শীত বাঙালি মধ্যবিত্তের প্রিয় ঋতু। অনেকের কাছে সবচেয়ে রূপসী ঋতু। এর মতো এমন স্মৃতিকাতরতা আর কোনো ঋতুর নেই। স্বচ্ছ সুন্দর নীল আকাশ, ঠান্ডা ঝিরঝিরে হাওয়া, সোনাঝরা মিষ্টি রোদ নিয়ে শীত আমাদের জীবনকে রমণীয় করে।
আমাদের শীত নামে নগরে, শহরে, ছোট-বড় বন্দরে-বাজারে-গঞ্জে; কিন্তু সবুজ গ্রামবাংলার প্রকৃতিজুড়ে যে শীত নামে, তার চেয়ে রূপসী আর কেউ নয়। রবীন্দ্রনাথ পৌষের গানে লিখেছেন: রোদের সোনা ছড়িয়ে পড়ে মাটির আঁচলে। এ-ও যেন তেমনি ‘সোনা-ছড়ানো’। এ সময় জীবন ভরে ওঠে নিরুদ্বেগ প্রসন্নতায়, শস্যের অপর্যাপ্ত সম্ভারে, শীর্ণতোয়া নদীরা চিকচিক করতে থাকে স্বচ্ছ রূপালি ধারায় ধারায়, ওড়াউড়ি করে, বিস্তীর্ণ জলাভূমির ধারে অতিথি পাখিরা দীর্ঘদিনের জন্য ঘর বাঁধে। শীতের সকালে কুয়াশায় ঢাকা পথঘাট৷ কুয়াশার চাদরে মুড়ি দেয়া ঘুমিয়ে থাকা একেকটি দিঘি৷ ঘুম-জলের ভেতর থেকে কামনার মতো বেরিয়ে আসে লাল পদ্মের দল৷
লর্ড মেকলে লিখেছিলেন, বাংলার শীত ইংল্যান্ডের বসন্তের মতো !কথাটা হয়তো মিথ্যা নয়। এটা হয়তো কোটি কোটি শীতপ্রেমিক বাঙালিরও মনের কথা।
শীতের শিশিরের সৌন্দর্যও প্রশ্নাতীত। যদি তা লেগে থাকে গাছের পাতায়, দূর্বার ডগায়, গোলাপের পাপড়ি, পাথর কিংবা ঘরের কার্নিশে। এ এক ভিন্ন জাতের অনির্বচনীয় সৌন্দর্য। শিশির সিক্ত ভোরের শেফালী তো বটেই, টিনের চালায় শীতার্ত রাতে শিশিরের টুপটাপ শব্দ শোনার মতো শ্রোতাও আছেন। সেই শিশির পড়ার শব্দ শুনতে পেতেন কবি জীবনানন্দ দাস।
শীত মানে শীতের পিঠা। সাদা চালের গুঁড়ার নিপুণ শিল্পকর্ম। সুগন্ধী আতপ চাল ঢেঁকিতে কুটলে রঙ হয়ে যায় ফটফটে সাদা৷ খুব মেহনতের কাজ। একান্নবর্তী ঢাউস পরিবারে শিলে বেঁটে বিশেষ সুবিধে হত না৷ তাছাড়া ঢেঁকিতে একবার আটা করে নিলে বেশ কিছুদিন থাকে। শুধু রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। তারপর দরকার মতো কোনও পিঠার জন্যে গরম জলে, কোনও পিঠার জন্যে ঠান্ডা জলে গুলে বা মেখে নিলেই হল৷ কত রকমের পিঠে, তৈরির কত যে পদ্ধতি, কত রকমের আকার, কত পরিশ্রম, আর কী তার অসাধারণ স্বাদ-ভেবে কূল পাওয়া যায় না।
শাল, সেগুন, আমলকী, জামরুল, কৃষ্ণচূড়া শিরীষের বনে লাগে হিমেল হাওয়ার ছোঁয়া। বাতাসে বাতাসে রিক্ততার সুর বেজে ওঠে। ভোরের প্রকৃতি তখন ঘন কুয়াশার ধবল চাদরে ঢাকা থাকে। উত্তরের হিমেল হাওয়ায় হাড়ে কাঁপন লাগিয়ে শীত এসে জেঁকে বসে। সমগ্র প্রকৃতি তখন শীতের দাপটে নির্জীব হয়ে যায়। শীতের শুষ্কতায় অধিকাংশ বৃক্ষলতা পত্র-পল্লবহীন হয়ে পড়ে। সবুজ প্রকৃতি রুক্ষমূর্তি ধারণ করে। এসময় পাতাহীন গাছের ডালগুলো কেঁদে ওঠে বুক ফাটা হাহাকারে। একটা উদাস সুর বাজে প্রকৃতিতে। মনে হয় প্রকৃতি যেন মৃত্যুশয্যায়। শীতের দীর্ঘ রজনীতে মানুষ কাঁথা, কম্বল মুড়ি দিয়ে জড়াজড়ি করে কাটায়। কিশোরী বধূর মন হাহাকার করে প্রিয়তমকে কাছে পাওয়ার জন্য। পাখিরা সূর্য ওঠার আগে তেমন ডাকে না। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে কৃষক লাঙ্গল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে মাঠে চলে যায়। কেউ জমি চাষ করে। কেউ ক্ষেতে নিড়ানি দেয়। কিষাণ বধূরা শয্যা ত্যাগ করে গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে হাত দেয়।
কিন্তু বিস্ময়কর রকম ভাবে আমরা শীত নিয়ে বড় বেশি নীরব। উদাসীন। শীত যেন এক অপ্রত্যাশিত আগন্তুক। শরীরে কাঁপন ধরিয়ে আমাদের প্রাত্যহিক মৃদুমন্দ জীবনে ছন্দপতন ঘটায় বলেই কী শীতের প্রতি অভ্যর্থনা জানাতে এত কার্পণ্য আমাদের? হবে হয়তো!
আমাদের যাপিত জীবনের সঙ্গে, আমাদের সব স্বপ্ন আর বাস্তবতার সঙ্গে ঋতুগুলো অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। একেক ঋতুর একেক রঙ, একেক রূপ; আলো আর হাওয়ার নানা বৈভব, নানা বৈচিত্র্য। ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গেই মাঠ-ঘাট-প্রান্তর, বন-বনানী, আকাশের আঙিনায় রচিত হয় কত না দৃশ্যপট। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই চারটি ঋতু। বিধাতা অন্য সম্পদে আমাদের দরিদ্র করে রাখলেও ঋতুধনে ধনী করে দিয়েছেন। আমাদের আছে ছয়টি ঋতু-গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। শীত ঋতু আছে বিশ্বজুড়েই।
অন্যসব ঋতুর চেয়ে তার চালচলনও আলাদা। শস্যের ঋতু হেমন্তের অবসানে যখন উত্তুরে ঠাণ্ডা হাওয়া ছুটে আসে, তখন রবীন্দ্রনাথের গানের সেই চরণটি মনে পড়ে যায়, ‘শীতের হাওয়ায় লাগল কাঁপন আমলকীর ওই ডালে ডালে।’ নববর্ষে যেমন আমরা ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’ বলে গানে গানে মুখর হয়ে উঠি, শীতের জন্য তেমন কোনো আবাহনগীতি আমরা সেই উদ্যমে রচনা করি না। এ যেন বাঙালির চিরন্তন বৈপরীত্যের দিয়ে গড়া স্বভাবেরই বহিঃপ্রকাশ!
সাহিত্যের পাতাতেও রয়েছে শীত বন্দনা। বাংলার প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায় সুচারুভাবে তুলে এনেছেন এ ঋতুটিকে। কবি তার কবিতায় তুলে এনেছেন শীতের বিষাদ, স্মৃতি, সৌন্দর্য আর মৃত্যু। তার ‘মৃত্যুর আগে’ কবিতায় লিখেছেন, ‘আমরা হেঁটেছি যাঁরা নির্জন খড়ের মাঠে পৌষ সন্ধ্যায়/দেখেছি নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল কুয়াশার…’। ওই কবিতায় ফসলরিক্ত মাঠের শিয়রে চাঁদের বর্ণনায় কবি লিখেছেন, ‘যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ/কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে’। পিছিয়ে নন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। তিনি তার কবিতায় লিখেছেন ‘শীতের হাওয়ার লাগল নাচন আমলকির ওই ডালে ডালে…’ বা ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয় রে চলে আয় আয় আয়…’।
কনকনে হিমেল হাওয়া আর ঘন কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে আসে শীতের আগমনী বার্তা। হেমন্তের পরে ও বসন্ত ঋতুর আগে শীত ঋতুর অবস্থান। পৌষ ও মাঘ এ দু’মাস শীতকাল হলেও এর শুরু কিছুটা আগেই এবং সমাপ্তিও ঘটে আরো কিছুটা পরে। অর্থাৎ শীতের আগে হেমন্তের শেষ দিকটায় কিছুটা শীত অনুভূত হয় আর শীতের পরে বসন্তের শুরুতেও কিছুটা শীত থাকে। হেমন্তের ফসল ওঠে যাওয়ার পরে প্রকৃতিতে যে শূন্যতা, তার মাঝেই শীতের অবস্থান। হেমন্ত ঋতুর পর ঠান্ডা আমেজ মাখা উত্তরে হাওয়া শীতকালের আগমনী বার্তা ঘোষণা করে। শুষ্ক শীতল চেহারা নিয়ে আসে শীতঋতু। কুজ্ঝটিকার হিমেল আবরণ টেনে উপস্থিত হয় শীত তার চরম শুষ্কতার রূপ নিয়ে। নির্মম রুক্ষতা, পরিপূর্ণ রিক্ততা ও বিষাদের প্রতিমূর্তি হলো শীতঋতু।
শীত অবশ্য এক রিক্ত ঋতুও বটে। তার মাঠজুড়ে কেটে নেওয়া ফসলের শূন্যতা, নিঃস্বতার নিদারুণ হাহাকার। কুয়াশার সাদা উত্তরীয় দিয়ে যেন সেই শূন্যতাকেই ঢেকে দেওয়ার ব্যর্থ প্রয়াস। অন্য সব ঋতুই কোনো না কোনোভাবে পূর্ণতার প্রতিচ্ছবি। গ্রীষ্ম আনে ফুল আর ফলের সম্ভার, বর্ষা আনে আকাশভরা ঘনঘটা, শরৎ আনে আলোভরা আকাশ আর শুভ্র মেঘ, হেমন্ত আনে শস্য আহরণের আনন্দ, আর বসন্ত? তার অভিষেকই তো হয়েছে ‘ঋতুরাজ’ হিসেবে। এর মধ্যে শীতই কেবল শূন্যতার গান গায়, তার দুটি হাত রিক্ত, যেন কিছুই দেওয়ার নেই তার, বৈরাগ্যের বেশ তার, যেন এক উদাসীন সন্ন্যাসী, সব বর্ণবিভা মুছে ফেলে শুভ্র বসন পরে একাকী সে চলে যাচ্ছে দিগন্তের পথে। বসন্ত ঋতুর কলমুখর পুষ্পিত আবহ যখন চারদিকে আনন্দ গান জাগিয়ে তোলে, কবি সুফিয়া কামালের মনে তখন শীতের সন্ন্যাসীর স্মৃতি ভেসে ওঠে। তিনি বলেন, ‘কুহেলি-উত্তরীতলে মাঘের সন্ন্যাসী, গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে/তাহারেই পড়ে মনে ভুলিতে পারি না কোনোমতে।’
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







