আমরা কথায় কথায় শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ, আগমীর নেতৃত্ব ইত্যাদি বলে থাকি। কিন্তু আমরা ভুলেও বলি না শিশুরা আগামী দিনের শুধু নয়, বর্তমান সময়ের জন্যও ভূমিকা রাখতে পারে। শিশুরা আগামীর বলার মধ্য দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎতের জন্য রেখে দেই। এমন সংস্কৃতি গড়ে উঠার ফলে তাদের কাছ থেকে শেখার কিংবা জানার চেষ্টা কোনটিই আমাদের হয় না। এক ধরনের দূরত্ব থাকায় শিশুদের সৃষ্টিশীলতা সব আমাদের আড়ালেই থেকে যায়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এমন সংস্কৃতি বিদ্যমান। স্কুল কলেজে শিক্ষকরাই শুধু বলবে আর শেখাবে। ছাত্ররা শুনবে আর শিখবে। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদের প্রশ্ন করার অধিকার দেয়া হয় না বললেই চলে। র্দীঘ সংস্কৃতির ফলে ছাত্ররা সাহস নিয়ে শিক্ষককে প্রশ্ন করে মতামত দিতে খুব একটা দেখা যায় না। সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের ভাবনাতেও ছাত্ররা শুধু শুনবে আর শিখবে, শেখাবে না। ছাত্রদের কাছ থেকে শেখার যেন কিছুই নেই।
কিন্তু সম্প্রতি শিশু কিশোর ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন থেকে আমরা চাইলে অনেক কিছু শিখতে পারি। শিশুদের প্রতি আমাদের র্দীঘ দিনের দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস পরির্বতন ঘটাতে পারি।
ছাত্র আন্দোলনের র্দীঘ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন বিদ্যমান। কিন্তু আজকালকার ছাত্র আন্দোলনের সাথে সম্প্রতি স্কুল কলেজ পর্যায়ের কিশোর ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের বিরাট তফাত দেখতে পাই। প্রচলিত ছাত্র আন্দোলনের স্লোগান সব আমাদের মুখস্ত। যেখানে নতুনত্ব থাকে না বললেই চলে। স্লোগান শুরু হয় আগুন জ্বালানোর আহ্বানের মধ্য দিয়ে। কখনো সারি সারি উচ্চস্বরে মোটর সাইকেল হর্ন বাজিয়ে রাজপথে মিছিলও আর নতুন কিছু নয়। ছাত্র আন্দোলনের সমাবেশে দাবি দাওয়ার বৈচিত্র্যতা না থাকায় জনগণ মানুষের আগ্রহ খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ছাত্র আন্দোলন শুনলে আমাদের মাঝে ভয়, আতঙ্ক কাজ করে। অনেক অভিভাবক ছেলেমেয়েদেরকে পারতপক্ষে দূরে থাকার পরামর্শ দেন কিংবা দূরে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু সম্প্রতি কিশোরদের আন্দোলন প্রচলিত সমস্ত বিশ্বাস ভেঙ্গে দিতে সক্ষম হয়েছে। অনেক অভিভাবককে ছেলেমেয়েদের সাথে অংশ দিতে দেখা গেছে যা আমাদের বর্তমান সমাজে বিরলও বটে। 
স্লোগানের ভাষাও ছিল গতানুগতিকতার বাইরে একেবারে বাস্তবতার নিরিখে। অনেক নতুন নতুন শব্দ, বাক্য এখন মুখে মুখে। এই শিশু কিশোররা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। অন্দোলন কিভাবে করতে হয়, কেমন হতে পারে তাও দেখিয়েছে। সড়ক ব্যবস্থাপনায় কত দুরবস্থা বিরাজমান তা আমাদের দেখিয়েছে। এবং চাইলেই আমরা এই দুরবস্থা যে দূর করতে পারি তাও হাতে কমলে শিখিয়েছে।
জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে সচিব, মন্ত্রী এমনকি বিচারপতির গাড়ি চলে ড্রাইভারদের লাইসেন্স ছাড়া। যা কিশোর কিশোরীদের নতুন আবিষ্কারও বটে। ছাত্রদের এই প্রচেষ্টা বৃথা যাবে যদি আমরা দেখার পরও না দেখার ভান করে থাকি। শেখানোর পরও যদি না শিখি।
ছাত্র সংগঠন সমূহও এই শিশুদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। প্রচলিত স্লোগান আর সারি সারি মোটর সাইকেল হর্ণ বাজিয়ে ভয় ভীতি প্রদর্শন করা যাবে কিন্তু জন-গণ মানুষের মন জয় করা যাবে না। জনগণকে সম্পৃক্ত করা যাবে না। জন-গণ মানুষের মন জয় করার জন্য চাই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। পাশাপাশি সৃষ্টিশীল পন্থায় আন্দোলন কার্যক্রম।
বহিঃবিশ্বে শিশুদের কিভাবে যত্ন নেয়া হয় তা আমরা জানি। আমাদের দেশের ন্যায় গাদা গাদা বই চাপিয়ে দেয়া হয় না। তাদের বিদ্যালয়গুলো বাগানের ন্যায় সুন্দর পরিবেশে হয়ে থাকে। শিক্ষকরা হন প্রশিক্ষিত ও শিশুবান্ধব। শিশু অধিকার সম্পর্কে তারা অত্যন্ত সচেতন। অস্ট্রেলিয়ায় পাশের বাড়িতে কোন শিশুকে মারধর করতে শুনলে নির্দিষ্ট নাম্বারে ফোন করলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ চলে আসে। ব্যক্তিগত যানবাহনে শিশু থাকলে Baby on Board স্টিকার লাগিয়ে রাখে। তারা শিশুদের শুরু থেকে শুধু কথায় নয় কাজে কর্মেও যত্ন নেয়।
আমাদের দেশে নানা প্রতিবন্ধকতার পরও শিশুদের সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনা আমাদের অবাক করে দেয়। এদের যত্ন নিতে ভুল করা যাবে না। এদের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে লজ্জা পেলে হবে না। নয়তো এই শিশুরা আগামীতে আরো গঠনমূলক কার্যক্রম দিয়ে আমাদের শেখাতে নানা উদ্যোগ নিবে এটা নিশ্চিত।
শিশু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে নানা বির্তক হতে পারে কিন্তু তাদের প্রতি র্দীঘ দিনের অযত্ন, অবহেলার বহিঃপ্রকাশ হলো এবারের আন্দোলন এই নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। আমাদের দেশে খুব কম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা থাকে। অধিকাংশ স্কুল কলেজ ছাত্রছাত্রীদেরকে নিজেদের ব্যবস্থাপনায় নয়তো গণপরিবহনে যাতায়াত করতে হয়। দেখা যায় বাস আর লেগুনার ন্যায় গণপরিবহন নানা অজুহাতে শিক্ষার্থীদের গাড়িতে না নেয়ার চেষ্টা থাকে যেমন অনেক গাড়িতে লেখা থাকে ‘হাফ পাস নাই’ ইত্যাদি। যা আমরা দেখেও না দেখার ভান করে পার করেছি দশকের পর দশক। (পার্বত্য চট্টগ্রামের ছাত্রছাত্রীদের অবস্থা আরো নাজুক। খাগড়াছড়ি থেকে পানছড়ি সড়কে গেলে চাঁন্দের গাড়িতে করে প্রতিদিন বানর ঝুলানি দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে আসা যাওয়ার চিত্রের দেখা মেলে)
এই আন্দোলন থেকে উচ্চবিত্ত পরিবারের ছাত্রছাত্রীদেরকেও শিক্ষা নিতে হবে। স্কুল সময়ে গাড়িগুলো যেখানে সেখানে থামিয়ে র্দীঘ সময়ের জন্য কৃত্রিম জটলা বাঁধতে সাহায্য করা হয়। অনেক ড্রাইভারকে গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির দরজা পর্যন্ত খুলে দিতে হয় যা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু লাগে। এমন সব ‘সাহেবি’ আচরণের কারণে রিকশা আর লাইনের গাড়িতে আসা যাওয়া করা ছাত্রছাত্রীদেরকে জটে আটকে সময়ে পৌঁছাতে না পারার কারণে গেইটের বাইরে কিংবা ভিতরে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তাই উচ্চবিত্তসহ ব্যক্তিগত কিংবা সরকারি- বেসরকারি গাড়ি ব্যবহার করে স্কুলে আসা যাওয়া করে এমন পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের মাঝেও নিম্নবিক্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াতের দুর্গতি উপলব্ধি করা প্রয়োজন।
লাইসেন্স চেক করার পিছনে অনেক কারণের মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে স্কুলে আসা যাওয়া করা কিছু ছাত্রছাত্রী আর অভিভাবকদের আচরণের (গাড়ির দরজা ড্রাইভারকে খুলে দিতে হয়, স্কুল গেইটের সামনে নামবে উঠবে, ড্রাইভারকে স্কুলের সামনে পার্কিং করে রাখতে বাধ্য করা ইত্যাদি) প্রতি ক্ষোভও একটি কারণ হতে পারে বলে মনে করি। মনে রাখতে হবে এটা মীম ও রাজীব হত্যার পরবর্তী ক্ষোভ শুধু নয়। র্দীঘ সময়ে বঞ্চণা, বৈষম্য, অপমান ও নানভাবে ছাত্রীদের প্রতি বাস ড্রাইভার ও হেলপারদের অশোভন আচরণের প্রতি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। অভিভাবক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সকলকে শিশু কিশোরদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে শেখার জানার চেষ্টা করতে হবে। শুধু তাদের শেখানোর চেষ্টা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আসুন দেরিতে হলেও শিশু অধিকারের প্রতি যত্নশীল হই। শিশুদের কাছ থেকে শিখে আরো ‘শিক্ষিত’ হই। আমাদের চিন্তা চেতনা, আচরণ, বিশ্বাস কিংবা অবহেলার কারণে তাদের যেন আর পথে নামতে না হয় ।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







