সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং সামাজিক মাধ্যমের অধিকাংশ প্রচারণা পুলিশের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডকে সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু খাইরুল ইসলাম তুফান, যিনি একজন তরুণ নির্মাতা, তিনি পুলিশের মানবিক ও পেশাদার জীবনকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছেন।
পুলিশের অপরাধ, দুর্নীতি, বা কখনও কখনও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের মনে পুলিশের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। কিন্তু এই চিত্র পুরোপুরি সত্য নয়। পুলিশ শুধুমাত্র আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার বাহিনী নয়, তারা সমাজের শান্তি, নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনের স্থিতিশীলতার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে। এই অদৃশ্য ত্যাগ ও মানবিকতার গল্প সাধারণ মানুষের কাছে খুব কম পৌঁছে। এই শূন্যস্থান পূরণ করেছেন খাইরুল ইসলাম তুফান। তার কাজ কেবল পুলিশি বাহিনীর ইতিবাচক দিকই তুলে ধরে না, বরং সমাজের প্রান্তিক ও অবহেলিত মানুষের সংগ্রামকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে ফুটিয়ে তোলে। এই কাহিনি আমাদের শেখায়, গণমাধ্যম ও চলচ্চিত্রের ক্ষমতা কেবল বিনোদন বা তথ্য দেওয়ার জন্য নয়, সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শৈশব ও শেকড়
৩৫ বছরের খাইরুল ইসলাম তুফানের জন্ম এক সাধারণ কৃষক পরিবারে। তার শৈশবকাল কেবল খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী, একইসাথে কিছুটা চঞ্চল ছিলেন তিনি। স্কুল জীবনে নানা ধরনের কাজ করে তিনি জীবনের কঠিন বাস্তবতা উপলব্ধি করতে শিখেছিলেন। গ্রামের মাটিতে তিনি শিখেছিলেন ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কৌশল। এই অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তীতে তাকে দৃঢ়চেতা ও অদম্য করে গড়ে তোলে। খাইরুলের গল্প প্রমাণ করে, বড় স্বপ্ন দেখা এবং তা অর্জন করা কেবল শহুরে সুবিধা বা সম্পদের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম এবং সুযোগের সদ্ব্যবহারেই সম্ভব। এই শৈশবিক শিক্ষা এবং পরিবারিক মূল্যবোধই পরবর্তীতে তার চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রজেক্ট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দৃঢ় ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

ক্যামেরার পেছনের প্রথম দিনগুলো
খাইরুল ইসলাম তুফানের ক্যারিয়ারের শুরু হয় চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি) এবং নাটক-টেলিফিল্ম প্রডাকশনের মাধ্যমে। এখানে তিনি হাতে-কলমে শিখেছেন ক্যামেরা পরিচালনা, আলো, সেট ব্যবস্থাপনা এবং সম্পাদনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দিক। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আন্তর্জাতিক নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। বিবিসি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, ডিসকভারি চ্যানেলের মতো বিশ্বখ্যাত মাধ্যমগুলো যখন সুন্দরবনের বাঘ, হরিণ বা মধু সংগ্রাহকদের নিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর জন্য আসে, তখন তাদের টিমে স্থান পান তিনি। আন্তর্জাতিক নির্মাতাদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, ক্যামেরা শুধু দৃশ্য ধারণের মাধ্যম নয়, এটি ইতিহাস সংরক্ষণ এবং মানবিক গল্পকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার শক্তিশালী হাতিয়ার। এছাড়া এই সময় তুফান শিখেছিলেন, প্রতিটি দৃশ্যের পিছনে থাকে একটি গভীর গল্প, যা দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে। তার প্রথম অভিজ্ঞতাগুলো তাকে প্রমাণ করে যে সিনেমাটিক দৃষ্টিকোণ থেকে মানবিক গল্প তুলে ধরা, শুধু তথ্য জানানো নয়, বরং মানুষের মনকে আন্দোলিত করা সম্ভব।
চ্যানেল আইতে যাত্রা
পরবর্তীতে খাইরুল ইসলাম তুফান যোগ দেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল চ্যানেল আই-এ। শুরুর দিকে তিনি ছিলেন একজন ক্যামেরাপারসন। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল আরও বড়। নিজেই কনটেন্ট তৈরি করা, সমাজের জন্য অর্থবহ গল্প গঠন করা। সেই সুযোগ আসে করোনা মহামারির সময়। যখন পুরো পৃথিবী থমকে যায়, মানুষ ঘরে বন্দি, তখন তিনি সচেতনতা মূলক অনুষ্ঠান তৈরি শুরু করেন। এই উদ্যোগ দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগায় এবং নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সময়ের কাজের মাধ্যমে তুফান প্রমাণ করেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য বিনোদন কেবল আনন্দ দেওয়া নয়; এটি মানুষকে শিক্ষিত করতে, সচেতন করতে এবং মানবিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারে। এতো অল্প বয়সে এই ধরনের দায়িত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনা করে তিনি হয়ে ওঠেন চ্যানেল আই-এর অন্যতম কনিষ্ঠ প্রোগ্রাম প্রডিউসার।

পুলিশের গল্প বলার সাহসী উদ্যোগ
একদিন খাইরুল ইসলাম তুফানের মনে প্রশ্ন জাগে—“রাষ্ট্র যত উন্নত হয়, মানুষের জীবন যত এগোয়, এর পেছনে নিরাপত্তার মূল ভূমিকা রাখছে কারা?” উত্তর স্পষ্ট—পুলিশ। তবু, পুলিশের ইতিবাচক কাজ সমাজে তেমনভাবে আলোচিত হয় না। এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় তার নতুন উদ্যোগ। নিজের প্রতিষ্ঠান পজিটিভ থিংক-এর মাধ্যমে তিনি নির্মাণ করেন পুলিশের মানবিক ও পেশাদার জীবনের উপর একটি ধারাবাহিক তথ্যচিত্র সিরিজ। এই সিরিজের নামই ছিল “সবুজ সংকেত।” বাংলাদেশের গণমাধ্যম ইতিহাসে এটি পুলিশের উপর সবচেয়ে বড় ডকুমেন্টারি সিরিজ। প্রায় ৩০০ পর্বে, এই ডকুমেন্টারি পুলিশের দায়িত্ব, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং মানবিক গল্পগুলো তুলে ধরে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে। এটি কেবল পুলিশের জীবনকে নতুন করে দেখায় না, বরং সাধারণ মানুষের চোখেও পুলিশের প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে।

সমাজের প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর
তুফানের কাজ কেবল পুলিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সমাজের প্রান্তিক ও অবহেলিত মানুষের কথাও তুলে ধরেছেন। বেদে সম্প্রদায়, হিজরা, মান্তা (নদীভাসী মানুষ), পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, গরিব ও অসচ্ছল বয়স্কদের জীবনসংগ্রাম—এসব উঠে এসেছে তাঁর ডকুমেন্টারিতে। তাঁর ক্যামেরা কেবল প্রতিষ্ঠিত ও শক্তিশালী ব্যক্তিদের আলো খুঁজে পায় না; সমাজের অন্ধকারে থাকা মানুষদেরও আলোর দিশা দেয়। এসব কাজ প্রমাণ করে, তুফানের মূল লক্ষ্য হলো মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে গল্প বলা, যা সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তিনি বিশ্বাস করেন, যারা সমাজের মূলধারার বাইরে থাকে, তাদের গল্পও গুরুত্বপূর্ণ এবং তা বিশ্বের দরবারে পৌঁছানো উচিত।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
খাইরুল ইসলাম তুফানের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীভিত্তিক কিছু ডকুমেন্টারি দেশীয় চলচ্চিত্র ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। তার কাজ লন্ডন ভিত্তিক চ্যানেল এস-এও প্রচারিত হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রমাণ করে, তুফানের কাজ শুধুমাত্র দেশীয় মাপদণ্ডে নয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি বিশ্বমঞ্চে দৃষ্টি আকর্ষণের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এটি প্রমাণ করে, একজন নির্মাতা যদি সঠিকভাবে মানবিক গল্প তুলে ধরে, তবে তার কাজ দেশের সীমানার বাইরে গিয়ে সামাজিক সচেতনতা ও পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।
হঠাৎ থেমে যাওয়া পথ
তবে সব পথ মসৃণ নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও গণ-অভ্যুত্থানের পর হঠাৎ থেমে যায় এই মহৎ উদ্যোগের প্রচার। এই অনিশ্চয়তা খাইরুল ইসলাম তুফান এবং তার পুরো টিমকে ভেঙে দেয়নি। তবুও এই হঠাৎ থমকে যাওয়া পথ তাদের মধ্যে হতাশা এবং চিন্তার সৃষ্টি করে। তুফান এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন দৃঢ় মানসিকতার সঙ্গে। তিনি বিশ্বাস করেন, একদিন আবার সুযোগ আসবে। সেই দিন আবারও তিনি পুলিশের মানবিক মুখ এবং প্রান্তিক মানুষের সংগ্রামের গল্প মানুষের সামনে তুলে ধরবেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, একটি দৃঢ় মানসিকতা এবং নিরলস পরিশ্রম মানুষের স্বপ্নকে থামাতে পারে না।
স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ
বর্তমানে খাইরুল ইসলাম তুফানের প্রতিষ্ঠান পজিটিভ থিংক শুধু পুলিশের বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর গল্প নির্মাণে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশের এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও ব্যক্তিদের উপর ডকুমেন্টারি নির্মাণ করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, নেদারল্যান্ড এম্বাসির বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান, বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখন্ড বনভূমি সুন্দরবনের ওপর পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্টারি ফ্লিম, জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রধান কেন্দ্র সংস্থা (লিগ্যাল এইড)। ড্যাম এর “স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট”(এসএসিপি)সহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও। এছাড়া তারা দেশের খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, সমাজকর্মী ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জীবন ও কর্মের উপরও ডকুমেন্টারি তৈরি করছেন। পজিটিভ থিংকের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, সংস্থাটি কেবল বিনোদনমূলক বা তথ্যবহুল কনটেন্টই তৈরি করছে না, বরং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, মানবিক মূল্যবোধ প্রসার এবং দেশের বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির অবদান বিশ্বমানের ফর্ম্যাটে তুলে ধরার লক্ষ্যে কাজ করছে। তুফানের নেতৃত্বে পজিটিভ থিংক একটি পেশাদার, মানবিক এবং গুণগত দিক থেকে সমৃদ্ধ নির্মাণ সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করছে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও ডকুমেন্টারি শিল্পকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থাপন করবে।
আজ খাইরুল ইসলাম তুফান শুধু একজন টেলিভিশন প্রডিউসার নন, বরং একজন স্বপ্নদ্রষ্টা নির্মাতা। তার বিশ্বাস—ডকুমেন্টারি হলো সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার। তার ক্যামেরা মানুষের অদেখা দিকগুলো সামনে আনে এবং গল্পকে নতুন করে বলার সাহস যোগায়। তিনি বিশ্বাস করেন, চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সমাজের জন্য শিক্ষা, সচেতনতা, এবং মানবিকতা বিকাশের মাধ্যম। তার স্বপ্ন হলো বাংলাদেশের গল্পকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়া, বিশেষ করে পুলিশের মানবিক অধ্যায় এবং প্রান্তিক মানুষের সংগ্রামকে ইতিহাসে স্থায়ীভাবে স্থান দেওয়া।
উপসংহার
খাইরুল ইসলাম তুফানের জীবনকাহিনি আমাদের শেখায়—সফল হতে হলে জন্ম বা পটভূমি নয়, দরকার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং সৃজনশীল চিন্তা। তিনি প্রমাণ করেছেন, ক্যামেরা শুধুই দৃশ্য ধারণের যন্ত্র নয়; এটি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার, মানবিক কণ্ঠস্বরের প্রতীক। তার যাত্রা থেমে থাকলেও স্বপ্ন থেমে নেই। আগামী দিনেই আবার তাঁর ক্যামেরা মানুষের অদেখা গল্পগুলো তুলে ধরবে, নতুনভাবে বলবে এবং সমাজকে ভাবতে শেখাবে। তুফান প্রমাণ করেছেন যে একজন তরুণ নির্মাতার উদ্যম, সৃজনশীলতা এবং মানবিক দৃষ্টি সমাজের অন্ধকারে আলো ফেলার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








