গল্পটা রূপকথার নয়। গল্পটা কল্পনার শিখর পেরিয়ে অসীম ছোঁয়ার। যা রূপকথাকেও হার মানিয়ে এঁকে চলেছে অমর বীরত্বগাঁথার জয়গান। গল্পের শুরুটা বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকার দাবি ছিনিয়ে আনার জন্মসময়ের। ত্রিশ লাখ শহীদ আর কয়েক লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের ক্ষণের। যখন অকুতোভয় লাখো বীর অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশমাতাকে রক্ষায়। সেই লাখো কীর্তিমান সন্তানের মাঝের দুজন বীরের গল্প এটি। দুই শহীদ ক্রীড়াপাগল মানুষের, শহীদ জুয়েল এবং শহীদ মোশতাকের।
বিজয়ের ৪৭তম দিবসের উৎসবের দিনে স্মৃতিরভেলায় ঘুরে আসা যাক শহীদ জুয়েল ও শহীদ মোশতাকের আত্মদানের কাহিনী থেকে। মৌসুমটা ১৯৭০-৭১, জীবনের সেরা ফর্মেই ছিলেন জুয়েল। মোহামেডান স্পোর্টিং ও আজাদ বয়েজ ক্লাবের হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে মাঠ মাতিয়েছেন। এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যানের ছিল সহজাত মারকুটে ব্যাট চালানোর খ্যাতি, সঙ্গে জুটে গিয়েছিল স্লগসুইপ স্পেশালিষ্টের তকমা।
বয়সটা তখন মাত্র ২১। হয়ত টেস্ট জার্সি গায়ে তোলার স্বপ্নই দেখছিলেন। কিন্তু একটা মুহূর্ত বদলে দিল সবকিছু। হাতের ব্যাটের জায়গায় তুলে নিতে হল স্টেনগান-গ্রেনেড। পুরো দেশ তখন মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। জুয়েলের মতো টগবগে রক্তের তরুণও ঘরে বসে থাকতে পারেননি। মায়ের একমাত্র অবলম্বন ছিলেন। কিন্তু বুকের মাঝে ক্ষত ‘মোশতাক ভাই’য়ের ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া মুখটা। ২৫ মার্চ কালরাতে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে যে নির্মল মনের ক্রীড়াপাগল মানুষটিকে।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলেন আবদুল হালিম চৌধুরী (জুয়েল)। বীর বিক্রম খেতাব পাওয়া এ তরুণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রিকেটে খেলার সৌভাগ্যের হাতছানিকে উপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়েন রণাঙ্গনের উদ্দেশ্যে। ৩১ মে, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে জুয়েল চলে যান ভারতের ত্রিপুরায়। সেখান থেকে মেলাঘরে। যেখানে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন টগবগে যুবক। দেশের জন্য নিজের প্রাণ দিতে যারা ব্যাকুল হয়ে ছিলেন। তারা সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের কাছে প্রশিক্ষণ নেন।

দেশে ফিরলে মুক্তিবাহিনীর দুর্ধর্ষ ক্র্যাক প্লাটুনে নেয়া হয় জুয়েলকে। এই গেরিলা বাহিনীতে ছিলেন রুমি, বদিউজ্জামান, আলম, পুলু, সামাদ, আজাদের মত আত্মত্যাগী তরুণরা। দলটির ওপর দায়িত্ব বর্তায় রাজধানী ঢাকায় অতর্কিত হামলা চালিয়ে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার, উদ্দেশ্য পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মনোবলে চিড় ধরানো এক ধারাবাহিক অপারেশনের। ক্র্যাক প্লাটুন পরে ফার্মগেট, এলিফ্যান্ট রোডের পাওয়ার স্টেশন, যাত্রাবাড়ী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে হামলা চালিয়ে পাকহানাদার বাহিনীকে কাঁপিয়ে দেয়।
আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে অপারেশনের সময় গ্রেনেড বিস্ফোরণে ডান হাতের আঙুলগুলো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় জুয়েলের। প্রকাশ্যে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ ছিল না। সরকারি হাসপাতালে গেলে ঠিক ধরা পড়তে হবে। এরপরও থেমে থাকে না জুয়েলদের অপারেশন। আগস্টের মাঝামাঝি সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে অপারেশনের সময় হানাদারদের পাল্টা আক্রমণে আবারও মারাত্মক আহত হন তিনি। নিয়ে যাওয়া হয় মগবাজারে সুরকার আলতাফ মাহমুদের বাসায়। খবর পৌঁছে যায় পাশের পাকিস্তানি ক্যাম্পে। ২৯ আগস্ট কয়েকজন সেনা অতর্কিতে হামলা চালিয়ে আহত অবস্থায় জুয়েলকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়। জীবিত জুয়েলের থেকে অবশ্য ক্র্যাক প্লাটুনের কোন তথ্যই বের করতে পারেনি হানাদাররা।
টর্চার সেলে চলতে থাকে অমানুষিক অত্যাচার-নির্যাতন। জুয়েলের আঙুল কেটে ফেলা হয়। ২৯ আগস্টের কোন এক সময় হত্যা করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের বড় ক্রিকেট তারকা হওয়ার রসদ জমে থাকা জুয়েলকে। একইরাতে পাকিস্তানীদের হাতে ধরা পড়া আজাদ, রুমি, বদি, আলতাফ মাহমুদসহ অনেকে আর ফেরেননি।

জুয়েলের ভেতরের সেই আগুনটা জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন শহীদ মোশতাক আহমেদ। ক্রিকেট আর খেলাপাগল এ মানুষটা নিজের সবটুকু দিয়ে আজাদ বয়েজ ক্লাব গড়ে তুলেছিলেন। ২৫ মার্চ নির্মম গণহত্যার রাতে হত্যা করা হয় মোশতাককে। তার নিখোঁজের খবরটা জুয়েলের কানে আসে। ২৭ মার্চ পরিস্থিতি একটু থিতিয়ে এলে সৈয়দ আশরাফুল হককে নিয়ে তিনি মোশতাক ভাই’য়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। জেলা ক্রীড়া পরিষদ ভবনের সামনে গিয়ে যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেন। হাসিখুশি-পরোপকারী মোশতাকের নিস্পন্দ-নিথর দেহটা উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ক্ষত-বিক্ষত শরীর বুলেটে ঝাঁজরা। ছোপ ছোপ রক্ত জমাট বেধে আছে মাটিতে। হাত দুটো ওপরে ধরা। প্রিয় মোশতাক ভাইয়ের শরীরে যন্ত্রণা দেয়া বুলেটগুলো হত্যাকারীকে ফিরিয়ে দেয়ার শপথটা হয়ত তখনই নিয়েছিলেন শহীদ জুয়েল।
প্রতি বিজয় দিবসে এই দুই নায়ককে স্মরণের শ্রদ্ধামঞ্চ হয়ে ওঠে মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটের সবুজ গালিচা। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) আয়োজনে হয় শহীদ জুয়েল-শহীদ মোশতাক প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ। শের-ই-বাংলার প্রতিটি ইঞ্চি হয়ে ওঠে সাবেক ক্রিকেটারদের মিলনমেলার মঞ্চ। এবারও তার ব্যতিক্রম ছিল না। শনিবার দুভাগে ভাগ হয়ে লড়েছেন কয়েক প্রজন্মের তারকা সব সাবেক ক্রিকেটাররা। নেতৃত্বে ছিলেন দেশের দুই কিংবদন্তি ক্রিকেটার আকরাম খান ও আমিনুল ইসলাম বুলবুল। আকরাম ছিলেন শহীদ মোশতাক একাদশের নেতৃত্বে, আর শহীদ জুয়েল একাদশের নেতৃত্বে দেশের অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি হাঁকানো বুলবুল। হার-জিতের ঊর্ধ্বের প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচটিতে ৪৬ রানে জিতেছে বুলবুলের দল।

মিরপুর স্টেডিয়ামের গ্যালারির একটি অংশের নামকরণও করা হয়েছে দুই বীর শহীদের স্মৃতিতে। প্রতি ডিসেম্বরে যখন শহীদ জুয়েল-শহীদ মোশতাক প্রীতি ম্যাচের আয়োজনে হয়; হয়ত আজাদ, বদি, আলতাফ মাহমুদদের নিয়ে গ্যালারির কোন এক অংশে বসে থাকেন শহীদ মোশতাক আর শহীদ জুয়েল। তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করেন উত্তরাধিকারীদের প্রগাঢ় ভালোবাসা। বিজয়ীর বেশে তাদের এই ফেরাটা তো অন্তহীনই।








