বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১৩ কোটি ৮ লাখ শিশু বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছে৷ এর মধ্যে পাঁচ কোটি ৪০ লাখ শিশু বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কর্মরত৷ সুতরাং শিশুশ্রম দূর করার লক্ষ্যপূরণে বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছে পৃথিবী।
রোববার (১৫ জুন) ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রমমুক্ত বিশ্ব গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলেও এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্ব৷
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সাল পর্যন্ত সবশেষ হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে ১৩ কোটি ৮ লাখ শিশুকে জীবনধারণের জন্য কাজ করতে হচ্ছে৷
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম বিরোধী দিবস উপলক্ষ্যে প্রকাশিত এক যৌথ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানায় জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও৷ সংস্থাটির ধারণা, শিশুশ্রমমুক্ত বিশ্ব গড়ে তুলতে আরো কয়েক দশক লাগতে পারে।
তবে এই সময়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হয়েছে৷ ২০০০ সালে বিশ্বব্যাপী শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ২৪ কোটি ৫৫ লাখ৷ ২০২০ সালে এই সংখ্যা ১৬ কোটিতে নেমে আসে৷ এরপর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৮ লাখে৷
ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, যেমন খনিজ সম্পদ উত্তোলন, কলকারখানা এবং কৃষিখাতে কর্মরত শিশুদের সংখ্যাও কমে এসেছে৷ এই সংখ্যা ২০০০ সালে ছিল ৭ কোটি ৯০ লাখ, যা ২০২৫ সালে নেমে এসেছে পাঁচ কোটি ৪০ লাখে৷
আফ্রিকার পরিস্থিতি ভিন্ন
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুশ্রম কমে আসলেও সাব-সাহারা আফ্রিকার দেশগুলোতে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে৷ পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের শিশুশ্রমিকের ৮ কোটি ৭০ লাখই সাব-সাহারা আফ্রিকার দেশগুলোতে৷
ইউনেসেফের শিশু সুরক্ষা বিষয়ক আঞ্চলিক উপদেষ্টা নানকালি মাকসুদ বলেন, ব্যাপ্তির দিক থেকে এটি কমে এসেছে৷ ২০০০ সালে ২৪ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে তা ২২ শতাংশে নেমে এসেছে৷ এই অঞ্চলে যেই জটিলতাটি হচ্ছে তা হলো, দ্রুত জনসংখ্যার বৃদ্ধি৷ আর তাই সংখ্যার বিচারে আমাদের আসলে ততটা উন্নতি হয়নি৷
মাকসুদ জানান, বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ৫ থেকে ১১ বছর বয়সি শিশুরা সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় কাজে নিয়োজিত৷ এর কারণ গ্রামাঞ্চলে মানুষের দারিদ্র্য দূরীকরণে যথেষ্ট কাজ হচ্ছে না৷ তাদেরকে দরিদ্রতা থেকে টেনে তোলার প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং অর্থায়ন করা না গেলে শিশুশ্রম বন্ধ করা যাবে না৷
সেইসাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করার মাধ্যমে মা-বাবাকে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে সচেতন করার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে বলেও মনে করেন তিনি৷ তাছাড়া শিশুশ্রম বন্ধে শক্তিশালী আইনের ব্যবহারের প্রয়োজন বলে জানান মাকসুদ৷ তিনি বলেন, বেশির ভাগ দেশেই এই বিষয়ে আইন রয়েছে৷ তবে আইনের ব্যবহার খুব দুর্বল৷

মাদাগাস্কারে ইউনিসেফের প্রধান লিসা সিমারমান বলেন, ৫ থেক ১৭ বছর বয়সিদের ৪৭ ভাগই শিশুশ্রমের কারণে ক্ষতির মুখে পড়ছে৷ মাদাগাস্কারের শিশুদের ৩২ ভাগ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে৷
ইউনিসেফের এই কর্মকর্তা বলেন, মেয়েদের চেয়ে ছেলে শিশুরা কিছুটা বেশি ক্ষতির শিকার৷ তাছাড়া শহরের চেয়ে গ্রামের শিশুরা এই পরিস্থিতির বেশি শিকার হয়৷
জলবায়ু পরিবর্তন এবং শিশুশ্রম
আফ্রিকার দেশ মাদাগাস্কারের কথাই ধরা যাক৷ খরা, সাইক্লোনসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্লিষ্ট কৃষি নির্ভর এই দেশটি৷ সিমারমান জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে পরিবার এবং শিশুরা বিভিন্ন রকমের এবং ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিযুক্ত হয়৷ এদিকে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কিছু মানুষ কৃষিকাজের পাশাপাশি মিকা নামক খনিজ উত্তোলনের সাথে যুক্ত৷
উল্লেখ্য, মাদাগাস্কার হলো রাশিয়া এবং ভারতের পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মিকা রপ্তানিকারক দেশ৷ নবায়নযোগ্য জ্বালানি তৈরিতে এই খনিজ ব্যবহার হওয়ায় দেশটিতে মিকা উত্তোলন বাড়ছে৷
সিমারমান বলেন, পরিবারের খাবার যোগাতে সাধারণত শিশুরাই এধরনের খনিতে কাজে যেতে বাধ্য হয়৷
মিকা উত্তোলনে প্রায়ই পুরো পরিবার যুক্ত হয়ে পড়ে৷ এই কর্মীরা জাতিসংঘের গবেষকদের জানান, পরিবারের সদস্যরা মিকা উত্তোলনে না গেলে খাবার যোগান ব্যহত হয়৷
প্রয়োজন সঠিক পথ
২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম বন্ধ করতে না পারলেও বেশ কিছু অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করেন মাকসুদ৷ তার মতে, শিশুশ্রম বন্ধে আইনি কাঠামো চালু করা একটি বড় পদক্ষেপ৷ সেইসাথে বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষা লাভের সুযোগ বাড়ানোকে কার্যকর পদ্ধতি বলে মনে করেন তিনি৷
মাকসুদ বলেন, আমরা যদি তাদেরকে (পরিবারগুলোকে) পথ দেখাতে পারি, সম্ভবত তারা তাদের সন্তানদেরকে কাজে যেতে বলবে না৷









