১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালি চেতনার শ্লোগান ছিল জয় বাংলা। পাকবাহিনীর হাতে বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবনদান করেছে জয়বাংলা শ্লোগান উচ্চারণ করতে করতে। দেশ স্বাধীনের পরে আওয়ামী লীগ হতে একটি অংশ বেরিয়ে গিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ গঠন করে।একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে জয়বাংলা শ্লোগানধারীদের কেন এই বিভাজন? সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশটিতে যেখানে প্রয়োজন ছিল ঐক্যের। প্রয়োজন ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সহযোগিতার।
তা না করে একদিকে জাসদ, অন্যদিকে হক-তোহা ও সিরাজ শিকদার পন্থীদের চরম পন্থী নাশকতা। এছাড়াও ছিল জাতির পিতার ভাষায় চাটার দল। সবমিলিয়ে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে স্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য যে উন্মুক্ত আবহ থাকার কথা ছিল। সেটা ছিল না। দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করা হল। আজকের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।
ইনডেমনিটি বিল, রাজাকারদের মন্ত্রীত্ব প্রদান, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের দিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করানো ও তাদের দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানো প্রভৃতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কর্ম প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে পরিচালিত হতে থাকে। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ১৪দলীয় জোটের জয়লাভ ও সরকার গঠনে নিস্তেজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন উদ্যম ফিরে পায়। এই উদ্যম ঠেকাতে শুরু হয় জামাত জঙ্গিদের গুপ্ত হামলা, পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, হরতাল, অবরোধের নামে গাড়ি পুড়ানো, মানুষ পুড়ানোসহ কত অপকর্মই না সংঘটিত হল দেশে। রাজাকারদের বিচার ও জামাত শিবির নিষিদ্ধের দাবিতে ঢাকার শাহবাগে গড়ে উঠল তারুণ্যের প্রতিবাদী মঞ্চ। যার নাম গণজাগরণ মঞ্চ।
শাহবাগ পেরিয়ে জেলা উপজেলায় ছড়িয়ে গেল গণজাগরণ মঞ্চের চেতনা। সারাদেশ দুলে উঠল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শাণিত আগুনে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জয়যাত্রায় আমরা উদ্বেলিত সেই সাথে গণতন্ত্রের চরিত্র হরনে আতঙ্কিত। ৫ জানুয়ারীর জাতীয় নির্বাচন, দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচন, মানুষকে নির্বাচনের প্রতি আস্থাহীন করে তুলেছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যাওয়া, জালভোট, কেন্দ্র দখল, ক্ষমতার প্রভাবে ভোটার আকর্ষণ, ভীতি প্রদর্শন করে ভোট সংগ্রহ প্রভৃতি গণতন্ত্র চর্চায় অনাকাঙ্ক্ষিত দুষ্ঠক্ষত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষায় নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, উন্নয়ন প্রভৃতির পাশাপাশি এ দলটির কাছে মানুষ গণতন্ত্রও প্রত্যাশা করে। গণতন্ত্র হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষা ও উন্নয়নও শোভন নয়। গণতন্ত্র হচ্ছে গণ আকাঙ্ক্ষার শেকড়। শেকড় নড়বড়ে হয়ে গেলে নড়বড়ে গাছ দিয়ে সুপুষ্ট ফল, ডাল পাতা সৃষ্টি সম্ভব নয়। সম্ভব হলেও তা একদিন নিস্তেজ হয়ে যেতে বাধ্য। ভিন্নমত দমন, অসহিষ্ণুতা ও বিরোধী পক্ষ দমনে কূটকৌশল যেমন শোভন নয় তেমনই সরকার বিরোধীদের জ্বালাও পোড়াও,নিরাপরাধ মানুষ হত্যা, গুপ্ত হত্যা শোভন নয়। বিরোধিতা হতে হবে রাজনৈতিক, তা দেশের জন্য হিতকর কোন কিছুর বিরোধিতা নয়। এক কথায় সরকার দলকেও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি মানতে হবে ও সরকার বিরোধীদেরও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি মানতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সকল রাজনৈতিক দলে গঠনতন্ত্র চর্চার রীতি প্রচলন ও গঠনতন্ত্রে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি অনুযায়ী পরিচালিত হবার নির্দেশনা।
গণতন্ত্রের পরাজয়ে আমরা ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত স্বাধীনতা যুদ্ধের অনিবার্যতা, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভয়াবহ রক্তাক্ত অভ্যুত্থান, এরশাদের সামরিক শাসন ও ওয়ান ইলেভেনের ভীতিকর পরিস্থিতি আমরা দেখেছি। গণতন্ত্রের উপস্থিতি মানুষের নিরাপত্তা, সৃষ্টিশীলতা ও মুক্তবুদ্ধির শান্তিপূর্ণ অবস্থানের আবহ কেড়ে নেয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তব রাজনৈতিক অবস্থানের চরম দূর্ভাগ্য হল আমরা একদিকে যেমন যুদ্ধাপরাধীর বিচার, একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের কর্তৃত্ব খর্ব, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রশংসিত গৌরবদীপ্ত ভূমিকা দেখছি। পাশাপাশি দেখছি গণতান্ত্রিক আচরণবিধির মারাত্মক লংঘন। সরকার দলের বিপরীতে বিরোধী দলের বৈশিষ্ট্যযুক্ত কোন বিরোধী দলের উপস্থিতিও দেখছি না। দেখছি উলঙ্গ সুবিধাবাদের বহির্প্রকাশ।
একটি দল সরকার দল ও বিরোধী দল উভয় ধরনের বৈশিষ্ট্যই গায়ে মেখে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে তৎপর রয়েছে।বিরোধী দল হওয়ার যোগ্যতা সম্পন্ন আরেকটি বৃহৎ দল দিনের পর দিন নেতিয়ে যাচ্ছে। সে দলটি আর উঠে দাঁড়াতে পারবে বলেও মনে হয় না। সে দলটির দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে অংশ নিতে রাজী নয়। ১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সে দাবিতেই তারা বর্জন করেছে। ২০১৯ সালের নির্বাচনও যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হচ্ছেনা এটা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। সেক্ষেত্রে বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলো কি তাদের অবস্থানের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সেবারও নির্বাচন বর্জন করবে? ১৪সালের নির্বাচন বর্জনই তাদের কোন ইতিবাচক ফল দেয়নি। সুতরাং ১৯ এর নির্বাচন কিভাবে দেবে? তারা অনির্দিষ্ট কালের জন্য অবরোধ ডেকেছিল। অবরোধ আজ পর্যন্ত প্রত্যাহার করা হয়নি তবু আপনা আপনি তা প্রত্যাহার হয়ে গেছে। পেট্রোল বোমা, জ্বালাও পোড়াও, ভাঙচুর, পুলিশের উপর হামলা ইত্যাদি করার মতোও আর সাংগঠনিক জোর নেই তাদের।
তাদের প্রধানতম লেঠেল শক্তি জামাত শিবিরও চরম নাজেহাল অবস্থায়। ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিএনপি পড়বে ফাটা বাঁশের চিপায়। নির্বাচন বর্জনেও তাদের অসুবিধা হবে আবার নির্বাচনে অংশ নিলেও অসুবিধা হবে। এক্ষেত্রে তারা কি সিদ্ধান্ত নেয় তা সময়ে বুঝা যাবে। বাংলাদেশের ভোটারদের চিন্তাধারার ক্ষেত্রে একটা ভয়াবহ পরিবর্তন এসেছে। তারা ভোট দিতে চায় ক্ষমতাধর দলের প্রার্থীকে।
ক্ষমতাহীন যোগ্যতম ব্যক্তি তাদের কোনো উপকার করতে পারবেনা এই বোধ অনেকের মধ্যেই সৃষ্টি হচ্ছে। যা বিগত ইউপি ও পৌর নির্বাচনে দেখা গেছে। ভোটাররা বলে সরকার দলের লোক ছাড়া অন্য কোন দলের প্রার্থী চেয়ারম্যান, মেয়র অথবা সাংসদ নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়ন হবে না। ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি এই ভাবনার করুণ শিকার হবে। তবে আমাদের নাগরিক প্রত্যাশা হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্র দুটোই চাই। আমরা সরকার দলও চাই, শক্তিশালী বিরোধী দলও চাই।চাই শান্তিপূর্ণ ও অবাধ প্রতিযোগিতা পূর্ণ সুষ্ঠু নির্বাচন।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








