্কেটিংয়ের জন্য গানটা করা। সিনেমার আলাদা ফুটেজ দিয়ে গানটা করেছি। যার ভিডিও খুব শিগগির আসবে। সিনেমার থিমের সাথে যায় এমন একটা গানই নিচ্ছি আমরা। গানটা সত্যকি ব্যানার্জীর লেখা।

তারা তো ফোক মিউজিক করেন বেশি। আপনার সিনেমার গানের সাথে তারা কীভাবে রিলেট করলো?
আমাদের সিনেমায় ইসলামি ফিলসফির কিছু বিষয় আছে। এবং এজন্যই এমন কাউকে খুঁজছিলাম যেন তিনি আমাদের বিষয়টা বুঝতে পারেন। হঠাৎ কলকাতায় একদিন অর্ক’দার সাথে আমার দেখা হয়ে যায়। এমনিতে তার গান আমার ভীষণ পছন্দের। আমি আর আরিফ তাকে আমাদের সিনেমায় গানের জন্য অনুরোধ করার আগে তাকে আমাদের সিনেমাটা দেখতে বললাম। এবং এও বললাম, সিনেমাটা দেখার পর যদি তোমার ভালো লাগে তাহলে আমাদেরকে একটা গান করে দিতে হবে। উনি সিনেমা দেখলেন, এবং ভীষণ পছন্দও করলেন। তখন জিনিষটা খুব ন্যাচারালি হলো আরকি।  পরবর্তীতে আরিফ আবার কলকাতায় গিয়ে সত্যকি দা ও অর্কদার সাথে রেকর্ডিং করে আসছে।

তারা তো সম্প্রতি ঢাকায় আসছেন বোধহয়?
হ্যাঁ। তারা আসবে। কিন্তু বিশ্বাস করেন তাদেরকে আমরা কিন্তু কোনো পারিশ্রমিক দেইনি। আমরা তো নিজেদের টাকায় খুব ছোট ছোট পদক্ষেপে সিনেমাটা বানিয়েছি। তো দেখা গেছে, আমাদের কাজকে যারা পছন্দ করছেন তারাই স্ব-উদ্যোগী হয়ে আমাদেরকে সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছেন। আমাদের সিনেমায় যারা কাজ করছেন, তারা খুব কম টাকার বিনিময়ে কাজ করছেন। অনেকেই কোনো পয়সাই নেননি। এটা আমাদের জন্য পরম পাওয়া। এমনকি অর্ক, সত্যকি দার ক্ষেত্রেও তাই। আমাদের কিন্তু সামর্থ্য নাই কাউকে হায়ার করে একটা কিছু করার। অর্ক দা কিংবা সত্যকি দা, তারা কিন্তু নিজে থেকে আসছেন।

মাটির প্রজার দেশে’র জার্নির শেষ কোথায়?
আমাদের ক্যারিয়ার, আমাদের জীবনের সাথে মাটির প্রজার দেশে ছবিটি জড়িয়ে গেছে। আমাদেরকে আন্তর্জাতিকভাবে বা দেশেও একটা প্লাটফর্ম কিন্তু তৈরি করে দিয়েছে এই ছবিটা। এমনকি আমার পরের ছবিটাও কিন্তু ‘মাটির প্রজার দেশে’ করেছি বলেই হবে। মানে আমাদের জীবন যতদিন যায়, ততদিনই আসলে এই জার্নিটা অব্যাহত থাকবে। এখন তাকিয়ে আছি আমাদের দেশে কেমন রেসপন্স পায় ছবিটা তার দিকে। এরপর নর্থ আমেরিকা, কানাডায় ছবিটা মুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। এসব হয়ে গেলে অনলাইন একটা প্লাটফর্মে ছবিটা দিয়ে দিবো। মানে হচ্ছে, একটা কমার্শিয়াল ছবির যতোটা ধাপ থাকে সবগুলোই আমরা পার হবো, কিন্তু সেটা আমাদের মতো করে। ছোট আকারে। আমরা একেবারে শেষ পর্যন্ত দেখতে চাই।

এরপর নতুন কোনো কাজে এনগেজড কিনা! গোপি বাঘা প্রোডাকশন কি নিয়ে ব্যস্ত এখন?
আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ নামের একটি ছবি আসছে সামনে। এটা কিন্তু ‘খেলনা ছবি’ এবং ‘গুপী বাঘা’ যৌথ প্রোডাকশনে হয়েছে। মানে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’র সবকিছু দেখছে গুপী বাঘা প্রোডাকশন। এরই মধ্যে ইউরোপের বাজারে ছবিটি বিক্রি হয়েছে। এটারও একটা ভালো জার্নি হবে।
এছাড়া আমি আর আরিফ নিয়মিত ডকুমেন্টারি করি।

ধন্যবাদ। ‘মাটির প্রজার দেশে’র জন্য অগ্রিম শুভ কামনা…
আপনাকেও ধন্যবাদ