চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আড়িয়ল বিলের পরে ‘নো ভ্যাট’

২০১১ সালের জানুয়ারি মাস, বিক্ষোভে উত্তাল মুন্সিগঞ্জ জেলাধীন ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের আশেপাশে এলাকা। আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের সরকার পরিকল্পনার প্রতিবাদে শতশত মানুষ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে।

২০০৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারের একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিলো, নতুন আরেকটি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর নির্মাণ যার নাম হবে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। ক্ষমতায় আসার পর ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রথমে এ বিমান বন্দরের জন্য প্রাথমিকভাবে স্থান নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু পরে সেখান থেকে সরে এসে ঢাকার কাছে মুন্সিগঞ্জের আড়িয়ল বিলে বিমান বন্দর নির্মাণ করার জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়।

বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি ওই এলাকার জনগণ। বাপ-দাদার ভিটে হারানোর শঙ্কা থেকে শুরু করে, আড়িয়ল বিল এলাকার জীববৈচিত্র রক্ষায় সোচ্চার হয় তারা। পরিবেশবাদী থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের সবাই বিষয়টি বিবেচনার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকেন।

প্রায় পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রস্তাবিত এ বিমান বন্দরের জন্য আড়িয়ল বিলে পঁচিশ হাজার একর জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরুর প্রস্তুতি নিতে থাকে সরকার। সেই সাথে চলে আন্দোলন। জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে জনতা-পুলিশের সংঘর্ষে নিহত হন পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শক। বলপ্রয়োগ করে আন্দোলন দমনের চেষ্টা স্থানীয় জনগণকে উত্তেজিত করে তোলে। গাছ কেটে মহাসড়ক বন্ধ করে দেয় তারা।

বিষয়টির গুরুত্ব এবং ভবিষ্যত সহিংসতার কথা ভেবে জরুরি বৈঠকে আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর করার সিদ্ধান্ত থেকে দ্রুত সরে আসে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি হস্তক্ষেপে বিষয়টির সুরাহা হয়। সরকারের ‘দ্রুত সিদ্ধান্ত’কে সাধুবাদ জানায় সব মহল।

আড়িয়ল বিলের ন্যায় ‘দ্রুত সিদ্ধান্ত’ নিয়ে  আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো সরকার। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের থেকে সাড়ে সাত শতাংশ হারে ভ্যাট আদায়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ঘোষণা এসেছে। ঘুরে ফিরে সেই প্রধানমন্ত্রীকেই হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে অর্থমন্ত্রীকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিলে সেপ্টেম্বর (২০১৫) মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থেমে যায়। 

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে সাড়ে সাত শতাংশ হারে ভ্যাট বাবদ সরকারের কোষাগারে আসলে কত অর্থ ‌আসবে, তার কোন পরিস্কার হিসেব না থাকলেও ভ্যাটের বোঝা চাপে শিক্ষার্থীদের ওপরে।  অর্থমন্ত্রীর চলতি বছরের বাজেট বক্তৃতার পর থেকেই বিষয়টি ঘোলাটে হতে থাকে। প্রথমে দশ শতাংশ ভ্যাট ধরা হবে বলা হলেও সাড়ে সাত শতাংশ হারে ভ্যাটের নিয়ম রেখে বাজেট পাশ হয়। শুরু হয় ‘নো ভ্যাট’ আন্দোলন। এনবিআরের এসআরও এবং অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পরে আন্দোলন আরো জোরদার হয়।

প্রায় সাড়ে তিন লাখ শিক্ষার্থীর টিউশন ফি-কে ভিত্তি করে এই খাত থেকে সরকার হয়তো বছরে আড়াইশো থেকে তিনশো কোটি টাকা ভ্যাট বাবদ পাওয়ার আশা করছিলো। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এবং দেশের অন্যান্য খাত থেকে আদায় করা ভ্যাট/ট্যাক্সের অনুপাতে ওই আড়াইশো হতে তিনশো কোটি টাকা কতটুকু, তা সংশ্লিষ্টরা ভালো বলতে পারবেন। 

সাধারণ নাগরিক বিচারে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া আর ফলাফল বিচার করতে কষ্ট হয়নি ক্রমবর্ধমান নিম্ন-উচ্চ মধ্যবিত্তদের। যাদের সন্তানরাই আসলে ওইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে থাকে। ওই সব শিক্ষার্থীর ভ্যাট বিরোধী আন্দোলনে গত কয়েকদিনে কী পরিমাণ ভোগান্তি আর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিলো রাজধানীসহ সারাদেশে, তার অর্থমূল্য নিশ্চয় কেউ পরিমাপ করতে পারবে না।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সংখ্যা সীমিত আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়মুখি হয়েছে শিক্ষার্থীরা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একেবারে ‘দুধে ধোয়া তুলসি পাতা’ না হলেও উচ্চ শিক্ষাখাতে অবদান রেখে চলেছে।

ভ্যাট/ট্যাক্স ছাড়া কীভাবে সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে? এমন প্রশ্ন আর শত-শত যুক্তি নিয়ে এনবিআর-অর্থ মন্ত্রণালয়কে বিভিন্ন খাত আবিস্কার করতে দেখা যায়। ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষার উপরে ভ্যাট বসার পরে তাদের নজর পরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ প্রচলিত বিভিন্ন খাত থেকে সরকার ভ্যাট হিসেবে তার ন্যায্য পাওনা আদায়ে ব্যর্থ হচ্ছে। শুধুমাত্র গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলোর কাছেই সরকারের পাওনা পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এছাড়াও সিমকার্ড বিক্রি থেকে টেলিকম কোম্পানি, বিটিসিএলের বিভিন্ন খাত, বিমা খাত, ওষুধ শিল্পসহ নানাখাতে সবমিলিয়ে বকেয়া কম-বেশি প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা (ওই ২২ হাজার কোটিসহ)।

ভ্যাট-ট্যাক্স বকেয়া নিয়মিত হারে সংগ্রহ করার সাথে সাথে, সরকারি বিভিন্ন খাতের অনিয়ম ও সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সরকারকে হয়তো প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে জনগণের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে না। চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে না জনগণকে উত্তেজিত করে তাদের রাজস্ব আদায় ও উন্নয়ন পরিকল্পনা। 

দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সরকার নাগরিক বিভিন্ন ইস্যুতে একবার যে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, বিনা রক্তপাতে অথবা চূড়ান্ত ভোগান্তি-ক্ষতি না হলে তা থেকে সাধারণতঃ সরে আসে না। তবে আড়িয়ল বিলের পরে ‘নো ভ্যাট’ আন্দোলনে ‘দ্রুত সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার পরিচালনার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে কোনো কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে সরকার যে ধৈর্য্য ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে তা প্রশংসার দাবিদার।

ছাত্র-জনতার পালস বোঝার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View