এবছর গবেষণায় একুশে পদক পাচ্ছেন সৈয়দ আকরাম হোসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আকরম হোসেন ছাত্রী হিসেবে পেয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। ‘বিনয়ী ও নম্র-ভদ্র পরিবারের সন্তান’ হিসেবে জানা শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে চিনতে পারার ঘটনাটি তিনি জানিয়েছিলেন শিক্ষার্থীদের। বিনয় ও সৌজন্যতাবোধের অসামান্য উদাহরণ সেই ঘটনাটির কথা ফেসবুকে লিখেছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জয়দেব নন্দী।
“একুশে পদক পেতে যাচ্ছেন আমার শিক্ষাগুরু সৈয়দ আকরম হোসেন।” শিরোনামে জয়দেব নন্দী লিখেন,
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন; এম.এ শ্রেণীতে তিনি আমাদের উপন্যাস পড়াতেন। স্যারের মুখে শোনা, সত্য মনে হওয়া ঘটনাটি জানতে পারি-আমার সৃষ্ট একটি অনভিপ্রেত ঘটনার মাধ্যমে।
আমার বন্ধু অনিমেষ প্রতিদিন দেরিতে ক্লাসে ঢুকতো। ক্লাসে দেরি করে ঢুকলেও ভালো আবৃত্তি করার কারণে স্যারের কাছে অনিমেষ পার পেয়ে যেতো। হঠাৎ আমি একদিন অনিমেষ হয়ে গেলাম; কিন্তু পার পাইনি। সকাল ১০ টায় আকরম স্যারের টিউটোরিয়াল ক্লাস। স্যারের নিজ কক্ষে স্যার টিউটোরিয়াল ক্লাস নিতেন। এতোদিনে স্যারের প্রতি ভয়, ভালোবাসা ও ভক্তি জন্মে গেছে তাঁর অসাধারণ বাচনভঙ্গি, দৃঢ় ভাব-গাম্ভীর্য, বিষয়ের গভীরে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ও চিন্তাকে শাণিত করার মহামন্ত্র দানের জন্য। ঘুম থেকে দেরি করে উঠবার কারণে ক্লাসে যেতে ১০ মিনিট দেরি হলো। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে স্যারের কক্ষের সামনে গেলাম। ঘেমে ততক্ষণে জামা ভিজে গেছে। দরজা আলগা করতেই স্যারের রুদ্রমূর্তি। আমার আগেই অনিমেষ ক্লাসে আসছে দেখেই আমি ভ্যাবাচ্যাকা বনে গেলাম। অবস্থা দেখে অনিমেষ মিচকি মিচকি হাসছে। আমার হযবরল অবস্থা দেখে স্যার গম্ভীর গলায় বলে উঠলো, ‘মিছিল করে আসলে নাকি? নাকি মারামারি করে আসলে?’ আমার কোনো প্রত্যুত্তর নেই। স্যার রেগে ক্লাস নেয়া বাদ দিয়ে আমাকে বয়ান দিতে থাকলেন। অন্য সহপাঠীরা আমার দিকে তাকিয়ে গোঁফের তলে হাসছে দেখে আমার লজ্জা ও রাগ দুটোই হচ্ছিল। স্যার বয়ান দিতে দিতে উচ্চকণ্ঠে বললেন, বসতে পারো। ভয় ও লজ্জা সাথে নিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসলাম। আমার ত্রিভঙ্গ অবস্থা দেখে স্যার নরম স্বরে বললেন,“দেখো বাবা, তুমি যে বেতের চেয়ারে বসে আছো; ওই বেতের চেয়ারেই বসে নিয়মিত ক্লাস করতো জাতির জনকের মেয়ে শেখ হাসিনা। সেও তো ছাত্ররাজনীতি করতো। কোনোদিন তো তাকে ক্লাস ফাঁকি দিতে দেখিনি, বা ক্লাসে দেরি করে আসতেও দেখিনি। বিনয়ী ও নম্র-ভদ্র পরিবারের সন্তান হিসেবে তাকে আমি জানতাম; কিন্তু অনেক দেরিতে জানতে পারি যে, সে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে। টিউটোরিয়াল ক্লাস চলাকালীন হাসিনা একদিন আমাকে বললো, স্যার আমাকে একটু জরুরী বাসায় যেতে হবে। আপনি যাবার অনুমতি দিলে আমি বাসায় যেতাম। আমি রেগে বললাম, ক্লাস শেষ করে গেলে কি হয় না? হাসিনা কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকলো। হাসিনার অবস্থা দেখে আমি একটু নরম হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার বাসা কোথায়?

হাসিনা নিচু স্বরে বললো, স্যার ধানমন্ডি। আমি মনে মনে বললাম, বাংলা বিভাগে পড়ে…বাসা ধানমন্ডি? কৌতূহলী হয়ে আবারো জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার আব্বা কি করেন? হাসিনা বললো, আব্বা রাজনীতি করেন। কৌতূহল আমার আরো বেড়ে গেলো।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার আব্বার নাম কি?
হাসিনা ভয়ে ভয়ে বললো, শেখ মুজিবুর রহমান।
কিছুক্ষণের জন্য মেয়েটা আমাকে চুপ থাকতে বাধ্য করলো।”
আমরা স্যারের কথাগুলো অবাক বিস্ময়ে শুধু শুনলাম। স্যার শুধু বললেন, যাও আগামীদিন দেখা হবে। স্যারের বর্ণিত ওই সত্য ঘটনা আজো মনে করে প্রাণিত হই, প্রকৃত মানুষ হবার আকাঙ্ক্ষা আরো তীব্র হয়ে ওঠে। স্যারকে শুধু বলতে ইচ্ছে করে, স্যার আমরা মানুষ হতে চাই। দোয়া করবেন।”
বিভিন্নক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সরকার দেশের ১৭ জন বিশিষ্ট নাগরিককে ২০১৭ সালের একুশে পদক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের হাতে পদক তুলে দেবেন।







