মালনীছড়া চা বাগানের কাহিনী প্রথম জানতে পারি কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের ‘বাগানের নাম মালনীছড়া’ উপন্যাস থেকে। পরে এই উপন্যাসটি নিয়ে একটি নাটক ও প্রচারিত হয়েছিল বিটিভিতে। অভিনয় করেছিলেন শংকর সাওজাল, কাজী উৎপলসহ অনেকেই।
১৮৫৪ সালে এই চা বাগানের মাধ্যমেই উপমহাদেশে প্রথম চা চাষ শুরু হয়। অসম্ভব সুন্দর এই বাগানটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি।আকাশপথে যারা সিলেটে আসেন তাদের প্রথমেই স্বাগত জানায় এই চা-বাগান। বাগানটির অদ্ভূত সুন্দরের মায়ায় পড়েছিলেন অনেক বিদেশি। গাড়ি থামিয়ে তারা দাঁড়িয়েছেন বাগানের পাশে।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাস প্লেন থেকে নেমে বাগানের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে বলেছিলেন, পৃথিবী এতো সুন্দর যে মালনীছড়া বাগান না দেখলে তা বোঝা যাবে না।
১৯৭১ সালে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের খনির মাঝেই এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় পাক বাহিনী। সিলেট শহরে তখন চলছে পুরোদমে প্রতিরোধ যুদ্ধ। পাকিস্তানি মেজর সরফরাজের নেতৃত্বে পাকবাহিনীর একটি প্লাটুন দখল নেয় চা বাগানটি।
৬ এপ্রিল বিকাল সাড়ে চারটার দিকে মালনীছড়া চা বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপকের বাসভবন পাকিস্তানিরা ঘেরাও করে। শওকত নওয়াজ তখন এই বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক। তিনি ছিলেন একজন প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক মানুষ, অকুণ্ঠ সমর্থন করছিলেন অসহযোগ আন্দোলনকে। উল্লেখ্য, ১৮৫৪ সালে স্থাপিত বাংলাদেশের প্রথম চা বাগান হিসেবে স্বীকৃত এই মালনীছড়া চা বাগানের মালিকানা ১৯৭১ সালে ডানকান ব্রাদার্স লিমিটেড এর হাতে ছিল।
২৬ মার্চ শওকত নওয়াজের ছোট ভাই শাহনেওয়াজ এবং তার দুই বন্ধু মেজবাহউদ্দিন ও আব্দুল কাদের তার বাসায় উঠেন। চা বাগানের তখন পাকিস্তানি সৈন্যরা অবস্থান করছে; মেজর সরফরাজ একটি লাল গাড়িতে চড়ে টহল দিত পুরো এলাকাজুড়ে। অনেকেই তখন শওকত নওয়াজকে উপদেশ দিত বাগান ছেড়ে পালিয়ে যেতে, কিন্তু তাকে রাজি করানো যায়নি।

৬ এপ্রিল তারিখে তার বাসভবন থেকে শওকত নওয়াজ, তার ছোট ভাই ও দুই বন্ধু মেজবাহউদ্দিন ও আব্দুল কাদেরসহ আরো ছয়জন অধীনস্থ কর্মচারীকের ধরে আনে।বাগানের ভেতর তখন কামানের গর্জনে অন্যান্য শ্রমিকেরা প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াতে থাকে দিগ্বিদিক। বন্দী এই ১০ জনকে অতঃপর একই স্থানে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্থানি পশুরা। বিজয়ের পর বধ্যভূমি থেকে সন্তানের কঙ্কাল উদ্ধার করেন শওকত নওয়াজের বাবা।
শওকত নওয়াজ মার্চ মাসে তার বোনের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠির কিছু অংশ তার কবরের গায়েও লেখা আছে,
‘… যদি আমরা বেঁচে থাকি তবে দেখা হবে। আর দেশের জন্য যদি প্রাণ হারাই, তার জন্যে দুঃখ নাই। তবে ভীরু কাপুরুষের মতো মরবো না। … আমরা এখান থেকে যতদূর সম্ভব দেশের কাজ করে যাব।’
‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান লেখা আছে অশ্রুজলে’……………………………
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








