চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস: ঘরে খাবার চলে আসার বিশ্বাসটা মনে থাকতে হবে

করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষার পাশাপাশি প্রান্তিক মানুষদের জন্য খাদ্য সহায়তাও জরুরি। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে তাই সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় ও কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে প্রান্তিক পরিবারগুলোর বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে মনে করছেন ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেইঞ্জের পরিচালক কেএএম মোর্শেদ।

চ্যানেল আই অনলাইনকে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, করোনাভাইরাসের বিষয়ে গ্রামের মানুষ অনেক দূরের কথা, শহরের অনেকেই এখনও ভাল করে জানেন না। করোনার চিকিৎসা, কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন বিষয়েও তাদের মধ্যে রয়েছে নানা ভ্রান্ত ধারণা। তারপরও বছর বছর নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো বাঙালি জাতি করোনাও মোকাবেলা করবে বলে আশাবাদী তিনি।

বিজ্ঞাপন

দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠির উপর করোনার প্রভাব নিয়ে দেশের বৃহত্তম উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক জরিপ পরিচালনা করে যে ভবিষ্যত করণীয় সুপারিশ করেছে, চ্যানেল আই অনলাইনের কাছে তার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন  ব্র্যাক পরিচালক কেএএম মোর্শেদ।

বিজ্ঞাপন

ব্র্যাকের ওই জরিপে উঠে এসেছে, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও ঘরে থাকার পরামর্শ মানতে গিয়ে নিম্নআয়ের মানুষের আয় অনেক কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে চরম দারিদ্র্যের হার আগের তুলনায় বেড়ে গেছে ৬০ শতাংশ। ১৪ ভাগ মানুষের ঘরে কোনো খাবারই নেই। কী কী ব্যবস্থা অবলম্বনের মাধ্যমে কোভিড-১৯ প্রতিরোধ করা সম্ভব সে বিষয়েও ৩৬ শতাংশ উত্তরদাতার পরিষ্কার ধারণা নেই। এমনকি করোনা সংক্রমণের লক্ষণ (জ্বর কাশি শ্বাসকষ্ট) দেখা দিলে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরাসরি চলে না আসার যে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়েও ধারণা নেই অধিকাংশের।

এ বিষয়ে ব্র্যাক পরিচালক বলেন, করোনাভাইরাসের বিষয়ে সচেতনতার বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি নানা উদ্যোগ থাকলেও গ্রামের মানুষতো দূরে থাক, শহরের অনেকেই বিষয়গুলো বুঝতে পারছে না। অনেকের মধ্যে নানা ধরণের ভুল ধারণা রয়েছে করোনাভাইরাস সর্ম্পকে। এছাড়া এর চিকিৎসা বিষয়ে রয়েছে নানা ভয় আর অজ্ঞতা। অনেকের ধারণা করোনার চিকিৎসা শুধুমাত্র ঢাকাতেই হয়, একবার করোনা হলে আর রক্ষা নেই! এছাড়া কোয়রেন্টাইন আর আইসোলেশন নিয়েও নানা ভয় তাদের মধ্যে কাজ করে, যেগুলো দ্রুত দূর করা জরুরি।

”অনেকে করোনার লক্ষণ নিয়েও ভয়ে চুপ করে বসে থাকছেন। এক্ষেত্রে যেসব করোনা রোগী ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে গেছেন বা বাড়ি ফিরে গেছেন তাদের সেরে ওঠার অভিজ্ঞতা টেলিভিশন ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করলে ভাল কাজ হতে পারে। কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনে থাকা অবস্থায় একজন রোগীকে ঠিক কীভাবে কেয়ার করা হচ্ছে, তাও জানানো জরুরি বলে আমি মনে করি।”

দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর অপ্রতুলতা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মধ্যে সেই সুবিধা বিষয়ে নানা সীমাবদ্ধতা আছে উল্লেখ করে কেএএম মোর্শেদ বলেন, যুগ যুগ ধরে স্বাস্থ্যখাতে কী ধরণের বরাদ্দ ও কর্মপরিকল্পনা নেয়া ছিল, সেগুলো সবাই জানি। কাজেই সে বিষয়ে এখন কোনো মন্তব্য করবো না। তবে এই হঠাৎ দূর্যোগে আমরা স্থানীয় রিসোর্স নিয়ে তৈরি হতে পারি দ্রুতগতিতে। দেশে যেসব সাইক্লোন সেন্টার আছে বা কিছু কিছু এলাকায় কিছু স্কুল নয়তো কমিউনিটি সেন্টারকে অস্থায়ী করোনা হাসপাতালে রূপান্তর করে পরামর্শ কাম চিকিৎসা কেন্দ্র করা যেতে পারে। এলাকা ধরে ধরে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সেখানে বসিয়ে দিলে জনগণ আস্থা পাবে। সরকার এক্ষেত্রে উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে সাথে নিয়ে কাজ করতে পারে।

সাধারণ জরুরি ছুটির ফলে শহরের বহু মানুষ গ্রামে চলে গেছে। তাদের মধ্যে অনেকে ছোট চাকরিজীবী থেকে শুরু করে রিকশাচালক, কারখানা শ্রমিক, দিনমজুর, হোটেল/রেস্তোরাঁকর্মীসহ নানা ভাসমান পেশার মানুষ রয়েছে। প্রথম দিকে ছুটির মেয়াদ এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে থাকলেও তা বেড়ে ২৫ এপ্রিলে গিয়ে ঠেকেছে। ব্র্যাকের জরিপে (৫ এপ্রিল পর্যন্ত) তাদের দুর্দশার চিত্র উঠে এসেছে। অনেকের ঘরে খাবার নেই, আবার থাকলেও তা এক-দুইদিনের।

বাড়ছে ব্র্যাকের খাদ্যনিরাপত্তা কর্মসূচি
করণীয় সর্ম্পকে ব্র্যাক পরিচালক বলেন, জরিপের বাইরে আমাদের কর্ম অভিজ্ঞতা বলছে, করোনার কারণে দেশের প্রায় ৫০ লাখ পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যাদের দ্রুত খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি মানসিক সাপোর্টও দরকার। সরকার যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে তা যথেষ্ট না, তা আরও বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি করা প্রয়োজন। সেসঙ্গে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাও প্রয়োজন।

”আমরা (ব্র্যাক) যেমন কিছু উদ্যোগ হাতে নিয়েছি, আমরা প্রাথমিকভাবে প্রায় এক লাখ পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কাজ শুরু করেছি। ওইসব কর্ম পরিচালনার জন্য সরকারের অনুমতির পরে আমরা সাহায্যের আহবান জানানোর পরে কিছু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোগ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, সেক্ষেত্রে আমাদের সহায়তার বলয় হয়তো আরও বাড়তে পারে। এভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যেন প্রণোদনার বাইরে না থাকে
সরকারি প্রণোদনা বিষয়ে কেএএম মোর্শেদ বলেন, সরকার যে দ্রুত প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, এটি খুবই ইতিবাচক। জনগণের মধ্যে একটু হলেও মানসিক আস্থা এসেছে যে, সরকার তাদের পাশে আছে। তবে ওই প্রণোদনা শুধুমাত্র ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেবার যে ঘোষণা, সেখানে একটু সমস্যা আছে বলে আমি মনে করি। এটি বিদেশি অন্য কোনো দেশের মডেল অনুসারে হয়তো ঠিক আছে, কিন্তু দেশে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিরাট সমস্যার কারণ।

বিজ্ঞাপন

”অনেক ক্ষুদ্র ও ব্যক্তি উদ্যোক্তা এখনও যে প্রথাগত ব্যাংকিং এর বাইরে আছে, তা মোটামুটি সবারই জানা। উন্নয়নশীল দেশ হবার পরপরই সরকার সেইসব জনগোষ্ঠিকে ব্যাংকিং কার্যক্রমের মধ্যে নিয়ে আসার নানা পদক্ষেপ (এজেন্ট ব্যাংকিং, কৃষক একাউন্ট, ভাতা একাউন্ট) নিতে শুরু করলেও এখনও পুরোপুরি নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। ওইসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিরাট অবদান রয়েছে স্থানীয় ও প্রান্তিক অর্থনীতিতে, কাজেই পলিসি পরিবর্তন নয়তো সংযোজন করে তাদের পাশে অবশ্যই সরকারকে দাঁড়াতে হবে।”

আশার দিক বোরো কিন্তু মজুরি কমার আশঙ্কা
খাদ্য উৎপাদন ও স্থানীয় বাজার ব্যবস্থা বিষয়ে তিনি বলেন, এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ নাগাদ বোরো ধান কাটার সময় চলে আসছে। স্থানীয়ভাবে খাদ্যের যোগান বিষয়ে এটি একটি ইতিবাচক দিক। বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, ধানের মূল্য কম ও ধান কাটা শ্রমিকের ঘাটতি। তা হয়তো এ বছর দেখা দেবে না, তবে স্থানীয়ভাবে মানুষ বেড়ে যাবার ফলে মজুরি কমে যাবার শঙ্কা দেখা দিচ্ছি।

”আমরা জরিপের বাইরেও বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নিয়েছি। দেখা গেছে, যে শ্রমিকের মজুরি সাধারণ সময়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, তা এখন ৩০০ টাকায় নেমে এসেছে।  গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে গ্রামে ফিরে যাওয়া মানুষগুলোকে সামাজিক কার্যক্রমের মধ্যে নিয়ে আসতে আলাদা সরকারি স্কিম হতে পারে, নয়তো আগের স্কিমগুলোতে তাদের নাম লিপিবদ্ধ করা জরুরি।”

হাওর অঞ্চলে শ্রমিক সঙ্কট
তিনি বলেন:  আরেকটি বিষয় হচ্ছে, দেশের শষ্য ভান্ডার বলে পরিচিত হাওর এলাকায় ধান পাকতে শুরু করেছে, সেখানে স্থানীয় মানুষের বাইরে উত্তরের জনপদ থেকে বেশি শ্রমিক গিয়ে ধান কাটার কাজে অংশ নিতো। লকডাউনের মতো পরিস্থিতিতে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সেখানে ধান কাটা শ্রমিকের বড় ক্রাইসিস তৈরি হতে পারে।

”তাছাড়া স্থানীয়ভাবে একটু অবস্থাসম্পন্ন কৃষক, যারা কিনা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরিতে কাজ করাতেন তারাও অর্থসঙ্কটে পড়ে গেছেন। সেজন্য তারা হয়তো চালকল মালিক বা স্থানীয় মজুতদারদের খপ্পরে পড়ে কমদামে আগাম ধান বিক্রিতে বাধ্য হতে পারে। এই ক্ষেত্রে সরকারের দ্রুত এগিয়ে আসা জরুরি। না হলে মানের দিনগুলিতে ধানের কৃত্রিম সঙ্কট থেকে শুরু করে বেশি দামে ধানচালের কারণে বড় সামাজিক সমস্যা তৈরি হতে পারে।”

ঘরে খাবারের নিশ্চয়তা
খাদ্য ও সামাজিক সাহায্য বিষয়ে ব্র্যাকের এই পরিচালক বলেন, করোনা সমস্যা কিন্তু বন্যা বা অন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো না। আমরা আসলে জানি না, এটি কতোদিন স্থায়ী হবে আবার কতোদিন আমাদের খাদ্য-সামাজিক সহায়তা দিতে হবে।  এছাড়া দুস্থ মানুষদের ত্রাণ ও খাদ্য সহায়তার জন্য বাইরে বের করে আনা যাবে না।  তাদের মনে এতোটুকু বিশ্বাস তৈরি করতে হবে যে, আপনি বাসায় থাকলেও খাবার আপনার কাছে চলে আসবে। যদিও এটি বড় চ্যালেঞ্জ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জন্য।  খুব হিসেব করে আমাদের পরিকল্পনা করা উচিত।

”তাছাড়া এতোবড় জনগোষ্টির মধ্যে সুষ্ঠুভাবে ও প্রয়োজন অনুসারে প্রদানের জন্য যে জনবল ও শৃঙ্খলা প্রয়োজন, তা সরকারের একার পক্ষে খুবই কঠিন। স্থানীয়ভাবে কাজ করা উন্নয়ন সংস্থাগুলো স্বেচ্ছাভিত্তিতে এগুলো করতে পারে, সরকার ডাকলেই তারা এগিয়ে আসবে। সবাই এক হয়ে কাজ না করলে এটি খুবই কঠিন কাজ।”

করোনা একা সামাল দেয়া অসম্ভব
বৈশ্বিক দাতা সংস্থার কাছ থেকে বাংলাদেশ সাহায্য চাইতে পারে কিনা, এ বিষয়ে তিনি বলেন, অবশ্যই চাইতে পারে। করোনা একা একা সামাল দেবার মতো কোনো ঘটনা না। সারাবিশ্ব এখানে ক্ষতিগ্রস্ত, সবাইকে পাশে থেকে একে অন্যকে সাহায্য না করলে এটি থামানো সম্ভব না।

”ইতিমধ্যে সরকার খুবই একটিভ এবিষয়ে। বিভিন্ন দাতা সংস্থা বিভিন্ন ইমার্জেন্সি ফান্ড দিতে শুরু করেছে সরকারকে। আমরা যারা উন্নয়ন সংস্থা আছি, তারাও বিভিন্ন পরিকল্পনা করতে শুরু করেছি। আমি আগেই বলেছি ব্র্যাকের পদক্ষেপের কথা। তবে সবাই তা করতে পারছে না এই মূহুর্তে, কারণ অনেকে ছুটিতে চলে গেছে। তারপরেও অনেকে ধীরে ধীরে এ বিষয়ে অ্যাকটিভ হচ্ছে বলে জেনেছি।”

আশায় বাঁধি বুক
সার্বিক প্রেক্ষাপটে ব্র্যাক পরিচালক আশার আলোও দেখতে পাচ্ছেন জানিয়ে বলেন, আমরা এমন একটি জাতি যারা কিনা খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারি, যার বহু উদাহরণ আছে। তবে এবার আমাদের একটু বেশিই সচেতন হয়ে কাজ করতে হবে, তাহলেই হয়তো করোনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি সামলে উঠতে পারবো।