চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমরা দুঃখিত অজয় রায়

একুশে পদক পাওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক অজয় রায় মারা গেছেন। তিনি প্রগতিশীল আন্দোলনের সামনের কাতারে থাকা ব্যক্তিত্ব ছিলেন, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম সদস্য ছিলেন, তিনি দেশের বিজ্ঞান আন্দোলনের অগ্রসেনানী ছিলেন। তিনি আরও অনেক কিছু ছিলেন। স্রেফ একটা নাম নিয়ে তিনি জন্ম নিলেও এই নামের ভার বাড়িয়েছেন আমৃত্যু। তাই তার মৃত্যুতে কোন অভিধায় তাকে সম্বোধন করা যায় এনিয়েও নানা চিন্তা আসতে পারে।

অধ্যাপক অজয় রায় তার চুরাশি বছরের দীর্ঘ জীবনে অনেক কিছু অর্জন করেছেন। তার অর্জনগুলো তাকে বাঁচিয়ে রাখবে নানা আলোচনায়, ইতিহাসে। তার অর্জনের অন্যতম স্মরণীয় ক্ষণ একাত্তর, যেখানে তিনি এক বীর মুক্তিযোদ্ধা। অসীম সাহসে দেশ স্বাধীনের নিমিত্তে নিজের যৌবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। পেড়ে এনেছিলেন স্বাধীনতার সূর্য, আকাশে ভাসিয়েছিলেন বিজয়ের পতাকা। কুমিল্লার সোনামুড়া সীমান্তে প্রশিক্ষণ শেষে একাধিক অপারেশনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন তিনি; এরপর মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা সেলের অন্যতম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ কালে তিনি বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শিক্ষকদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে উব্ধুব্ধ করেন। এরআগে তিনি সতেরর তরুণ হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে। ছিলেন বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনে; এরপর দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের নানা পথ পরিক্রমায় উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানেও।

তিনি ছিলেন শিক্ষক। অধ্যাপনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পঞ্চাশের দশকের শেষাংশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা কাল শুরুর পর থেকে এই শতাব্দীর শুরুর বছর পর্যন্ত ছিলেন ঢাবিতে। এই সময়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলনে অংশ নেন, সংগঠক হিসেবে, কর্মী হিসেবে। মৃত্যুর পর বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, ১৯৩৬ সালে দিনাজপুরে জন্ম তার। শিক্ষকতা জীবনের শুরু কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০০ সালে অবসরের পরও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। পদার্থবিজ্ঞানের এই অধ্যাপক বাংলাদেশে তার গবেষণা ও কর্মক্ষেত্র পদার্থবিজ্ঞানে একুশে পদক পেয়েছিলেন, তিনি নোবেল পুরস্কার না পেলেও তার দুটি গবেষণা নোবেল কমিটিতেও আলোচিত হয় বলে জানা যাচ্ছে।

জানা যাচ্ছে, ইউনেসকোর উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিস্টালোগ্রাফি সেন্টার স্থাপনে ভূমিকা পালন করেন তিনি। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ছিলেন সম্প্রীতি মঞ্চের সভাপতি, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট, ছিলেন বাংলা ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন মুক্তান্বেষার প্রধান সম্পাদক। এছাড়াই তিনি মুক্তমনা ব্লগের অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন। চুরাশি বছরের জীবনে দেশকে এতকিছু দিয়েছিলেন তিনি। স্বীয় ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সফল এক ব্যক্তিত্ব। এক জীবনে কাউকে দেশকে এরবেশি আর কিছু দেওয়া সম্ভব কি না এনিয়ে আলোচনা করা যায়। তবে তিনি যে তার সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে গেছেন এ নিয়ে সন্দেহ নাই।

বলা যায় সফল এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। শিক্ষক, যোদ্ধা, প্রগতিশীল আন্দোলনের সংগঠক, কর্মী, মানবিক ব্যক্তিত্ব সব অভিধা তার সঙ্গেই যায়। অজয় রায়ের সফল সে জীবনের সমাপ্তি সুখের হয়নি। গত পাঁচ বছরের কাছাকাছি সময় পুত্র হারানোর শোক, হাহাকার, বেদনা, বিচারপ্রাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তায় কেটেছে ক্ষণ। সংগ্রামী এই মানুষ তার হতাশার কথা গণমাধ্যমে বলেছেনও। বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতা নিয়েও কেবল তার ক্ষোভ ছিল না, ক্ষোভ ও সন্দেহ ছিল সরকার বিচার চায় কি না এনিয়েও।

এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে অজয় রায় তার পুত্র অভিজিৎ রায়ের বিচার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “অভিজিৎ হত্যা হয়েছে ২০১৫ সালে। দীর্ঘ চার বছর পর চার্জশিট দেওয়া হলো। এখানে মন্তব্য করার কিছু নেই। এরা (সরকার) আসলেই বিচার করতে চায় কি না, নাকি লোকদেখানো করছে এটা আমার জন্য একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন। কারণ বিচার কাজ, হত্যার তদন্ত উদঘাটন করতেই যদি চার বছর লাগে তাহলে বিচার কাজ সারতে কত বছর লাগবে? এ মামলার বিচার আমি জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারব বলে মনে হয় না।”

শেষ পর্যন্ত তার কথাই সত্য হলো। পুত্র অভিজিৎ হত্যার বিচার দেখে যেতে পারলেন না তিনি। তবে তিনি তার কাজটা অন্তত করেছেন- প্রথমে অনাগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত বিচারিক আদালতে সাক্ষ্য দিতে গেছেন। এরআগে গত ১ আগস্ট সাড়ে চার বছর পর দেশে-বিদেশে আলোচিত এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়, এবং গত ২৮ অক্টোবর অজয় রায় অসুস্থ অবস্থায় থেকেও আদালতে উপস্থিত হয়ে তার সাক্ষ্য প্রদান করেন। সেদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে আমরা দেখেছিলাম অসুস্থ অজয় রায়কে কোলে করে কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিয়ে যাচ্ছেন। বাবা অজয় রায় অসুস্থ হয়েও আদালতে এসেছিলেন পুত্র অভিজিৎ রায়ের বিচারের আশায়। দ্বিধাদ্বন্দ্ব, অনিশ্চয়তায় থাকা একজন অজয় রায় তবু শেষবারের মত আস্থা রেখেছিলেন দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর। সামান্য হলেও একটা আশা ছিল তার বিচারের। এই বিচার শুরু হয়েছে; জানি না কী এর ভবিষ্যৎ। তবে আমাদের চাওয়াটা জীবদ্দশায় যে বিচার তিনি পাননি অন্তত তার দৈহিক মৃত্যুর পর হলেও যেন এই বিচার কাজটা সম্পন্ন হয়।

বিজ্ঞাপন

ড. অজয় রায়ের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকপ্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় বিদেহী আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি তারা অজয় রায়ের অবদানের কথা স্মরণ করেছেন। এই শোক আর স্মরণ এখন পর্যন্ত কাগুজে বার্তাই যখন তিনি পুত্র হত্যার বেদনা আর বিচার নিয়ে সন্দেহের মধ্যে ছিলেন।

অজয় রায় কেবল জীবদ্দশায় দেশ ও জাতির জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করেই নিজের দায়িত্ব পালনের কাজ শেষ করেননি, মরণের পরেও তার দেহ যেন দেশের চিকিৎসা গবেষণার কাজে লাগে সে ব্যবস্থাই করে গেছেন। মরণোত্তর দেহ দান করেছেন তিনি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণার্থে তার দেহ পাবে ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ। মরণোত্তর দেহ দানের এই কাজ তিনি একা করে যাননি; তার স্ত্রী-পুত্রও একই কাজ করেছেন। অজয় রায়ের স্ত্রী শেফালি রায় এবছরের ৩ জানুয়ারি মারা যাওয়ার পর তার মরদেহ রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে দান করা হয়েছিল। ২০১৫ সালে অজয়-শেফালি দম্পতির সন্তান ব্লগার, বিজ্ঞানী অভিজিৎ রায়ের মরদেহ চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দান করা হয়েছিল।

অজয় রায় তার জীবনের সবটাই ব্যবহার করেছেন দেশ ও দশের জন্যে। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের চাপাতির কোপে প্রাণ হারানো ব্লগার ও বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়কে দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে গিয়ে আমি প্রথম দেখেছিলাম অজয় রায়কে। ভেতরে ক্ষতবিক্ষত দেহ অভিজিতের, বাইরে একটা চেয়ারে অসহায় পিতা অজয় রায়। তার মুখের দিকে সেদিন বেশিক্ষণ তাকাতে পারিনি। কেন পারিনি সেটা ওই সময় সঠিক ভাবে বিশ্লেষণ করতে পারিনি, তবে এখন বুঝতে পারছি আসলে ওই সময়ে অসহায় ছিলাম বলে তার চোখে চোখ রাখতে পারিনি, চেহারায় তাকাতে পারিনি লজ্জায়, ব্যর্থতায়। সেই সে ব্যর্থতার কাল শেষ হয়ে যায়নি। চলছে এখনও।

অজয় রায় অভিজিৎ রায়ের হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি। পিতৃহৃদয়ের যে হাহাকার বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন তিনি গত পৌনে পাঁচ বছর সেই হাহাকার দীর্ঘায়ত হয়েছে। অজয় রায় পুত্র অভিজিৎ রায়ের মত হত্যাকাণ্ডের শিকার হননি ঠিক, কিন্তু দিনের পর দিন, মাসের পর মাস শেষে বছরের পর বছর যে কষ্ট নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন সেই কষ্ট লাঘবে আমরা কিছু করতে পারিনি, রাষ্ট্র কিছু করেনি। এটা কি হত্যার চেয়ে কম কিছু?

অজয় রায় এখন যেখানে সেখানে এখন আর সুযোগ নেই তার সামনে এক মিনিটের জন্যে হলেও দাঁড়ানোর। যদি কখনও সত্যি সত্যি অভিজিৎ রায় হত্যার বিচার হয়েই যায় তখনও আর বলার সুযোগ থাকবে না দেরিতে হলেও বিচার হয়েছে পিতা।

অজয় রায় দেশকে এতকিছু দিয়েও ফিরে গেছেন হতাশা আর কষ্ট নিয়ে। এই কষ্ট আর হতাশার জন্যে আমরা দুঃখিত। জানি না রাষ্ট্র দুঃখপ্রকাশ করবে কি না, তবে রাষ্ট্রের এই ভূমিকায় আমরা ক্ষুব্ধ, হতাশ আর দুঃখিত। আমাদের দুঃখটা গ্রহণ করুন অজয় রায়!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

শেয়ার করুন: