লেখক হত্যা এদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক রাজীব হায়দার হত্যার মধ্যদিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সূচনা হয়। এর আগে একটা মাত্র এরকম আঘাত হয়েছিল অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের উপর। তার আগে আর কখনো লেখার অপরাধে কোন বাঙালি ধারালো অস্ত্রের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে এরকম ঘটনা শুনিনি।
মৌলবাদীরা নব্বইর দশকে নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিণের উপর চড়াও হয়েছিল তাঁর বই ‘লজ্জা’ প্রকাশের পর। তারা তাঁকে অনেক হুমকি-ধামকি দিয়েছে। হুমকি-ধামকির মধ্যেও তিনি অনেক দিন দেশে ছিলেন। তারপর এক সময়ে জীবনের ভয়ে বিদেশে চলে গিয়েছেন।
মৌলবাদীরা একই সময়ে স্বঘোষিত নাস্তিক অধ্যাপক আহমেদ শরীফকে তাঁর লেখার জন্য অনেক গালাগালি, হুমকি-ধামকি দিয়েছে। সে সময়ে মৌলবাদীরা ‘মুরতাদ’ শব্দটি মুক্তমনা লেখকদের প্রতি প্রয়োগ করত। বেশ কয়েকজন লেখকের নাম দিয়ে তারা মুরতাদের তালিকাও প্রকাশ করেছিল। তসলিমা নাসরিণ বা অধ্যাপক আহেমদ শরিফ বা অন্যকোন মুক্তমনা লেখকদের উপর সে সময়ের উগ্রবাদীরা আঘাত করেনি। স্বঘোষিত নাস্তিকদের মধ্যে বেশ কয়েক জন মৃত্যুর আগে নিজের মরদেহ কোন ধর্মীয় নিয়মে সৎকার না করার অনুরোধ করেছেন। নিজের মরদেহ তারা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞানার্জনের কাজে উৎসর্গ করে গেছেন।
মৌলবাদীরা সে সময়ে ভিন্নমতের বই বা লেখার প্রতি বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে, লেখকদের হুমকী-ধামকি দিয়েছে কিন্তু আঘাত করেনি। জামায়াতে ইসলামের সংসদ সদস্য, একাত্তরের যুদ্ধাপরাদের মামলায় দণ্ড প্রাপ্ত দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ২০০৪ সালের জানুয়ারী মাসে জাতীয় সংসদে হুমায়ুন আজাদের “পাক সার জমিন সাদ বাদ” বই এর কঠোর সমালোচনা করে এইসব লেখকদের লেখা বন্ধ করতে ব্লাসফেমি আইন প্রনয়ণের দাবী জানায়।
এর ঠিক এক মাস পর ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বাংলা একাডেমী বই মেলা থেকে ফেরার সময় অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের উপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে জামায়াতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)। হামলায় তিনি গুরুতর আহত হলে বিদেশে নিবিড় চিকিৎসায় খানিকটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। সে বছরেই তিনি জার্মানিতে মারা যান। জেএমবি শীর্ষনেতা শায়খ আব্দুর রহমান পরবর্তিতে হুমায়ুন আজাদ এবং একইসাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম ইউনুসকে হত্যার নির্দেশ দেবার কথা স্বীকার করে। রাজশাহী অঞ্চলে বাংলা ভাইয়ের ধর্মের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং ২০০৫ সালে দেশব্যাপী বোমা হামলা করা হলে জেএমবি জাতীয় আলোচনায় আসে। মিডিয়ার খবরে জানা যায় জামায়াতে ইসলামীর একটি অংশ উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড করার জন্য জেএমবি গঠন করে।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ৫ তারিখ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে গণজাগরণ শুরু হলে তার প্রতি দেশবাসীর মনোযোগ আকৃষ্ট হয়; যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবী অনেক জোড়াল হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীকে দূর্বল করার লক্ষ্যে তাকে বিতর্কিত করে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য আক্রমণ করা হয় গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক ও ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন, দ্বীপ, রাজীব হায়দারসহ আরও কয়েক জনের উপর। রাজীব হায়দারকে হত্যা করে তাকে নাস্তিক হিসেবে প্রচার শুরু করে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত পত্রিকা এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলো। এ প্রচার শুরুর আগে আওয়ামী লীগ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজীবের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেবার জন্য তার বাসায় গিয়েছিলেন। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গণজাগরণকে ‘নাস্তিক’ এবং ‘নষ্ট’ ছেলেদের কাজ বলে অভিহিত করেন।
জামায়াত-বিএনপি জোটের নেতারা এবং তাদের অনুসারী মিডিয়া গণজাগরণকে নাস্তিকদের কর্ম হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচার করে। বেগম জিয়া ও তাঁর দলের এবং জোটের নেতাদের বক্তব্য, প্রচার নাস্তিক নিধনকে ও সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণকে উৎসাহিত করে। তাদের অপপ্রচার এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে একটা বড় অংশের মানুষ শুধু গণজাগরণে অংশ নেয়া লোকেরাই নয় সরকারি দল আওয়ামী লীগকেও নাস্তিকদের দল হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে। তাদের অপপ্রচার জোড়াল করার জন্য সারা দেশে চালানো হয় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ। এসব অপপ্রচারের ফলে বাঙালি মানস উগ্র হতে শুরু করে।
ধর্মপ্রাণ বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এতে বিভ্রান্ত হয় যার ফলাফল দেখা যায় কয়েক মাস পরে অনুষ্ঠিত ৫ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনকারী দল আওয়ামী লীগ সে নির্বাচনের প্রতিটিতে হেরে যায়। এই পরাজয় আওয়ামী লীগকে শিক্ষা দেয় যে কোন ভাবেই নিজেদের নাস্তিক হিসেবে বিবেচিত হতে দেয়া যাবে না। অগ্নি সন্ত্রাস, আন্তর্জাতিক চাপ এবং মৌলবাদী উত্থানের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করতে ব্যর্থ হয়ে এবং ‘১৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ গ্রহণ না করে সে নির্বাচন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বানচাল করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে রাজনীতির খেলায় মাঠ থেকে ছিটকে পরে জামায়াত-বিএনপি জোট।
‘১৪ সাল তারা চুপচাপ থেকে পার করে দিয়ে ‘১৫ সালের শুরু থেকে তারা আবারো শুরু করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নতুন নির্বাচনের দাবী নিয়ে ৯২ দিনের লাগাতার অবরোধ ও হরতালের নামে চালানো হয় দেশব্যাপী ধ্বংস আর মানুষ পোড়ানোর মধ্যযুগীয় বর্বরতা। এর মধ্যেই হত্যা করা হয় বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়কে। ভিন্ন মাত্রা পায় হরতাল-অবরোধের মাধ্যমে সরকার পতনের আন্দোলন। লেখকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ বলে দায় চাপানো হয় সরকারের উপর। সরকার শক্ত হাতে মানুষ পোড়ানো আন্দোলন দমন করলে ইসলামী বিশ্ব এবং পশ্চিমাদের সমর্থন নিয়ে জামায়াত-বিএনপি জোটের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের চেষ্টা আবারো ব্যর্থ হয়। জামায়াত-বিএনপির শত শত নেতা-কর্মী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়ে বিচারাধীন অবস্থায় জেলে থাকায় কমে যায় তাদের সন্ত্রাস করার শক্তি। থামে না তাদের ধ্বংসের উম্মাদনা।
উগ্রবাদীদের উজ্জীবিত রাখতে তারা স্বল্প শক্তি ব্যয়ে ছোট ছোট জঙ্গিগ্রুপের মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছে লেখক, ব্লগার হত্যা; সবশেষে যুক্ত হয়েছে প্রকাশকও। বিজ্ঞান লেখক অভিজিত রায় সহ ‘১৫ সালে হত্যা করা হয়েছে তিন লেখক – ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয়, নিলয় নীল (নীলাদ্রি চ্যাটার্জি), এবং একজন প্রকাশক – আরেফিন ফয়সাল দীপন।
‘১৫ সালের শেষ দিনে নিম্ন আদালত প্রায় তিন বছর পর রাজীব হত্যার রায় প্রদান করে। এ রায়ের মধ্যে দিয়ে দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্লগার ও লেখক-প্রকাশকসহ মুক্তমতের মানুষের ওপর হামলা-হত্যার ঘটনায় প্রথম রায় এলো। এ রায়ে ২ জনকে ফাঁসি এবং ৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত দুই জনের মধ্যে একজন পলাতক। এই মামলায় সাজা প্রাপ্ত ৮ জনের মধ্যে ৭ জনই নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র। অন্য জন সব কয়টি লেখক, প্রকাশক হত্যার দায় স্বীকার করা সংগঠন আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) প্রধান, মুফতি মো. জসীমউদ্দিন রাহমানী।
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত পলাতক আসামী যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতা। এ পর্যন্ত বিভিন্ন লেখক-প্রকাশক-পীর-মাশায়েখ হত্যা মামলায় যতজন অভিযুক্ত ধরা পরেছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এসেছে জামায়াত-শিবির ব্যাকগ্রাঊণ্ড থেকে দুটি ব্যাণারের অধীনে – এবিটি এবং জেএমবি। জেএমবিতে রয়েছে প্রাক্তন জামায়াত সদস্য এবং সক্রিয়ভাবে এবিটি নিয়ন্ত্রণ করছে শিবির। রাজীব হত্যা মামলায় ছয় জন নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালরের ছাত্রকে পরিচালনা করেছে শিবির নেতা রানা। হত্যাকাণ্ডের পর রানা ঠিক সটকে পড়েছে; পালাতে পারেনি অন্য ছয় জন।
মামলার রায় ঘোষণার পর মিডিয়ার সামনে রাজীবের বাবা বলেছেন, “আমি আনসারুল্লাহ বাংলা টিম চিনি না। আমার ছেলেকে হত্যা করেছে শিবির।” বিভিন্ন ব্যাণারের তলায় এসব হত্যাকাণ্ড ঘটতে দেখা যাক না কেন মূলতঃ এদের কলকাঠি নাড়ছে জামায়াতে ইসলামী। জামায়াত লেখক-প্রকাশক হত্যাকরে এদেশের প্রগতিশীলদের মনে ভীতি সঞ্চার করতে চায়। যাতে তারা মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে না পারে; মুক্তমনে জ্ঞানার্জন করতে না পারে। মুক্তমনে জ্ঞানার্জন করলে মধ্যযুগীয় বর্বরতা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি সমাজ থেকে দূর হয়। এসব দূর হয়ে গেলে একদিকে ধর্মীয় মৌলবাদী রাজনীতি অর্থহীন হয়ে পরে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানী সংস্কৃতি এবং রাজনীতি থেকে মানুষ দূরে সরে গিয়ে আবহমানকাল থেকে চলে আসা বাঙালির বিজ্ঞান ভিত্তিক সংস্কৃতি জোড়াল হয়ে ওঠে। দুই দিক থেকেই মুক্তবুদ্ধির চর্চা জামায়াতের শিকড় দূর্বল করে দেয়। আরেক দিকে, লেখক-প্রকাশক হত্যার পেছনে রয়েছে চলমান রাজনৈতিক লাভ। মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারীরা সকলেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবীতে সোচ্চার। ‘নাস্তিক’ ট্যাগ লাগিয়ে এদেরকে হত্যা করা হলে গণজাগরণে উদ্দীপ্ত বিপুল সংখ্যক মানুষ দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়বে। গণজাগরণ মঞ্চের প্রতি সমর্থন কমে যাবে। বাস্তবে হয়েছেও তাই। ফেব্রুয়ারী মাসে শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে অন্যান্যদের সঙ্গে অংশ নিয়েছিল অনেক বিএনপি সমর্থক। রাজীব হত্যার পরে এদের প্রায় সকলেই গণজাগরণে যোগদান থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। প্রগতিশীলতার প্রশ্নে মানসিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী নয় এমন অনেকেই ত্যাগ করেছিল শাহবাগ প্রতিবাদ।
‘নাস্তিক’ এবং ‘নষ্ট ছেলে’ বলে গালি দিয়ে এমন অবস্থাই সৃষ্টি করে ছিলেন জামায়াত-বিএনপি জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বিদেশী ব্যতীত অন্য সকল টার্গেটদের মধ্যে একটা বিষয় কমন। সেটা হচ্ছে এরা সকলেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি, এরা সকলেই একাত্তরের ঘাতকদের বিচার চায়। ধর্মান্ধদের মূল লক্ষ্য নাস্তিক, ব্লগার, লেখক, পীর-মাশায়েখ, বিদেশী বা অমুসলিম নয়। তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করা। কখনো ধর্মানুভুতিতে আঘাত পাওয়ার বাহানায়, কখনো ইসলাম নষ্ট হওয়ার কথা বলে, একেক সময় একেক অজুহাতে এবং বীণা অজুহাতে এরা টার্গেট কিলিং করেছে ধর্মীয় উম্মাদনা সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক প্রভুদের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে।
উগ্র ধর্মীয় উম্মাদনা তাড়িত সন্ত্রাস দিয়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ট্রাইবুন্যাল বানানো সরকারের পতন ঘটাতে পারলে মুক্ত করা যাবে যুদ্ধাপরাধী নেতাদের; ফিরে পাওয়া যাবে ২০০৯ এ হারানো পাকিস্তানী ভাবাদর্শের বাংলাদেশ; এমন কি দীর্ঘকালের জন্য তৈরী করা যেতে পারে মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধ শাসন ব্যবস্থা।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






