চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘আমি চাচ্ছি এমন রাজার গল্প লিখতে, যে আমাদের ঘরের মানুষ’

টুকুনের খুব মন খারাপ। তার জন্মদিনে এবার কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছে না। টুকুন মন খারাপ করে ঘরে বসে আছে। টুকুনের একটা কাক বন্ধু আছে। কাকটা টুকুনের সঙ্গে কথা বলে। বিষয়টা অবশ্য কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। মন খারাপের সেই মুহূর্তে টুকুনের সঙ্গে দেখা করতে আসলো কাক বন্ধুটি। টুকুনের সঙ্গে গল্প করল এবং যাওয়ার সময় টুকুনকে একটা উপহার দিয়ে গেল। উপহারটা ছিল একটা ‘ঝ্যাং-এর বাচ্চা।

‘ঝ্যাং’ আবার কী? ‘ঝ্যাং’ হলো একটি বিশেষ প্রাণী যেটা কাগজ খায়। তাকে কেউ দেখতে না পারলেও অনুভব করতে পারে। টুকুনের মন খারাপ দেখে বাবা রশিদ সাহেব একটা কেক নিয়ে আসেন। মোমবাতি জ্বালিয়ে টুকুন কে মনে মনে কিছু একটা চাইতে বলেন বাবা। টুকুন চোখ বন্ধ করে চাইতে থাকে, সে যেন ঝ্যাং কে দেখতে পায়। মোমগুলো নিভিয়ে চোখ খুলতেই টুকুন দেখে একটা চেয়ারে ঝ্যাং-এর বাচ্চা বসে আছে পা ঝুলিয়ে। এরপর গল্প চলতে থাকে ঝ্যাং এর বাচ্চাকে নিয়ে। সবাই ঝ্যাং-এর বাচ্চার অস্তিত্বকে মিথ্যা প্রমাণ করতে চাইলেও টুকুনের বিশ্বাস, সবার মনে দ্বিধা তৈরি করে। কাল্পনিক ‘ঝ্যাং’ চরিত্র নিয়ে তৈরি এই গল্পটা ‘একী কাণ্ড’ বইয়ের।

বাংলা কথা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক ও প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ খুব ভালোবাসতেন শিশুদের। তাই শিশুদের নিয়ে তিনি লিখেছেন একাধিক বই। একী কাণ্ড, তোমাদের জন্য রূপকথা, নীল হাতি, পিপলি বেগম, টগর এন্ড জেরি, প্রিয় ভয়ংকর, তিনি ও সে, পরীর মেয়ে মেঘবতী, কাক ও কাঠগোলাপ, কানি ডাইনি, জন্মদিনের উপহার, এই ছেলেটা, বোতল ভূত, সূর্যের দিন, ছোটদের সেরা গল্প, পুতুল, ছোটদের জন্য এক ব্যাগ হুমায়ূন ইত্যাদি বইগুলো শিশুদের খুবই প্রিয়।

বিজ্ঞাপন

হুমায়ূন আহমেদ ভালোবাসতেন শিশুদেরকে কল্পনার জগতে বিচরণ করাতে। কল্পনায় ঢুকে গিয়ে শিশুতোষ মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন তিনি। তার লেখা কাল্পনিক চরিত্রগুলো কথা বলতো শিশুদের সঙ্গে। তাদের একাকীত্ব দূর করতো, বন্ধুত্ব করতো, খেলত। বিড়াল কিংবা পিপড়ার কথা অনায়াসেই বুঝতে পারত তার শিশু চরিত্রগুলো। মধ্যবিত্ত পরিবার এবং অতি পরিচিত পরিবেশের সঙ্গে মেলানো এসব কাল্পনিক চরিত্রগুলো শিশু পাঠকদের মনে স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করেছে এবং তারাও কল্পনার রাজ্যে ঘুরে বেড়িয়েছে কাল্পনিক এসব চরিত্রের সঙ্গে।

শিশুদের জন্য রূপকথাও লিখেছেন হুমায়ুন আহমেদ। কেন রূপকথা লিখেছেন তার পেছনের কাহিনীও লিখেছেন ‘তোমাদের জন্য রূপকথা’ বইটির ভূমিকায়। গল্প লেখার গল্প শিরোনামের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন হঠাৎ রূপকথা কেন লিখতে ইচ্ছে হলো সেই কথা। তিনি লিখেছেন, একদিন দুপুরে বাসায় ফিরে তিনি দেখেন বড় মেয়ে নোভা নিখোঁজ। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক খোজার পরে নোভাকে পাওয়া গেলো চৌকির নিচে। গভীর মনোযোগ দিয়ে বাবার লেখা বড়দের ভুত-প্রেত বিষয়ক বই পড়ছিল সে। নোভাকে মা বকা দিয়ে বলল ‘কী সব বাজে বই পড়ছ?’ নোভা তখন ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল ‘বাবা এসব বাজে বই না লিখলেই পারে। আমাদের জন্য লিখলেই পারে।’ তখনই হুমায়ূন ঠিক করলেন তিনি বাচ্চাদের জন্য রূপকথার বই লিখবেন।

ছোটদের জন্য কাল্পনিক চরিত্র এবং রূপকথা লিখতে গিয়ে সমস্যাতেও পরতে হয়েছে হুমায়ূন আহমেদকে। ‘তোমাদের জন্য রূপকথা’ বইয়ের ভূমিকায় সেই কথাও লিখেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, ‘লিখতে গিয়ে দেখি কঠিন সমস্যা। রূপকথার গল্প মথায় আসছে না। রাজা-রানি দিয়ে ঠিকই শুরু করি, কিন্তু এগুতে পারিনা। রাজা, রানী এবং রাজকন্যারা কেমন যেন দূরের মানুষ হয়ে থাকে। অথচ আমি চাচ্ছি এমন রাজার গল্প লিখতে, যে আমাদের ঘরের মানুষ। লিখতে না পারার কষ্ট যারা লেখালেখি করেন না তারা কখনো জানবেন না। আমার কিচ্ছু ভালো লাগে না। সারাক্ষণ রূপকথার গল্প নিয়ে ভাবী। লিখতে বসি, কয়েক লাইন লিখে পাতাটা ছিঁড়ে কুটি-কুটি করে ফেলি। আবার লিখি। আবার ছিঁড়ে ফেলি।’

কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন শিশু, তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষের খুব প্রিয়। তার নিজস্ব স্টাইল, খুব সাধারণ ভাষা ও সংলাপ এবং অতিসাধারণ মানুষের গল্পই অসাধারণ হয়ে ধরা দেয় পাঠকের মনে। বাংলা সাহিত্য যতদিন থাকবে, ততদিন কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ অমর হয়ে থাকবেন তার লেখা চরিত্রগুলোর মাঝে।

বিজ্ঞাপন