ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে এসেছে স্পেন। স্পেন ভালো খেলেই উঠে এসেছে। অবশ্য বিগত সব ম্যাচের পারফরম্যান্সে জনমতে এগিয়ে ছিল ফ্রান্সই। কিন্ত এমবাপেকে ভীষণ মন খারাপ করে ফিরতে হয়েছে বিশ্বকাপ থেকে। অনেকেরই বিশ্বাস ছিল এবার বিশ্বকাপ শিরোপা নেবে ফ্রান্স। কিন্তু স্প্যানিশরা সেটা হতে দেয়নি। তাও আবার অতিরিক্ত সময়ের আগেই ফ্রান্সকে ২-০ গোলে তারা আরেক চমক দিয়েছে।
সেই চমকের আলোচনা শেষ না হতেই আর কয়েকঘণ্টা পরে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের মধ্যে দ্বিতীয় সেমিফাইনাল। কেমন হবে আজেকের এই সেমিফাইনালের দ্বৈরথ? বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে নানান কথা। আজকের দ্বৈরথকে সামনে রেখে অনেকেই এই দুই দেশের অতীত নিয়ে বেশ ঘাঁটাঘাঁটিও শুরু করেছেন। মনে করিয়ে দিচ্ছেন ‘৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনার সেই রহস্যময় হ্যান্ড অব গোলের কথা। কেউ কেউ আবার স্মৃতির আকাশে খুঁজছেন ‘৯৮ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি শুটআউটে আর্জেন্টিনার জয়ের কথা। কেউ কেউ আবার স্মরণ করছেন ২০০২ সালে অনুষ্ঠিত জাপান কোরিয়া বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্যায়েই ইংল্যান্ডের কাছে বেকহ্যামের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনার হার।
তবে এই সব ইতিহাস বলছে এপর্যন্ত যা যা হয়েছে সেখানে মেসি বা হ্যারি কেন কেউ-ই ছিল না। শুধু এই নয়, এ যাবৎ কাল দুদেশের কোন মুখোমুখি লড়াইয়ে মেসি বা হ্যারি কেন খেলেননি। তবে আজ প্রথম দুদেশের পক্ষে দুজনেই থাকবেন। হ্যারি কেনের চেয়ে মেসির বয়স অনেকবেশি। এই বিশ্বকাপে হ্যারি কেন এক কথায় ইফেকটিভ ম্যাচ খেলছেন। আর বয়সে অনেক এগিয়ে থাকা মেসিও কম যাচ্ছেন না। সুইজারল্যান্ডের সাথে শেষ ম্যাচটা বাদ দিলে মেসি প্রতিটি ম্যাচেই ছিলেন অনবদ্য, অনিন্দনীয়। গোলও করেছেন আটটি।
কোচ স্কালোনি হৃদয়মন্দিরে থাকা মেসির আর্জেন্টিনা দল এখন আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে তারা মাঠে প্রমাণ করেছে তারা পরিণত ও সংগঠিত। লিওনেল স্কালোনির দল বল দখল, দ্রুত আক্রমণ এবং শক্ত রক্ষণে ভারসাম্য বজায় রাখতে দক্ষ। অভিজ্ঞ ও তরুণদের সমন্বয়ে গড়া এই দল যেকোনো বড় ম্যাচে নিজেদের সামর্থ্য উজাড় করে খেলার ক্ষমতা রাখে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডও এখন আর শুধুই সম্ভাবনার দল নয়। বিগতদিনে কয়েকটা টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্স তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দুদলের কৌশলগত লড়াইটা হবে খুবই আকর্ষণীয। আর্জেন্টিনা সাধারণত ধীরে ও ধৈর্য ধরে আক্রমণ গড়ে তোলে। আপন আঙিনায় বল রেখে আক্রমণ সাজায়। অন্যদিকে ইংল্যান্ড দ্রুত ট্রানজিশন এবং উইং ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের উপর হামলে পড়ে। তবে আজকের ম্যাচে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং দুই দলের রক্ষণভাগের দৃঢ়তা ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আজ খেলার শুরু থেকেই দুই দল সতর্ক থাকবে। নির্ধারিত সময়ে ফল না এলে অতিরিক্ত সময় কিংবা টাইব্রেকারের নাটকও দেখা যেতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা মানেই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়; এটি ইতিহাসের পুনর্জন্ম, আবেগের সংঘর্ষ এবং বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন অধ্যায়ও।
শেষ পর্যন্ত যে দলই জিতুক আজ হবে একটি স্মরণীয় লড়াই। সে লড়াই প্রথম সেমিফাইনালে স্পেন ও ফ্রান্সের মধ্যেকার ম্যাচের আবেগ আনন্দ আরও বড় বেশি ছাপিয়ে যাবে। সাবেক তারকা ফুটবলার ইমতিয়াজ সুলতান জনিও এমন মনে করেন। তার মতে, ‘আর্জেন্টিনা এবং ইংল্যান্ডের মধ্যেকার ম্যাচ নিয়ে কারো পক্ষেই আগাম কোন ফলাফল অনুমেয় করা সম্ভব নয়। কেননা এটি একটি হাইভোল্টেজ ম্যাচ। অন্য কোনকিছু দিয়ে এই ম্যাচ পরিমাপ ও মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। কেননা এ ধরনের ম্যাচে জয়-পরাজয় নির্ধারণে অনেককিছু নির্ভর করে। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড কেউই কারো থেকে পিছিয়ে নেই। কিন্তু ম্যাচটি দুই কোচ কোন পরিকল্পনা দিয়ে খেলাবে সেটা দেখার বিষয়। একইভাবে মাঠে কাদের নির্দেশনাগুলো থাকবে সেটাও দেখার বিষয়। দুই দলের কোচ কীভাবে কখন গেমে পরিবর্তন আনে সেটা একটা মুখ্য বিষয়।’
ইমতিয়াজ সুলতান জনি আরও বললেন, ‘দুটো দলই ভারসাম্যপূর্ণ এবং সমান্তরাল। দুটো দলেরই ফুটবল আভিজাত্য আছে। ফুটবলের দীর্ঘপথে এই দুই দলের হাঁটার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আজ দুদলই জয়ের জন্য সর্বাত্বক খেলবে। কেউ কাউকে ছাড় দেবে না। বরং কেউ ভুল করলে প্রতিপক্ষ সেই ভুলের প্রাপ্যটুকু তুলে নিতে স্বচেষ্ট থাকবে। ম্যাচটা এরকমই হবে। আজ অনেক বোঝাপড়া ও ব্যাকরণের ম্যাচ।’
ইমতিয়াজ সুলতান জনি এও বললেন, ‘নিঃসন্দেহে হ্যারি কেন, জুড বেলিংহ্যাম, বুকায়ো সাকা খুবই ভালো ফর্মে আছে। ভালো খেলছেন। কিন্তু প্রতিপক্ষ যেহেতু আর্জেন্টিনা সেহেতু সরল সমীকরণ করার কোন কারণ নেই। তবে দুদলই নিজস্ব পরিকল্পনা নিয়ে খেলবে। হ্যারি কেন পুরো মাঠজুড়ে খেলে এটাই ভালো বিষয়।’
ইমতিয়াজ সুলতান জনি মনে করেন ইংল্যান্ডের খেলা আক্রমণাত্বক। ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলে উঠে এসেছে। আর্জেন্টিনা সম্পর্কে তিনি বললেন, ‘এই দলের প্রাণভোমরা মেসিসহ কিছু ভালো স্কোরার রয়েছে। শুধু মেসি নয়, এর বাইরে ম্যাক আলিস্টার, ফের্নান্দেজ, জুলিয়ান আলভারেজ যেকোনো সময় ভীষণ ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। আবার মেসি কখন কোথা থেকে গোল করে ফেলতে পারে তা সবার অজানা।’
সবশেষে তিনি বললেন, ‘মেসিভীতি কিন্তু সবার আছে। আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডও খুবই ভালো। গোলপোস্টে মার্টিনেজ আত্মবিশ্বাসী। সবমিলিয়ে আর্জেন্টিনাই আজকের ম্যাচে একটু হলেও ফেভারিট। তবে ম্যাচ হবে দুর্দান্ত। লড়াইটা সবার মনে গেঁথে থাকবে বলে মনে হয়। সবকিছু ছাপিয়ে যাবে আজ।’







