চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনা পরীক্ষায় অনীহা

তমালের পাঁচ দিন জ্বর-সর্দি, শুকনো কাশি, বমি বমি ভাব, মুখে অরুচি, গলাব্যথা সবই আছে। দুদিন হল তমালের বড়ভাই ও স্ত্রীর জ্বর হয়েছে। তমালের মতো তারাও সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন উপসর্গে ভুগছেন। গ্রাম্য ডাক্তার দেখিয়েছেন। ডাক্তার ওষুধের পাশাপাশি পরামর্শ দিয়েছেন করোনা পরীক্ষার। কিন্তু তারা সেটা না করে সাধারণ জ্বরের ওষুধ প্যারাসিটামল খাচ্ছেন। অরুচির জন্য খাচ্ছেন অমিডন। জ্বর কখনও কমছে আবার কখনও বাড়ছে। কিন্তু কেউই করোনার পরীক্ষার কথা চিন্তাতেই আনছেন না।

আমাদের সমাজে করোনা পজেটিভ হলে নানা রকম ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হবে তাদের। বাড়ি লকডাউন দিলে নানাজন নানা কথা বলবেন। একঘরে করে রাখা হবে তাদের। হাসপাতালে যেতে হবে। বাড়িতে লাল কাপড় বেঁধে সবাইকে বাড়িতে আসা নিষেধ করে দেবেন গ্রামের সরকারি প্রতিনিধিরা। মারা গেলেও আত্মীয়-স্বজনরা পাশে থাকবেন না কেউ। উটকো ঝামেলায় তখন প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে। তারচেয়ে পরীক্ষা না করানোই অনেক ভালো।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

তমাল জ্বর নিয়েই বাজারে যাচ্ছেন, গ্রামে ঘুরছেন, মাস্ক ছাড়াই পরিবারের অন্যদের সঙ্গে মিশছেন। সবাইকে বলছেন, বৃষ্টিতে ভেজার কারণে জ্বর হয়েছে, দুদিনেই ঠিক হয়ে যাবে। গ্রামের সবাই স্বাভাবিকভাবেই নিচ্ছেন তমালকে। এভাবেই ছড়িয়ে পড়ছে করোনা। এ ঘর থেকে ও ঘরে। মানুষ থেকে মানুষে। সাতক্ষীরা, খুলনা, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, নওগাঁ, বরিশাল, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলার গ্রামগুলোতে এখন ঘরে ঘরে জ্বর। তারা এই জ্বরকে কোনো আমলেই নিচ্ছেন না। যার কারণে দেশের বড় একটা অসচেতন জনগোষ্ঠীকে করোনা ভাইরাসের শিকার হচ্ছেন। সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়ীয়া ইউনিয়নের বেলী গ্রামের আল নজিব মাহফুজ কদিন আগে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মাহফুজের বাড়ি এখন লকডাউন করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু লকডাউন করার পর স্থানীয় মানুষজন মাহফুজদের বাড়ির প্রতি বিরূপ মনোভাব দেখাচ্ছেন। বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মানুষজন নাক টিপে ধরে চলাচল করছেন। একজন মন্তব্য করে বসলেন, ‘মাহফুজকে হয় হাসপাতালে রেখে আসুক, না হলে বাড়ি থেকে বের করে দিক!’ সোনাবাড়ীয়া ইউনিয়নের আক্কাস আলী কয়েকদিন শ্বাসকষ্টে ভুগে মারা গেছেন। কিন্তু করোনার নমুনা পরীক্ষা করেননি তিনি। তার বাড়ির আরো চার সদস্যের শরীরে করোনার নানা উপসর্গ বিদ্যমান। অথচ, তারাও কেউ নমুনা পরীক্ষা করাতে রাজি নন।

বর্তমানে গণমাধ্যমে চোখ রাখলে দেখা যাচ্ছে করোনা শনাক্তের চেয়ে উপসর্গে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি (বিপিও) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এই রোগের উপসর্গ নিয়ে ২,৯৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। উপসর্গ নিয়ে মৃতদের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ৭৪২, ঢাকা বিভাগের ৪৬৪, খুলনা বিভাগের ৬৬২, রাজশাহী বিভাগের ৫২৪, বরিশাল বিভাগের ২৫৩, সিলেট বিভাগের ১০৩, রংপুর বিভাগের ৯৫ এবং ময়মনসিংহ বিভাগের ৯৬ জন। করোনা রোগীর মতো উপসর্গ নিয়ে মারা গেলেও তারা করোনা আক্রান্ত নাও হতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

এটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ক্ষেত্রে পরীক্ষা করে ৮৫ শতাংশের করোনা পাওয়া যায়নি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে। কিন্তু যে ১৫জন করোনায় আক্রান্ত তারা অন্যের সঙ্গে মেলামেশার কারণে করোনা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আক্রান্ত হচ্ছেন সুস্থ মানুষ। এভাবেই বেড়ে চলছে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা।

বর্তমানে সাধারণ ঠাণ্ডা-জ্বরের দোহাই দিয়েই মানুষ করোনা পরক্ষীয় অনীহা প্রকাশ করছেন। গ্রামের অনেক মানুষ এখনও বিশ্বাস করেন করোনা নামের কোনো ভাইরাস নেই বাংলাদেশে, যা হচ্ছে তাহল ঠাণ্ডা-জ্বর। আবার অনেকের ধারণা, করোনা হলো যারা শহরের এসি বাড়ি, গাড়ি, অফিসে থাকেন আর্থাৎ যারা ধনী তাদের অসুখ। আবার কেউ কেউ মনে করেন আল্লাহ করোনা ভাইরাস দিয়েছেন, রক্ষা করার মালিকও তিনিই। গ্রামের মানুষের কাছে এমন নানা অজুহাত আছে লকডাউন না মানার, মাস্ক না পরার।

সরকারি বেসরকরি চ্যানেলগুলো করোনা প্রতিরোধে প্রতিনিয়ত নানাভাবে মানুষকে সচেতন করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন দৈনিক, অনলাইন নিউজ পোর্টাল। ফোন করার আগে মানুষকে সচেতন করছে মোবাইল কোম্পানি। রেডিওতে সতর্ক করার হচ্ছে বার বার। স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি, পুলিশসহ মন্দির মসজিদের পুরোহিত ও ঈমামরাও সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তাহলে আমাদের গলদটা কোথায়?

করোনার পরবর্তী ঢেউগুলো মোকাবিলা করতে আমাদের বেশি বেশি টিকার ব্যবস্থা করতে হবে। টিকা গ্রহণকারী এবং টিকা গ্রহণ নাকারী উভয়কেই মাক্স পরতে হবে। করোনা পরীক্ষা করে আক্রান্তদের দ্রুত ঘরবন্দি করতে হবে। অনেক জেলার গ্রাম পর্যায়ে করোনা শনাক্তের ব্যবস্থা অপ্রতুল, সেখানে পরীক্ষা করার জন্য কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। জেলা উপজেলা পর্যায়ে যথাসম্ভব অক্সিজেনের ঘাটতি কমাতে হবে। সরকারিভাবে ভ্রম্যমান করোনা পরীক্ষার গাড়ি বাড়ানো যেতে পারে। জন সধারণকে সামাজিক ভয়-ভীতি থেকে বের করে আনতে গণমাধ্যমের সহায়তা জোরদার করতে হবে। তৃণমূলকে বোঝাতে হবে আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই করোনা মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন