জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিউট ও হাসপাতালের চার ঘর জেরা পেরিয়ে দ্বিজেন টুডু’র ওয়ার্ডে প্রবেশ করে দেখলাম দিনজেন শুয়ে আছে। না, মহাশ্বেতা দেবীর সেই বিরসা মুন্ডা নয়; পৃথিবীর নিরীহ গরীবরা যেমন হয়, ঠিক তেমন এক মানুষ নিথর শুয়ে আছে আঘাতে ফোলা ও লাল টকটকে চোখ নিয়ে। পাশে অসহায় বসে তার বোন মার্থা টুডু। মার্থার চকচকে চোখে অশ্রু। পীড়ণের কষ্ট ঠিকরে পড়ছে সেই চোখ থেকে।
দিনজেন টুডু’র পাশে বসে তার গায়ে হাত রাখলে তিনি কেঁদে ফেলেন। বলেন, দেখেন কী করছে! দেখি তার শরীর জুড়ে ক্ষত। ক্ষত চোখ ও দৃষ্টিতে। মনে বোধ হয় আরো অধিক। কেঁদে কেঁদে বলেন, আমরা পানি, আগুন নয় যে। আমরা মার খাই, কাউরে মার দেই না। জন্মের পর থেকে দেখতেছি নির্যাতন আর নির্যাতন।

ঠিক তখন মনে হলো সাঁওতালরা আসলেই পানি। আর পানির তাপ ধারণ ক্ষমতা বেশি, তাপ সইতে সইতে একসময় ফুটতে শুরু করে। ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সাঁওতাল কৃষকরাই প্রথম বিদ্রোহ করে। তাদের বিদ্রোহ ছিলো প্রথমে শান্তিপূর্ণ। ভারতের ইতিহাসে প্রথম গণ পদযাত্রার মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে সাঁওতালরাই। ওই বছর ৩০ জুন প্রায় ত্রিশ হাজার সাঁওতাল কৃষক বীরভূমের ভগনাডিহি থেকে সমতলভূমির উপর দিয়ে কলকাতা অভিমুখে পদযাত্রা করে।
১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে বিবেচ্য। ব্রিটিশদের গোলা-বন্দুকের বিরুদ্ধে তারা কিন্তু ঠিকই দাঁড়িয়েছিলো সামান্য তীর-ধনুক নিয়ে। অন্যায়ের প্রতিবাদের যে সাহস সাঁওতালদের আছে, আছে মেরুদণ্ড শক্ত করে আমৃত্যু অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সে বোধই বোধ করি দিনজেনের জ্বরতপ্ত শরীর কেঁপে কেঁপে জানান দিচ্ছিলো।
দিনজেন জানান, আমরা ঢাকায় আসছি। মানব বন্ধন করছি। কেউ আমাদের কথা শোনে নাই। আমরা কি তবে এই বাংলার কেউ নই?
বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। কতোটা পীড়ণ শেষে, কতোটা অসহায় হলে মানুষ সন্দিগ্ধ হয় নিজের অস্তিত্ব নিয়ে!
আঘাতে রক্তলাল চোখ নিয়ে তাকান দিনজেন। প্রশ্ন তোলেন, কোথায় যাবেন তারা? কার কাছে যাবেন?
উত্তর দিতে পারি না। সত্যিই তো। কে আছে তাদের? ইতিহাস বলে ওদের ইতিহাস ছাড়া আর কিছু নাই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








