চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘এই হত্যাকাণ্ডে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চরিত্র হননের চেষ্টা হয়েছে’

হলি আর্টিজান রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে নারকীয় ঘটনার রায় দিতে গিয়ে আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, কলঙ্কজনক এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চরিত্র হননের চেষ্টা করা হয়েছে। ওই হামলার মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদের উন্মত্ততা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার জঘন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

প্রায় তিন বছর আগের সেই ঘটনায় করা মামলায় বুধবার ৭ জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান।

বিজ্ঞাপন

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে আছেন; জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, আব্দুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন।

অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এ মামলার আরেক আসামি মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে খালাস দেন আদালত।

বাংলাদেশের ইতিহাসের নজিরবিহীন এ ঘটনার রায় দিতে গিয়ে আদালত আরো বলেন: ‘বাংলাদেশে তথাকথিত জিহাদ কায়েমের লক্ষ্যে এবং জননিরাপত্তা বিপন্ন করার ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস’র দৃষ্টি আকর্ষণ করতে জেএমবির একাংশ নিয়ে গঠিত নব্য জেএমবির সদস্যরা হলি আর্টিজান বেকারিতে নারকীয় ও দানবীয় হত্যাকাণ্ড ঘটায়।’

‘‘ওই হামলার মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদের উন্মত্ততা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার জঘন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। নিরপরাধ দেশি-বিদেশি মানুষেরা যখন হলি আর্টিজান বেকারিতে রাতের খাবার খেতে যায়; তখনই আকস্মিকভাবে তাদের উপর নেমে আসে জঙ্গিবাদের ভয়াল রূপ। জঙ্গি সন্ত্রাসীরা শিশুদের সামনে এ হত্যাকাণ্ড চালায়। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য নিথর দেহগুলোকেও তারা ধারাল অস্ত্র দিয়ে কোপায়। মূহুর্তের মধ্যে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় হলি আর্টিজান।’’

এ হত্যাকাণ্ডের ফলে শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য পরিচিত বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়েছে মন্তব্য করে আদালত বলেন, ‘তাই সাজা প্রদানের ক্ষেত্রে আসামিরা কোনো ধরনের অনুকম্পা বা সহানুভূতি পেতে পারে না। এক্ষেত্রে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা প্রদানই ন্যায় বিচার নিশ্চিত করবে, আর এতে ভাগ্যাহত মানুষের স্বজনরা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।’

এ রায় ঘোষণা শেষে ১২টা ২০ মিনিটে এজলাস ত্যাগ করেন বিচারক। এরপর আদালত কক্ষ থেকে নামিয়ে প্রিজন ভ্যানে করে দণ্ডপ্রাপ্তদের কারাগারে নেওয়া হয়।

এদিন রায় ঘোষণার সময় আদালতে ছিলেন ঢাকা মহানগর পিপি আব্দুল্লাহ আবু। এ মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. গোলাম ছারোয়ার খান জাকির। আর আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী দেলোয়ার হোসেন। এছাড়া আদালত কক্ষে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরা উপস্থিতি ছিলেন।

কঠোর নিরাপত্তা
আলোচিত এ রায়ের আগে পুরান ঢাকার আদালত এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রায়কে কেন্দ্র করে পুরো রাজধানীকে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়।

প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে র‍্যাব-পুলিশের ব্যাপক সংখ্যক সদস্য সতর্ক অবস্থান নেয়। তাদের পাশাপাশি ঘটনাস্থলে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও কাজ করে। সকালে বহিরাগতদের আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দেয়া হয়। আদালতের প্রবেশপথে প্রত্যেককে তল্লাশির পর ভেতরে ঢোকানো হয়।

সেদিন যা ঘটেছিল
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত ৯টার দিকে রাজধানীর গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর সড়কের পাশে অবস্থিত হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিরা হামলা চালায়। তারা অস্ত্রের মুখে দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে। পরে রাতেই ওখানে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের দুই কর্মকর্তা রবিউল করিম ও সালাউদ্দিন খান নিহত হন। এছাড়াও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ৩১ সদস্য ও র‌্যাব-১ এর তৎকালীন পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদসহ ৪১ জন আহত হন।

পরদিন ২ জুলাই ভোরে সেনা কমান্ডোদের পরিচালিত ‘থান্ডারবোল্ট’ নামের অভিযানে পাঁচ জঙ্গিসহ ছয়জন নিহত হয়। এরপর পুলিশ সেখান থেকে ১৮ বিদেশিসহ ২০ জনের লাশ উদ্ধার করে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও একজন রেস্তোরাঁকর্মী। আর কমান্ডো অভিযানের আগে ও পরে ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

মামলা
দেশের মানুষকে হতবাক করে দেয়া নজিরহীন সেই হামলার তিন দিন পর গুলশান থানার এসআই রিপন কুমার দাস সন্ত্রাস দমন আইনে গুলশান থানায় মামলা করেন। এরপর ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবির দুই বছর তদন্ত করে ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই আদালতে এ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

বিচারকাজ
সেই হামলায় জড়িত মোট ২১ জনকে চিহ্নিত করা হলেও জীবিত ৮ জনকে এই মামলায় আসামি করা হয়। এদের মধ্যে শরিফুল ও মামুনুর বাদে অন্য ৬ আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বহুল আলোচিত এ মামলার বিচার শুরু হয়।

এরপর আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ২১১ জন সাক্ষীর মধ্যে ১১৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থনে আসামিদের বক্তব্য উপস্থাপন এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার জন্য ২৭ নভেম্বর দিন ধার্য করা হয়। সে অনুযায়ী আজ রায় ঘোষণা করেন আদালত।