গত ৩০ জুলাই সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটির (কমিটি অ্যাগেইনস্ট টর্চার) সভায় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা, সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং এই ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে প্রিয়া সাহা নামে একজন বাংলাদেশির অভিযোগ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার দেশত্যাগ, আলোকচিত্রী শহীদুল আলমের বিরুদ্ধে মামলাসহ নানা বিষয়ে অজস্র প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে এবং বালাদেশের তরফে আইনমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসব প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এই প্রশ্নোত্তরের তাৎপর্য কী এর দ্বারা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কি কিছুটা ক্ষুণ্ন হলো?
ওই সভায় ঘুরেফিরে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর জবাবদিহিতা না থাকার বিষয়টি ঘুরেফিরে এসেছে। ২০১৩ সালের নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনের বেশ কিছু দুর্বলতার দিকও তুলে ধরা হয়েছে। এমন প্রশ্নও তোলা হয়েছে যে, পুলিশ কি এতটাই স্বাধীন যে রাষ্ট্রের ভেতরে তারা আরেকটি রাষ্ট্র?
কমিটির সদস্যরা বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের কাছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর মধ্যে র্যাবের ভূমিকা এবং কার্যত দায়মুক্তির বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করেন। তারা হেফাজত ও রিমান্ডে নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, অঘোষিত আটক রাখা, গুম, কারাগারের দুরবস্থা, বিচারকদের স্বাধীনতা, নির্বাচনী সহিংসতা, নাগরিককে ভোটাধিকার বঞ্চিত করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় একশো প্রশ্ন করেন।
এটি এক অর্থে ইতিবাচক এ কারণে যে, এ ধরনের প্রশ্নোত্তর বা শুনানি অর্থাৎ যাকে অনেক সময় ‘স্টেট পার্টি হিয়ারিং’ বলা হয়, এর মধ্য দিয়ে বস্তুত রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়। রাষ্ট্র যেমন অপরাধীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনে, তেমনি রাষ্ট্র নিজেও জবাবদিহিতার বাইরে নয়। এখানে রাষ্ট্র মানে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। অর্থাৎ প্রত্যেক রাষ্ট্র বা সরকার তার নাগরিকদের সুরক্ষা তথা তাদের মানবাধিকার রক্ষায় অঙ্গীকারাবদ্ধ। সেই অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি তারা কতটুকু পূরণ করছে তার একটি পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন। ফলে জাতিসংঘের এই নির্যাতনবিরোধী কমিটি বা এরকম আন্তর্জাতিক ফোরামে সেই পর্যালোচনা বা আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে যেসব প্রশ্ন ওঠে, তার একটা জবাব দেয়ারও সুযোগ তৈরি হয়।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৯৮ সালে যখন জাতিসংঘের এই কমিটি গঠন করা হয়, তখন কথা ছিল সদস্য রাষ্ট্রগুলো প্রতি চার বছর অন্তর তার দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটা প্রতিবেদন দেবে। কিন্তু গত ২১ বছরে বাংলাদেশ কোনো প্রতিবেদন দেয়নি। প্রথমবারের মতো গত ২৩ জুলাই একটি প্রতিবেদন দেয়। পাশাপাশি ২১টি মানবাধিকার সংগঠনও স্বতন্ত্রভাবে এবং ৫টি আন্তর্জাতিক সংগঠন যৌথভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্ট দেয়। ফলে ‘বেটার লেট দ্যান নেভার’ যে, ২১ বছর পরে হলেও এরকম একটি আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটা প্রতিবেদন দিয়েছে।
বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে অনেক সনদ ও কনভেনেশনে অনুস্বাক্ষর ও সমর্থন করেছে। স্বাক্ষর ও সমর্থনের অর্থ হলো বাংলাদেশ ওইসব বিধান মেনে চলায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফলে জেনেভায় নির্যাতনবিরোধী কমিটির সভায় বাংলাদেশকে যেসব প্রশ্ন করা হয়েছে তার জবাব দেয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একধরনের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছে। কিছু বিষয়ে যদি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভুল ধারণা বিদ্যমান থাকে, বাংলাদেশ তারও ব্যাখ্যা দিতে পেরেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন ইস্যুতে দেশে ও দেশের বাইরে নানারকম মিথ আছে, যেগুলোর সঙ্গে বাস্তবতার মিল কম। ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়ে প্রিয়া সাহার অভিযোগ কিংবা বিদেশি গণমাধ্যমে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন সম্পর্কে যেসব অতিরঞ্জিত সংবাদ ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়, জাতিসংঘের এই ফোরামে সেই বিষয়টিও পরিস্কার করার সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
সব প্রশ্নের জবাব যে সবার পছন্দ হবে এমনটা নাও হতে পারে। কিন্তু দেশের ভেতরে বসে যেসব প্রশ্ন করা কঠিন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যখন সেগুলো উত্থাপিত হয়, তখন সরকারের দায়িত্ব হয় তার জবাব দেয়া। এটি রেকর্ড থাকে। ফলে ভবিষ্যতে এসব প্রসঙ্গে প্রশ্ন উত্থাপিত হলে বাংলাদেশ এই বৈঠক বা শুনানির রেফারেন্স দিতে পারবে। সাথে সাথে যেসব দুর্বলতা চিহ্নিত হলো সেগুলো দুর করার একটা উদ্যোগও রাষ্ট্র গ্রহণ করতে পারে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্যও জেনেভার এই সভাটি একটি বড় বার্তা যে, তাদের মানবাধিকারের প্রশ্নে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। তারা যে জবাবদিহিতার ঊর্ধে নয়, সেই উপলব্ধি আসতে হবে। কোথায় কোথায় তাদের দুর্বলতা আছে এবং আইনের বরখেলাপ হচ্ছে, এই শুনানি সে বিষয়ে তাদের আরও বেশি দায়িত্বশীল করবে বলে আশা করা যায়।
সরকার বা রাষ্ট্র যদি নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি না করে তাহলে তার পক্ষে নাগরিকের মানবাধিকার রক্ষা করা কঠিন। তবে এ কথাও ঠিক যে, রাষ্ট্রের সব নাগরিকের মানবাধিকার একশো ভাগ রক্ষা করা খুব কঠিন। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান রাষ্ট্র যেমন সুইডেন, ডেনমার্ক বা নরওয়ের মতো দেশে নাগরিকের মানবাধিকারের যে চিত্র, অন্য রাষ্ট্রের সাথে অনেক সময় তা মিলবে না। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়। প্রতিবেশী ভারত-পাকিস্তানসহ কমবেশি সব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ ওঠে। ফলে এই অভিযোগ কতটা ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা যায়, সেটিই চ্যালেঞ্জ।
জেনেভায় এবারের শুনানিতে বাংলাদেশের মানবাধিকারের প্রশ্নে ঘুরেফিরে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন বা সমালোচনা এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে। আইনমন্ত্রী বা সরকারের অন্য মন্ত্রীরা আত্মপক্ষ সমর্থন করে এর জবাব দিয়েছেন ঠিকই; কিন্তু এটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, এসব জবাবের সাথে বাস্তবতার যথেষ্ট ফারাকও রয়েছে। বক্তব্য যাই দেয়া হোক না কেন, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সবকিছু গোপন করার সুযোগ নেই।
তবে জেনেভার এই শুনানির একটি বড় দুর্বলতা হলো, এখানে বাংলাদেশ সরকারের তরফে একটি প্রতিবেদন দেয়া হলেও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কোনো রিপোর্ট দেয়নি। অথচ মূল দায়িত্বটা ছিল তাদেরই। তারা কেন রিপোর্ট দেয়নি সেটির একটি জবাব অবশ্য কমিশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দিয়েছেন। কিন্তু এরকম একটি আন্তর্জাতিক ফোরামে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কোনো প্রতিবেদন থাকবে না, সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। তবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কতটুকু স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে বা করতে পারছে কিংবা তাকে কতটুকু স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বস্তুত জেনেভায় কী আলোচনা হলো, তার পাশাপাশি আমাদের এখন এই প্রশ্নটিও করা দরকার।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







