২০১৭ পেরিয়ে আমরা ইতিমধ্যে পদার্পণ করেছি ২০১৮ সালে, নতুন বছরকে বরণ করতে আমাদের উৎসাহ উদ্দীপনার কমতি ছিল না। সবাই হাসিমুখে পুরাতনকে বিদায় দিয়ে নতুনকে বরণ করে নিয়েছি। পাশাপাশি শপথও নিয়েছি জীবনকে নতুন করে সাজানোর, পুরাতন জঞ্জালকে পেছনে ফেলে জীবনকে ঢেলে সাজানোর। যে জীবন অন্যদের স্বপ্ন দেখাবে, নিজেদের জীবনে পাথেয়স্বরূপ হিসেবে বিবেচিত হবে সাফল্যের স্রোতধারায়। আসলে কে না সফল হতে চায়? প্রকৃতিও সফলদের অনুসরণ করে, মূল্যায়ন করে, জাগতিক সমাজব্যবস্থায় সফলদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সকলেই। কিন্তু সফল হওয়ার জন্য যে নির্দিষ্ট রূপরেখা মেনে চলা আবশ্যক তা হয়তো সবাই মেনে চলতে পারে না। যারা পারে তারাই সফল হয়, আর যারা মেনে চলতে পারে না তারা ব্যর্থ হয়। কিন্তু সবাই সফল হতে চায়।
তরুণরা সময়ের চালিকাশক্তি, সময় যেমন তরুণদের দিকে তাকিয়ে থাকে ঠিক তেমনিও সভ্যতার বিকাশও তরুণদের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। প্রযুক্তিগত সমাজব্যবস্থায় ও ইন্টারনেট বিশ্বে তরুণদের পেশাগত বৈচিত্র্যতা সাফল্যের ক্ষেত্রকে দিন দিন বিস্তৃত করেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তরুণদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সেক্টরে তরুণদের ইতিবাচক কার্যক্রম সকলকে আশাবাদি করে তুলেছে, অন্যদেরকে করেছে অনুপ্রাণিত। এই প্রতিবেদনটি তৈরিতে আমি কয়েকজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ তরুণীদের সাথে কথা বলেছি। বিভিন্ন পেশায় জড়িত এবং নতুন করে জীবনকে সাজাতে চাচ্ছেন এমন কয়েকজনের সাথে কথা বলেছি। নতুন বছরে আপনি কিভাবে সফল হতে চান এই একটি প্রশ্নের মাধ্যমে আমি উত্তর সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছি।
একজন তরুণ পুলিশ অফিসারের কাছে শুনতে চেয়েছিলাম আপনি কিভাবে নতুন বছরে সফল হতে চান। তিনি বলেন: ‘ইতিবাচক কাজের মাধ্যমে আমার পেশার মর্যাদাটাকে রুট লেভেল পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে চাই। পুলিশ-পাবলিক সম্পর্ককে জোরদার করার লক্ষ্যে আমার লেভেল থেকে যথাসম্ভব সর্বোচ্চ পরিশ্রম করে মানুষের সেবা করতে চাই।’ তিনি আরো উল্লেখ করেন: ‘খারাপ কোন কাজের সাথে জড়িত হব না, মানুষের সার্বিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাবো।’
একজন তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, নতুন বছরে আপনার প্রত্যাশা কি। তিনি বলেন: ‘নিরপেক্ষভাবে সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি ঘটনার সত্যানুসন্ধান করে প্রকৃত কারণের মূলোৎপাটন করা। সামাজিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধিকরণকল্পে সংবাদ পরিবেশন করে সামাজিক ও সামষ্টিক উদ্যোগ গ্রহণ করার প্রচেষ্টার মাধ্যমে সামাজিক অপসংস্কৃতি, কুসংস্কার, নৈরাজ্য দূর করার জন্য সার্বিক প্রত্যাশা থাকবে।’
গার্মেন্টেসের কিউসি ম্যানেজারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম নতুন বছরে আপনি কিভাবে সফলতা পেতে চান। তিনি সোজাসাপ্টা উত্তর দিলেন: প্রমোশন পেয়ে পদোন্নতি চান। আমি জিজ্ঞেস করেছি, আপনি পদোন্নতি পেতে কি কি করছেন। তিনি জানালেন, তিনি কয়েকটা বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ শুরু করেছেন এবং প্রশিক্ষণ সঠিকভাবে শেষ হলে কাজের দক্ষতা বৃদ্ধিসহ সাধারণ শ্রমিকদেরকে সহায়তা করতে পারবেন দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ সংক্রান্ত। তাহলেই প্রমোশন পাওয়া সহজতর হবে। গার্মেন্টস সেক্টর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ যোগ হয় প্রতিবছর। তিনি আশাবাদি তার মতো অনেক তরুণই সম্ভাবনাময় এই খাতের সাথে অতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির সচল চাকাকে আরো বেগবান ও বলিষ্ঠ করে তুলবে।
একজন প্রকৌশলী জানালেন, ২০১৮ সালে একটি স্থায়ী চাকুরি লাভের পাশাপাশি একটি উপন্যাসের কাজ শেষ করবেন। জিজ্ঞেস করলাম সে ক্ষেত্রে আপনার প্রস্তুতি কেমন। তিনি জানালেন, উপন্যাসের প্লট রেডি, কিছু ড্রাফট কাজ শেষ হয়েছে। অচিরেই কাজটা শেষ করে ছাপাতে দিবেন। আর স্থায়ী চাকুরির বিষয়ে তিনি নিজেকে তৈরি করেছেন, আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে চাকুরির জন্য যোগ্যতা অর্জন করার জন্য প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেছেন। অন্য একজন তরুণ উদ্যোক্তা জানালেন, তিনি আইসিটি মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রজেক্ট পেয়েছেন এবং ২০১৮ সালের মধ্যে যথাযথভাবে শেষ করতে পারলেই তিনি সফলতার ছোঁয়া পাবেন এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্য নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন।

একজন তরুণী জানালেন তিনি ১ম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা হতে ইচ্ছুক এবং তদার্থে তিনি সরকারি চাকুরি পাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি হচ্ছেন। তিনি আশাবাদি, প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে পারলে যে কোন একটি ভাল চাকুরি পেয়ে যাবেন। অপর এক তরুণী ফিল্ম বানানোর স্বপ্নের কথা বললেন। তিনি স্ক্রিপ্ট ইতিমধ্যে কয়েকজনকে দেখিয়ে তৈরি করেছেন এবং অনেকেই বাহবা দিয়েছেন। এখন কেবল অপেক্ষা অভিনেতা অভিনেত্রী নির্বাচনের মাধ্যমে কাজ শুরুর। প্রডিউসারও ঠিক করে ফেলেছেন, মৌলিক গল্পের মাধ্যমে একটি সৃষ্টিশীল চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বাসনা থেকেই তার ছবি নির্মাণ। আরেকজন তরুণ জানালেন, গবেষণাধর্মী কাজের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তিনি আরো জানালেন, গবেষণার বিশদ সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশে। ব্যতিক্রমী কাজের মাধ্যমে তিনি তাঁর একাডেমিক জ্ঞানকে কাজে লাগাতে চান। স্বপ্নবাজ এক তরুণ লেখক জানালেন ২০১৮ সালে তিনি একটি বই বের করতে যাচ্ছেন। বইয়ের কাজের বেশির ভাগই সম্পন্ন, বাকি আছে প্রুফ দেখা ও অন্যান্য ছাপা সংক্রান্ত কাজ। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে তিনি এই বছরে বইটি বের করবেন।
একজন তরুণ ছাত্রনেতা জানালেন, ক্যাম্পাসে ছাত্রদের দাবি দাওয়া আদায়ে নিয়মিত আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন। যৌক্তিক অধিকার ও দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাবেন। সে ক্ষেত্রে কোন ধরনের সহিংস আচরণ কিংবা অনৈতিক কাজের সাথে নিজে জড়িত হবেন না এবং সংগঠনের কোন নেতাকর্মী যেন অসৎ আচরণ না করতে পারে সে ব্যাপারে সোচ্চার থাকবেন সর্বদা। ছাত্র রাজনীতির উজ্জ্বলতাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ইতিবাচক কাজ করে যাবেন বছরব্যাপী।
কয়েকজন তরুণ-তরুণীদের কাছ থেকে তাদের প্রত্যাশা সম্বন্ধে জানতে চাওয়ার মাধ্যমে ২০১৮ সালে তরুণদের বৈচিত্র্যময় পছন্দের তথা পেশাগত দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে সফলতার চিহ্ন আঁকার পরিকল্পনা করেছেন। সকল তরুণরাই সফল হোক, গড়ে তুলুক সত্যিকারের বাংলাদেশ এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের। তবে তার জন্য পরিকল্পনা মাফিক কাজ করে যেতে হবে সকলকে। ব্যর্থতার খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের। ছোট ছোট পা ফেলে আমাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। পণ করতে হবে আমি বা আমরা যে কাজটি করতে চাই কিংবা ভালবাসি সেই কাজটিকে যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রত্যেকদিন রুটিনমাফিক কাজ করা উচিত। অর্থাৎ প্রত্যেক দিন আমি নতুন কিছু শিখতে চাই বা শেখা উচিত। কোন কাজকেই হেয় প্রতিপন্ন করা ঠিক নয়, নিজের কাজটাকে দায়িত্ব মনে করে সম্মানের সহিত শেষ করা কর্তব্য।
২০১৮ সনের বছর হোক তরুণদের, তরুণদের সফলতার বছর। নতুন নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রায়োগিক দক্ষতা দেখানোর কৌশলে নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে তরুণদেরকে সফলতার নেশায়। তবে তরুণদের কাজের পরিবেশ নির্ভীগ্ন ও সংকটমুক্ত রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তরুণরা জাগলেই বাংলাদেশ জাগবে, তরুণরা কর্মঠ থাকলে সচল থাকবে আমাদের অর্থনীতি। বাংলাদেশের সকল তরুণের জন্য শুভকামনা এবং সাফল্যের ফুলঝুড়িতে ভরে উঠুক তরুণ প্রজন্ম।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







