১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের মহান আত্মত্যাগের ফলেই অর্জিত হয়েছে আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। ভাষা শহীদরা কাউকে আমাদের মায়ের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে দেয়নি। তারা নিজেদের প্রাণ দিয়ে রক্ষা করেছে বাংলা ভাষাকে। তাদের মত করে কি কখনও দেশকে ভালবাসতে আমরা পারব? সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও নাম না জানা অনেকের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এ ভাষার আজকের বর্তমান প্রজন্ম কতটা সম্মান করি? প্রশ্ন গুলো আমাকে বার বার তাড়া দিয়ে যায়।
আমাদের বর্তমান জীবনে কতটা আছে একুশের প্রভাব? বছরের এই একটি বিশেষ দিন ছাড়া আমরা তাদের ত্যাগের কথা মনে কি রাখি? ১৯৫২ এর তারুণ্যের আন্দোলনের মূল বিষয় ছিল বাংলা ভাষা। বর্তমান তারুণ্যের কাছে কি বাংলা ভাষার ততটা মর্যাদা আছে যতটা ৫২’ এর তারুণ্যের ছিল? বাংলা ভাষা আমাদের গৌরব অথচ আমরা এই ভাষার অপমান দেখি বিভিন্ন সময়ে।বিভিন্ন ভাবে।
প্রায়ই দেখি বিভিন্ন স্কুল-কলেজ এর অনুষ্ঠানে হিন্দি গান বাজানো হয়। ভাবতেই অবাক লাগে সম্মানিত শিক্ষকদের সামনে কিভাবে এসব হয়? বিজয় দিবস উদযাপন করা হয় হিন্দি গান দিয়ে। বিজয় দিবসে যদি হিন্দি গান হয়, তাহলে আমাদের ভাষা শহীদরা কেন প্রাণ দিয়েছিল? আর এসব বন্ধ করতে কেউ এগিয়ে আসেনা। আমাদের দায়িত্ব কি শুধু একুশে ফেব্রুয়ারিতে খালি পায়ে হেঁটে শহীদ মিনারের মূল বেদিতে ফুল দেয়া? আবার সেই শহীদ মিনারে অন্যান্য দিনগুলিতে জুতা পায়ে বসে থাকা? বন্ধুবান্ধব মিলে আড্ডা দেওয়া! এসব কোন ছোট ব্যাপার নয় যে আমাদের শিশুরা যারা বাংলা ভাষা শিখার আগে হিন্দি ভাষা শিখে ফেলছে। এমনটা হতে থাকলে তাদের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কিভাবে বাড়বে? বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পেতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। রক্তে রঞ্জিত হয়েছে ঢাকার রাজপথ।
ভাষার জন্য এই আত্মত্যাগ ও আন্দোলনকে পৃথিবী স্বীকৃতি দিয়েছে। ভাবতে ভালো লাগে, শিহরণ জাগে- ভাষার জন্য আমাদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়ে বিশ্ববাসী প্রতিবছর ‘একুশের’ দিনটি পালন করছে, পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আমরা অনেক আগে থেকেই ফেব্রুয়ারি ও একুশকে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পালনের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকি। মাসের কোন কোন দিন বইমেলায় যাওয়া হবে, একুশের প্রত্যুষে শহীদ বেদিতে কিভাবে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করা হবে এসব চিন্তা সবাইকে ভীষণভাবে আন্দোলিত করে। ছোট্ট শিশুসহ বয়োবৃদ্ধ সবার তাঁত-সুতির সাদা-কালো কাপড়ে বর্ণমালা খচিত পোশাক পরে হাতে ফুল, ফুলের তোড়া নিয়ে প্রত্যুষে শিশিরস্নাত পথ, ঘাসের চত্বর মাড়িয়ে শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন- এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। আমার স্মৃতি গুলো ঠিক এমনই। কোন অমিল খুঁজে পাই না। কিন্তু এরপর শহীদ মিনার এলাকা ছেড়ে যতই দূরে যেতে থাকি, বাংলা ভাষার প্রতি, ভাষা শহীদদের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারগুলো ক্রমেই যেন দূরে সরে যেতে থাকে। ফিকে হয়ে যায় আমাদের চেতনাগুলো। সবকিছু ভুলে ডুবে যাই নৈমিত্তিক কাজে।
ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক পর্যায়ে ও কর্মক্ষেত্রে দৈনন্দিন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় বাংলা ভাষার প্রতি অনেক ক্ষেত্রে যথাযোগ্য সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা তো প্রকাশ পায়ই না, কখনও কখনও চরম অবজ্ঞার ভাবও ফুটে ওঠে। যা দেখে ব্যথিত হই। আধুনিক বা অতি আধুনিক হওয়ার জন্য শহরে বসবাসকারী কারও কারও দ্বারা ইদানীং যে বিষয় ও মূল্যবোধগুলো প্রথমেই আক্রান্ত হয়, বাংলা ভাষা সেগুলোর শীর্ষে। আমাদের সন্তান-সন্ততি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়বে, অনর্গল ইংরেজি বলতে পারবে, এটা তো আমাদের জন্য আনন্দ ও গর্বের বিষয়। তবে তা অবশ্যই বাংলা ভাষাকে অবমূল্যায়ন করে নয়। অনেক অভিভাবককে অহরহ বলতে শুনি- ‘আমার সন্তান তো বাংলা জানে না।’ এই ‘জানে না’ বলার মধ্যে একধরনের গর্ববোধ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা থাকে। হ্যাঁ, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ঠিকভাবে বাংলা পড়ানো হয় না বলে অনেকেই ভালোভাবে বাংলা লিখতে ও পড়তে পারে না। কিন্তু ‘বাংলা জানে না’- এটার মধ্যে গর্ব করার কিছু নেই। এটা লজ্জার! গালবরে বলারও কোনো বিষয় নয় এটি। এই ‘বাংলা জানে না’ বাক্যটি প্রয়োগ করে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়- যেহেতু ‘বাংলা জানে না’, সেহেতু ওরা ‘ইংরেজির পণ্ডিত’। হায়রে আমাদের মানসিকতা! এর শেষ কোথায় হবে জানি না।
এ দেশের আলো-বাতাসে বেড়ে উঠে যারা বাংলা লিখতে-পড়তে জানবে না, তারা কিভাবে এ দেশের মা, মাটি মানুষের হৃদয়স্পন্দন অনুভব করবে? কোন যোগ্যতা নিয়ে দেশমাতৃকার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবে? কিভাবে দেশের প্রতি তাদের মমত্ববোধ আসবে? ভাষাকে তার চলার পথে অনেক কিছু অঙ্গীভূত করেই এগিয়ে যেতে হয়। কার্যকর ভাষা হিসেবে এর প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হয়। দীর্ঘদিনের চর্চিত যে শব্দ, শব্দ গুচ্ছ মানুষ গ্রহণ করে নিচ্ছে, আমাদের মুখের ভাষায় পরিণত হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে বিরোধের কোনো কারণ নেই। ভাষাকে গতিময় ও শ্রুতিমধুর করতে প্রতিনিয়ত দৈনন্দিন ব্যবহারযোগ্য শব্দ সংখ্যা বাড়াতে হয়, নতুন নতুন শব্দকে জায়গা করে দিতে হয়। ইংরেজি ভাষায় নিয়মিত নতুন শব্দ যুক্ত হচ্ছে। কোনো একটা শব্দের একাধিক প্রতিশব্দ প্রকৃতপক্ষে ভাষার শ্রীবৃদ্ধিই ঘটিয়ে থাকে। অনুবাদকর্মের নিত্যনতুন সংযোজনা ভাষাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে ও এর পরিধি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। কোনো ভাষা জ্ঞানতৃষ্ণা মেটানোর স্বয়ংসম্পূর্ণ মাধ্যম হতে না পারলে তা প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে ফেলে। পৃথিবীর বহু ভাষাই তার উপযোগিতা হারিয়ে কালের গর্ভে নিঃশেষ হয়ে গেছে। এই খবর অনেকেই জানে না।
আমাদের কাজেকর্মে, আচরণে ও ইঙ্গিতে বাংলা ভাষার প্রতি সৎ ও দায়িত্বশীল থাকতে হবে। ভাষাকে আরও সমৃদ্ধ ও বিস্তৃত করার চেষ্টায় নিজেদের নিয়োজিত রাখতে হবে। সবার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টায় বিশ্বের শীর্ষ ভাষায় পরিণত হোক প্রিয় বাংলা ভাষা। কারণ, বাংলা যে আমাদের মায়ের ভাষা। বাংলা ভাষা যে আমাদের চির অহংকার! যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বুকে ধারণ করবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







