যে ভাবনা থেকে জন্ম নিয়েছিল ‘অতল’
আদিম থেকে অতল যাত্রা-২

খঞ্জন নামে নতুন একটা পাখির সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছে, জোড়া খঞ্জন প্রতিদিন নিয়ম করে আমার বেলকনীর এখানটায় আসে। লেখালেখি ভীষণ পরিশ্রমের কাজ হওয়ায় আমি টানা লিখতে পারি না, লেখা বাদ দিয়ে খঞ্জনদের দেখি। পাখিগুলো কি সতর্কতায় খাবার খায়, একটা ধবধবে শাদা বক আসার আগেই ওরা ঢেউ খেলে উড়ে চলে যায়। ওদের বাসা আমার আশপাশেই হবে, ওরা আমার প্রতিবেশী।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে আমার খারাপ সম্পর্ক না থাকলেও কারো সঙ্গে বিশেষ সখ্যতা নেই। শৈশব থেকেই আমার আশপাশের মানুষ আমাকে পাগল, নাস্তিক তকমা দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখেন কিংবা আমিই দূরে দূরে থাকি। আমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে দূরের জামান ভাই, মিতুল, সীমা আপাদের সঙ্গে, যারা আমাকে আর্টিস্ট জ্ঞান করেছে সবসময়। বেশ পরে অতল জার্নির মধ্য দিয়ে তুষার ভাইয়ের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হয়, এর আগে আমাদের মধ্যে সখ্যতার এত গভীরতা ছিল না। শিশির ভাইয়েরর মাধ্যমে আমরা একে অপরকে চিনতাম শুধু। অবশ্য পরিচয়ের প্রথম দিন থেকেই তুষার ভাই আমাকে খুবই গুরুত্ব সহকারে দেখতেন। প্রায়ই আমার সঙ্গে দেখা করতে ছুটে চলে আসতেন, আমরা রেললাইন ধরে হাঁটতাম।
তুমুল অবহেলার মধ্যে আমার বেড়ে ওঠা, তাই আমার প্রতি একটা মানুষের এত আগ্রহ, ভালোবাসায় আমি সহজেই অস্বস্তিতে ভুগি। কেননা তখনও আদিম বেশ দূরের ঘটনা, আমার প্রতি আগ্রহের বিশেষ কোন কারণ দেখি না। অনেক পরে তুষার ভাই একদিন কথা প্রসঙ্গে জানান- মূলত আমাদের পাঠাগার এবং আমাদের নৈশ বিদ্যালয়ের জন্য শুরুর দিন থেকেই আমার প্রতি তার ভালো লাগার জন্ম নেয়। অন্যদিকে আমি চমৎকার এই মানুষটাকে এড়িয়ে যেতাম সেই সময়!
অতলের ভাবনা যখন জমাট বাধতে শুরু করে তখনও তুষার ভাইয়ের কথা আমার মাথায় ছিল না। যদিও তুষার ভাইয়ের ফটোগ্রাফি আমার খুবই ভালো লাগতো, কিন্তু সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে তাকে কখনও ভাবিনি। আমি তখন ভেতরে ভেতরে শুধু সবচেয়ে সহজ উপায়ে একটা ছবি বানানোর চিন্তা করছিলাম, সেই ভাবনা থেকেই একটা স্কুটি, ক্যামেরা, ক্যামেরা পার্সন এবং আমি, এমন আইডিয়ার জন্ম! এই আইডিয়া থেকেই আশরাফুল নামে একজন ক্যামেরা পার্সনের সঙ্গে আমার প্রাইমারি আলাপ হয়, সে সানন্দেই রাজি হয় এবং আমিও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের লুক, এক্সপ্রেশন দেখতে থাকি।
কিন্তু আমার বিরহী মন মানছিল না, অস্থিরতায় বুঝতে পারি আমি ঠিক পথে নেই। প্রশান্তির খোঁজে প্রতিদিনই আমি সেই লোকেশনগুলোতে স্কুটি নিয়ে ঘুরে বেড়াই, বিষন্নতায় সময় কাটে। একদিন গভীর রাতে, সেদিন পবিত্র শবে বরাত, আমার কিছুতেই ঘুম আসছিল না। নানান স্মৃতি ইমেজ হয়ে ধরা দিচ্ছিল, বিশেষ করে মসজিদের ইমাম সাহেবকে সামনে রেখে এলাকার মুরুব্বি, ছোটরা সবাই মিলে, সারারাত ঘুরে ঘুরে কবরস্থানগুলো জিয়ারতের স্মৃতি! অন্ধকার, কবর, রাত জাগার আনন্দ, সব মিলিয়ে আমাদের জন্য ছেলেবেলার কী দারুণ এক ঘটনা, এখন এই রীতি বিদআত! এরপর আরো অনেক অনেক স্মৃতি সারি বেঁধে জড়ো হয়, আমি বিছানার এপাশ-ওপাশ করি, বিছানা ছেড়ে হাঁটাহাঁটি করে আবার বিছানায় ফেরত আসি। আচমকা, কোন ঘটনা ছাড়াই আমার তুষার ভাইয়ের কথা মনে পড়ে, তখন শেষ রাত! মনে হয় এই মানুষটাতো ক্যামেরা চালাতে পারেন, এবং তার লুকটাও আমার ভাবনার সঙ্গে মিলে যায়। তিনি ক্যামেরা ঠিকঠাক করে, ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন, আমি ক্যামেরার রেকর্ড বাটন চাপলাম, ব্যস!
উত্তেজনায় তাৎক্ষণিক তুষার ভাইকে মেসেজ পাঠাই। এখানে বলে রাখি, তুষার ভাইয়ের সঙ্গে আমার বেশ ভালোই দূরত্ব চলছিল তখন, মেসেজ বা ফোন কলের কোন রিপ্লাই ঠিকঠাক পাচ্ছিলাম না। এবং ধরেই নিয়েছিলাম এবারও রিপ্লাই পেতে দেরি হবে, আপাতত মেসেজ পাঠিয়ে রাখি, দিনে তাঁর অফিসে গিয়ে সামনাসামনি কথা বলবো, এমন ভাবনা থেকে তাকে মেসেজ পাঠাই। সেদিন তুষার ভাইকে মেসেজ পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি অতলের ব্যাপারে আগ্রহ জানিয়ে রিপ্লাই দিলেন, সঙ্গে পাঠালেন তাঁর নানীর কবরের ছবি! কিছুক্ষণ আগে কিংবা তখনই তিনি তাঁর নানাভাইয়ের কবর জিয়ারত করছিলেন। তুষার ভাই তাঁর নানীকে নানাভাই বলে ডাকতেন, মূলত এই মানুষটার কাছেই তাঁর বেড়ে ওঠা। কথার শেষে তুষার ভাই জানালেন- তিনিও কিছুদিন ধরে মৃত্যু নিয়ে একটা কাজ করার কথা ভাবছেন। আমি বললাম- তাহলে কাল চলে আসেন, তিনি বললেন- ঠিক আছে!
তুষার ভাইয়ের সঙ্গে সামনাসামনি আলাপ হওয়ার পর বুঝতে পারি, আমরা দুজনে একই অনুভূতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। কিংবা তুষার ভাইয়ের অনুভূতি আরো গভীর, আরো বেদনার। সম্প্রতি তিনি একটা জাতীয় দৈনিকের কথোপকথনে বলেন- অতলের জার্নি তাকে মৃত্যু থেকে বাঁচিয়েছে, যা তার তখনকার অনুভূতিকে আরো স্পষ্ট করে। তাই অতলের ভিজ্যুয়াল কেমন হবে, এ ব্যাপারে তাকে ধারনা দেয়া আমার জন্য কঠিন কোন ঘটনা ছিল না। আমি শুধু ক্যারেক্টারের অনুভূতি শেয়ার করেছি, তাকে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি লোকেশন টু লোকেশন। তিনি আমাকে পুরো ছবিটা গোল্ডেন আওয়ারে শ্যুট করার পরামর্শ দেন, আমি দারুণ উদ্দীপ্ত হই। আর এর আগেই আমরা ঘুরতে ঘুরতে ডিসিশন নেই শুধুমাত্র ৩৫ মিমি লেন্সে আমরা সম্পূর্ণ ছবিটা শ্যুট করবো। তার কদিন পরেই পবিত্র মাহে রমজান!
বেশ ক বছর পর, ২০২২ সালের সবগুলো রোজা আমি রাখি, ভেতরে আমার প্রিয়তম বাবার গভীর প্রেম জাগ্রত! সেহেরি শেষে আমি স্কুটি নিয়ে তুষার ভাইয়ের অফিসে চলে যাই। রওনা দেয়ার আগেই তাকে কল দেই, তিনি রেডি হতে থাকেন। তাকে নিয়ে পূর্ব নির্ধারিত লোকেশনে চলে যাই, ক্যামেরা ওপেন করার পর তুষার ভাইয়ের প্রতি আমার প্রেমের অন্য এক জার্নি শুরু হয়, তিনি আমাকে বিষন্ন এক ভিজ্যুয়ালের দুনিয়ায় ডুবিয়ে দেন। আমি ক্যামেরার রেকর্ড বাটনে ক্লিক করে তাকে ইশারা দেই, তিনি ক্যামেরার সামনে গিয়ে দাঁড়ান, অতলের ভিজ্যুয়াল রেকর্ড হতে থাকে। ঘণ্টা দেড়েক শ্যুট করার পর আমরা বাড়ির দিকে ফিরি, পড়ন্ত দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়ে আবার রওনা দেই, ইফতারের আগ পর্যন্ত শ্যুট করে একসঙ্গে ইফতার করি। সন্ধ্যার আলোয় ফিরতে ফিরতে আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলি, কথার মধ্য দিয়েই পরদিনের শ্যুটের পরিকল্পনা দাঁড়ায়।
এই যে সেহেরি শেষে দুনিয়া জাগার আগেই আমাদের দুজনের স্কুটি নিয়ে ছুটে চলা, দিনের প্রথম আলোয় শ্যুট করা, নিজেদের মধ্যে ভাবের বিনিময়, এই জার্নির অনুভূতিটা আসলে কেমন ছিল! লিখতে গিয়ে আমার বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’এর একটা লাইন আবছা মনে পড়ছে, লাইনটা মূলত নির্জন বনের মধ্য দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে ছুটে বেড়ানোর অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে বিভূতিভূষণ লেখেন, লাইনটা হুবহু মনে নেই, বই দেখে লিখছি–“যে কখনও এমন নির্জন আকাশতলে দিগন্তব্যাপী বনপ্রান্তরে ইচ্ছামত ঘোড়া ছুটাইয়া না বেড়াইয়াছে, তাহাকে বোঝানো যাইবে না সে কি আনন্দ!”
লিখতে লিখতে আমি ক্ষুধা টের পাই, ডিম সিদ্ধ করতে গিয়ে মনে হলো নুডলস্ রান্না করে ফেলি। কিন্তু মরিচ নেই, আশেপাশে সব চাষাবাদের জমি। খুঁজতে গিয়ে ঠিকই একটা মরিচ গাছ খুঁজে পাই, লাল লাল মরিচ ধরে আছে, আমি চারটা মরিচ ছিড়ে নিই, সঙ্গে একটা কুমড়া পাতা। সিরাজ কাকা বীজ সংরক্ষণের জন্য লাল মরিচগুলো রেখেছিল কিনা জানি না, পরে জিজ্ঞেস করে জেনে নিবো। সিরাজ কাকাকে সবাই শিরা বলে ডাকে, তিনি আমার দরবার শরীফের জায়গার মালিক, সহজ মানুষটার সঙ্গে আমার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
রান্না করার মতই আমরা অতল নিয়ে আগাই, যে স্টোরি লাইন নিয়ে অতলের যাত্রা শুরু হয় তা আর থাকে না। একটু একটু শ্যুট করি, নতুন ভিজ্যুয়ালের জন্ম হয়। এরমধ্যে শীত চলে আসে, আমরা পরের বছরের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি, অপেক্ষা করতে থাকি কালবৈশাখী ঝড়ের জন্য। তুমুল ঝড়ের মধ্যে তুষার ভাই বাইক ঠেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, উড়তে থাকা বালুতে সব তছনছ হয়ে যাচ্ছে। লোকেশন ঠিক থাকলেও ঝড় আর আসে না, পরে আর এমন দৃশ্যটা শ্যুট করা হয়নি। আমরা আবার আমাদের মত এগুতে থাকি। ঝামেলা বাঁধে তুষার ভাইয়ের এক নতুন সম্পর্ক নিয়ে। ক্যামেরার সামনে সেই বিষন্ন তুষার ভাইকে আর খুঁজে পাই না, চোখেমুখে প্রেম টগবগ করে, শ্যুট করে শান্তি পাচ্ছিলাম না। তারউপর তুষার ভাই একদিন তাঁর প্রেমিকাকে শ্যুটিং দেখাতে চাইলেন, আমি মেজাজ খারাপ করে বলি- আজকে শ্যুটিং না করি ভাই। এরপর বহুদিন আবার শ্যুটিং বন্ধ থাকে।
শ্যুট করা ফুটেজগুলো আমি এডিট করতে শুরু করি। ফার্স্টকাট দাঁড় করানোয় আবার দৃশ্যের জন্ম নেয়, মনে হয় তুষার ভাই খালি গায়ে শীতের কুয়াশায় ঘোড়া নিয়ে ছুটছেন। অভিমান গোপন করে তুষার ভাইয়ের সঙ্গে ইমেজটা শেয়ার করলে সেও খুশি হন, উৎসাহ নিয়ে বলেন- চলেন ঘোড়ায় চড়া শিখি। প্রশিক্ষণের প্রথম দিনেই তুষার ভাই দারুণভাবে আহত হন! বেশ কদিন বিছানায় পরে থাকে।
এরপর নানান ঘটনার মধ্য দিয়ে, তুষার ভাইয়ের সঙ্গে আর টিউনিং হচ্ছিল না। দুজনের মধ্যেই দূরত্ব বাড়তে থাকে, মুখ দেখাদেখি প্রায় বন্ধ!
অতলের শেষ দৃশ্যে- স্কুটিটা আমাদের চোখের সামনে পানিতে তলিয়ে যেতে থাকে, তুষার ভাই আটকানোর চেষ্টা করে না, হয়তো আমরাই চেয়েছি স্কুটিটা গভীর পানিতে তলিয়ে যাক! এমন আরো বেশ কয়েকটা দৃশ্য নিয়ে আমরা নানান পরিকল্পনা করলেও তা আর ভিজ্যুয়াল করা হয়নি। বরং আমি ছবিটা শেষ না করার সিদ্ধান্ত নেই, শ্যুট করা সকল ফুটেজ পোর্টেবল হার্ডডিস্কে পড়ে থাকে।
চলবে…






