ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মারধর ও চাপ দিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে।
শনিবার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি হলে মারধর ও চাপ প্রয়োগের এই ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান, হাজী মুহম্মদ মুহসীন ও শহীদুল্লাহ হলে এই ধরনের অভিযোগ উঠে।
হলগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদের স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহবুবুর রহমান সাজিদকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে মারধর করা হয়েছে।
শুক্রবার দিবাগত রাতে এস এম হলের ১১১ নম্বর কক্ষে রাতভর আটকে রেখে নির্যাতন করেছে হলের ছাত্রলীগ মনোনীত সাংস্কৃতিক সম্পাদক প্রার্থী মোস্তফা সরকার মিসাদসহ হল শাখার সাবেক নেতাকর্মীরা। একই সঙ্গে তাকে প্রায় তের ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতন শেষে শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে তাকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করে। পরে সাজিদ হল প্রাধ্যক্ষকে বিষয়টি অবহিত করলে তিনি তার প্রত্যাহারপত্র ছিঁড়ে ফেলেন।
মারধরের শিকার মাহবুবুর রহমান সাজিদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘আমি বইমেলার স্টলে কাজ করি। মেলা শেষে রাত ৯টার দিকে ছাত্রলীগ প্যানেলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোস্তফা সরকার মিসাদ, মিজান, মাসুদ তাকে মেলা থেকে ধরে নিয়ে আসে। পরে তারা আমাকে হলের ১১১ নম্বর রুমে নিয়ে আসে। সেখানে আমাকে আটকে রেখে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে চাপ প্রয়োগ করেন। আমি রাজী না হওয়ায় আমাকে মারধর করেন। প্রথমে আমাকে আঘাত করেন হল ছাত্রলীগের সাবেক নেতা অনিক। এরপর রাত দেড়টা পর্যন্ত সেখানে শারীরিক ও মানুষিক নির্যাতনের পর আমি প্রত্যাহার করতে রাজী হয়। পরে আমাকে সারারাত অনিকের কক্ষে আটকে রাখা হয়। পরে সকালে জোর করে হল অফিসে নিয়ে প্রত্যাহারপত্র লেখান আমাকে দিয়ে। কিন্তু আমি প্রাধ্যক্ষকে বিষয়টি জানালে তিনি আমার প্রত্যাহারপত্র ছিঁড়ে ফেলেন। এসময় তিনি ছাত্রলীগ মনোনীত হল সাধারণ সম্পাদক জুলিয়াস তালুকদার সিজারকে আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব দেন।’
এই বিষয়ে জুলিয়াস সিজার তালুকদার বলেন, আমি সকালে হল অফিসের পাশে অন্য কাজে গিয়ে ঘটনা শুনতে পারি। শুনেছি তাকে আটকে রেখে মারধর করা হয়েছে। নির্বাচন করার অধিকার সবারই রয়েছে। ঘটনা জানতে পেরে হল প্রাধ্যক্ষ তার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন। আমি সাজিদকে বলেছি পরবর্তীতে তার কোনো নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দেয় তাহলে আমি তার নিরাপত্তা দেবো।
এছাড়াও এসএম হলের সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী মেহেদী মাসুদ পিয়াসকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। তাকে খুঁজে না পেয়ে বাড়িতে ফোন দিয়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। পরবর্তীতে প্রত্যাহারের শেষ সময়ের দুই মিনিটি আগে তিনি প্রত্যাহার করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন এসএম হল সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী রামীম খান।
ছাত্রলীগের চাপে হল থেকে পালিয়েছেন সমাজসেবা সম্পাদক প্রার্থী শাকিকুল ইসলাম সাগর।
মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে প্রার্থিতা প্রত্যাহারে ছাত্রলীগের চাপ প্রয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। হল সংসদের স্বতন্ত্র সহ-সভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থীকে হুমকি দিয়েছেন হল সংসদের ছাত্রলীগ মনোনীত সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হাসিবুল হোসেন শান্ত। প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করলে নির্বাচনে জিতলেও হলে আসতে দেব না বলেও হুমকি দিয়েছেন তিনি।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে হাসিবুল হোসেন শান্ত সাংবাদিকদের বলেন, এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমাদের বিপরীত প্যানেলে যারা দাঁড়িয়েছে তারা নিজেদের যোগ্যতা বলেই দাঁড়িয়েছে। কাউকে হুমকি দেয়া হয়নি।
সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদের ডাকসু নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সঞ্জিত চন্দ্র দাস দুপুরে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে কাউকে জর-জবরদস্তি করা হয়নি। আমরা আমাদের দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বুঝিয়েছি প্রার্থীতা ফেরত নিতে।
অন্যান্যদের ব্যাপারে তিনি বলেন, ডাকসু সবার জন্য, সবারই এখানে প্রার্থী হওয়ার অধিকার আছে।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের চাপ প্রয়োগের প্রতিবাদে লিখিত অভিযোগ আসিফের:
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দ্বারা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্যাতন, চাপ প্রয়োগ ও হুমকি দিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের প্রতিবাদ জানিয়েছেন ডাকসুর স্বতন্ত্র সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী এম আর আসিফুর রহমান।
শনিবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন তিনি। একইসাথে ভোট গ্রহণেরর সময়সীমা সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত বাড়ানোর দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে এ আর এম আসিফুর রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার রয়েছে। আমি স্বতন্ত্রভাবে ডাকসু নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) অংশ নিচ্ছি।
‘‘ইতোমধ্যে বিভিন্ন হলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার লক্ষ্যে। এই মুহুর্তে ছাত্রলীগ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মারধর করে চাপ প্রয়োগ করছে। আমি এই ঘটনার প্রতিবাদ জানাই। এটা সুস্পষ্ট আচরণবিধি লঙ্ঘন। ব্যবস্থা নিতে উপাচার্যের কাছে অভিযোগপত্র দিয়েছি। যাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একইসঙ্গে ভোটগ্রহণের সময় ৬টা পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি জানিয়েছি।’’







