চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

একজন আরজ আলী: কুসংস্কার নয়, যুক্তি আর বিজ্ঞান-বার্তা

ছাত্রী শিক্ষককে কাহিনী শোনায়, বর্ণনা মতে সত্য কাহিনী যেখানে ডাক্তারি বিদ্যা কাজ করে না, বিজ্ঞান বড্ড অসহায়; বিপরীতে চলে আসে মোহ আর মিথ সৃষ্ট বর্ণনা। এক অজপাড়া গাঁর হুজুরের নাম ইমতিয়াজ খান। খুব ভালো লোক বলে পরিচিতি তার এলাকায়। মানুষের চিকিৎসা করেন, কিন্তু কারও কাছ থেকে টাকাপয়সা নেন না। পানি পড়া, সরবত পড়া, কলা পড়া দেন। কাজ হয়ে যায়। বৃষ্টিও নামাতে পারেন, তবে সচরাচর নামান না।

তিনি আল্লাহর নাম নিয়ে অন্যান্য অনেক কিছুর সমাধান করে দেন, কাজ হয়ে যায়; তবে বৃষ্টি নামানোর অনুরোধ এলেই রাগ-গোস্বা সামনে আসে।

বিজ্ঞাপন

এলাকাটা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। মোবাইলের নেটওয়ার্কও পাওয়া যায় না সচরাচর। ওখানে তিন মাস ধরে বৃষ্টি হচ্ছে না। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস হুজুর দোয়া করলে বৃষ্টি হবে। তারা গিয়েছিলও তার কাছে বৃষ্টির আর্জি নিয়ে, কিন্তু হুজুর দোয়া করেন না। এখন তিনি দোয়া করলে কাজ হবে না।

একটা সময়ে প্রচলিত ধারণার স্মার্ট প্রকৃতির হুজুর আর অন্য অনেকের সঙ্গে ডাক্তার শুভার অচিন্তনীয় এক আড্ডা হয়। হুজুর বলেন, আপনি শিক্ষিত মানুষ। ডাক্তার মানুষ আমার কথা বিশ্বাস করবেন না। তারপর এক সময় হুজুর তার মাথার টুপি খুলে রোদে শুকাতে দেওয়ার কথা বলে। ডাক্তার কিছুই বুঝতে পারে না; নানা দ্বান্দ্বিক চিন্তা শেষে এক সময় টুপিটা ধুয়ে রোদে শুকাতে দেন। তারপর একটা সময়ে আকাশ কালো করে মেঘ জমে, বৃষ্টিও শুরু হয়ে যায়। চলে টানা!

বিষয়টা রহস্যময়! অলৌকিক। এভাবেই এনামুল হক এনামের উপন্যাসের কাহিনীর শুরু। উপন্যাসের নাম ‘একজন আরজ আলী’। বাংলা একাডেমির একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮-এ বইটি প্রকাশ করেছে এক রঙ্গা এক ঘুড়ি।

ছাত্রীর কাছ থেকে সব শুনে রহস্য ভেদের অনুরুদ্ধ হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাজির হয়ে যান ডাক্তার আরজ আলী। ওখানে গিয়ে এলাকাবাসীর মাধ্যমে জানলেন হুজুরের অনেক ক্ষমতা, যদিও সব ক্ষমতা তিনি প্রয়োগ করেন না। বৃষ্টি নামানো নস্যি তার কাছে, চাইলে আরও বড় কিছু করে দেখাতে পারেন ইমতিয়াজ হুজুর। দেখা হয়। একসময় আরজ আলী বৃষ্টির পূর্বাভাস নিয়ে বিজ্ঞানের কথা বলেন, প্রাণ-প্রকৃতির রূপ পরিবর্তনের কথা বলেন। সরবত পড়ায় মাথা ব্যথা কমে যাওয়া নিয়েও কথা বলেন, এর বৈজ্ঞানিক কারণ বর্ণনা করেন; হুজুর ডাক্তারের ব্যাখ্যা শোনেন, তাৎক্ষণিক ওসব অস্বীকার না করলেও সরাসরি স্বীকার করেন না।

আরজ আলী ফিরে এসে চিঠি লিখেন। হুজুর উত্তর দেন না। পরে যখন উত্তর আসে তখন মৃত্যুপথযাত্রী হুজুর। জানালেন, আত্মগোপনে গিয়ে নাম-পরিচয় বদলে হুজুর হয়েছেন তিনি। গ্রাম্য সমাজের প্রচলিত মিথ আর ভয়কে পুঁজি করে স্থায়ী আসন গেড়েছিলেন ওই এলাকায়।

বিজ্ঞাপন

উপন্যাসে ডাক্তার শুভাকে সরবত পড়া খাইয়ে মাথা ব্যথা দূর করে দিয়েছিলেন হুজুর এমন এক ঘটনাও আছে। এখানে লেখক এর যুক্তি খুঁজেছেন। আরজ আলীর মুখ দিয়ে বের করে এনেছেন এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। গ্রাম্য সমাজের প্রচলিত বিশ্বাসের পানি পড়ায় কাজ হয় এর বিপরীতে বলছেন- যারা পানি পড়া দেন, তারা রোগীর সামনে দেন বা রোগী জানে সে পানি পড়া খাচ্ছে। এতে রোগী বিশ্বাসের কারণে মানসিক শক্তি বলে সাধারণ অসুখ ভালো হয়ে যায়। মেডিকেলের ভাষায় একে প্ল্যাসিবো এফেক্ট বলে। এখানে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার নিয়ে খেলা চলে, এটা খোলাসা করেন লেখক। বার্তা দিতে চান।

আমাদের সমাজের মধ্যকার নানা কুসংস্কার, বিশ্বাস যা গ্রথিত একেবারে শেকড় পর্যন্ত সেখানে ঠিক আঘাত নয়, যুক্তি ও বাস্তবতা উপস্থাপন করতে চেয়েছেন লেখক, ‘একজন আরজ আলী’ উপন্যাসের মাধ্যমে। তাই টুপি খোলার সময়ে চুলের স্পর্শে বাতাসের আর্দ্রতা নিয়ে কথা বলেন তিনি। দেখাতে চান পাখিদের ওড়াওড়ি সহ ইত্যাকার ঘটনাগুলো। চুলের কেরোটিন প্রোটিন বাতাসের আর্দ্রতায় থাকা হাইড্রোজেনের সাথে যে বন্ধন সৃষ্টি করে অভিজ্ঞদের মাধ্যমে সে নিরূপণ সম্ভব সেটাও জানান লেখক তার নাম চরিত্রের মাধ্যমে। এটা প্রাচীন এক পদ্ধতি এও বলতে ভুলেন না তিনি।

আরজ আলীকে কেন্দ্র করে ঘটনা, এক্ষেত্রেও ব্যত্যয় হয় নি। উপন্যাসে লেখক আরজ আলীকে মূল চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করে হুজুরকে রেখেছেন রহস্যময় আঙ্গিকে। যে রহস্য ভেদই ছিল উপন্যাসের উপজীব্য। এটা করেছেন তিনি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে, যুক্তি উপস্থাপনে।

বইয়ের লেখক এনামুল হক এনাম নিজে চিকিৎসা বিজ্ঞানের একজন শিক্ষক। চরিত্রের গভীরে পৌঁছাতে নাম চরিত্রকেও নিজের সঙ্গে বেঁধেছেন তিনি। ফলে উপন্যাসের মূল চরিত্র আরজ আলী ও অন্য শুভাকে ডাক্তার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। ধারণা করি এ উপন্যাসের মাধ্যমে লেখকের চাওয়া ছিল সমাজের মধ্যকার প্রচলিত কিছু মিথ আর কুসংস্কারের বাইরেও যে আলাদা ও শাশ্বত জগত রয়েছে তার সন্ধান দেওয়া। এখানে সহজ হয়েছে তার পেশাগত জীবনের সঙ্গে নাম চরিত্র ও পার্শ্বচরিত্রের চিন্তারেখার সম্মিলনের মাধ্যমে।

লেখক এনামুল হক এনাম দ্বান্দ্বিক বিশ্বাসধারী মানুষের মধ্যে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি প্রদর্শনের পথে যান নি। খুব সহজে এবং বলা যায় নির্বিঘ্নে একটা সিদ্ধান্তে চলে এসেছেন। তবে প্রাথমিক যুক্তি শেষে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় যুক্তি অথবা আরও অনেক যুক্তি উপস্থাপিত হলে পাঠকের চিন্তার দ্বার আরও প্রসারিত হতো, আরও বেশি আগ্রহী হত।

হুজুরের আবির্ভাবের শুরুতে মনে হয়েছিল সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালুর মজিদ; কিন্তু মজিদের চরিত্রের সঙ্গে ইমতিয়াজের চরিত্রের বিস্তর ফারাক। কেবল মিলের জায়গায় আগন্তুক হয়ে জেঁকে বসা। লালসালুর মজিদ যেখানে স্বার্থ খুঁজেছে, সেখানে ইমতিয়াজ খুঁজেছে আশ্রয়; জীবন থেকে পালিয়ে গিয়ে বেঁচে থাকার আশ্রয়। আচমকা রাগে তড়িতাহত হয়ে স্ত্রীকে খুন করে ফেলেন তিনি। দণ্ড হয় তার। তার আগেই পালিয়ে যান। আর সবশেষে সকল সত্যকে আলোর মুখ দেখান চিঠির মাধ্যমে। অলৌকিকতা নয়, বিজ্ঞানের যুক্তিকে স্বীকার করেন নির্দ্বিধায়।

‘একজন আরজ আলী’ এনামুল হক এনামের পঞ্চম বই। এবারের বইমেলা সহ এর আগে তার একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। ‘দেবী ও অন্যান্য’, ‘তিন কণ্ঠ’, ‘সাক্ষী’, ‘চন্দ্রাহত’ তার প্রকাশিত গ্রন্থ। ‘একজন আরজ আলী’ বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন নবী হোসেন। সাড়ে তিন ফর্মার এই উপন্যাসটি পাঠকদের আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি বিজ্ঞান বিষয়ক চিন্তার খোরাক জোগাবে।