যে কারণে কাছের মানুষকে ‘স্যরি’ বলা উচিত, মনোবিজ্ঞান কী বলে?

ছবি: সংগৃহীত
সম্পর্কে ভালোবাসা থাকলেই যে কখনো ভুল বোঝাবুঝি হবে না, এমন নয়। কখনো রাগের মাথায় বলা একটি কথা, কখনো অবহেলা কিংবা নিজের জেদের কারণে কষ্ট পেতে পারেন কাছের মানুষটি। অথচ ভুল বুঝতে পারার পরও অনেকেই ক্ষমা চাইতে চান না। মনে কাজ করে অহংকার, সংকোচ কিংবা ‘আগে সে স্যরি বলুক’ এমন মনোভাব। কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে, আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
কাছের মানুষের সঙ্গে আমাদের আবেগীয় সম্পর্ক গভীর থাকে। তাই তাদের কাছ থেকে পাওয়া কষ্টও অনেক সময় বেশি প্রভাব ফেলে। একটি ছোট ভুল, অসময়ে বলা কঠিন কথা কিংবা দিনের পর দিন অবহেলা সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে পারে। এ অবস্থায় নিজের ভুল বুঝতে পারলে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে সেই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করা যায়।
২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক রয় লিউইকি ও তাঁর সহকর্মীরা ক্ষমা চাওয়ার কার্যকারিতা নিয়ে একটি গবেষণা করেন। ৭৫৫ জন অংশগ্রহণকারীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় ক্ষমা চাওয়ার ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে নিজের ভুলের দায়িত্ব স্বীকার করা এবং ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে উঠে আসে। অর্থাৎ, শুধু মুখে ‘স্যরি’ বলাই যথেষ্ট নয়, নিজের ভুলের দায় নেওয়া এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করাও জরুরি।
অহংকার নয়, সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া
অনেকেই মনে করেন, আগে ক্ষমা চাইলে নিজের সম্মান কমে যায়। আবার কেউ কেউ ভাবেন, ভুল তো দুজনেরই ছিল, তাহলে শুধু তিনি কেন ক্ষমা চাইবেন? এমন মনোভাব অনেক সময় ছোট সমস্যা বড় করে তোলে। অথচ ক্ষমা চাওয়ার অর্থ সব দোষ নিজের কাঁধে নেওয়া নয়। বরং নিজের যে অংশটুকু ভুল, সেটুকুর দায়িত্ব স্বীকার করা। এতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
অন্যের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া
কোনো আচরণে কাছের মানুষ কষ্ট পেলে তাকে বলা, ‘এতটুকু বিষয় নিয়ে মন খারাপ করার কী আছে?’ এমন মন্তব্য পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে। বরং তার কষ্টকে স্বীকার করা জরুরি। আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করলে তিনি বুঝতে পারেন, তার অনুভূতি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে
সম্পর্কে বিশ্বাস তৈরি হতে সময় লাগে, কিন্তু অসতর্ক আচরণে তা নষ্ট হতে পারে। ক্ষমা চাওয়া সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। তবে একই ভুল বারবার করলে শুধু ক্ষমা চেয়ে সম্পর্ক ঠিক রাখা সম্ভব নয়। আচরণে পরিবর্তন আনার মধ্য দিয়েই আন্তরিকতা প্রমাণ করতে হয়।
মানসিক শান্তির জন্যও জরুরি
ভুল করার পর অনেকের মনে অনুশোচনা ও অপরাধবোধ কাজ করে। নিজের ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করলে সেই মানসিক চাপ কিছুটা কমতে পারে। একই সঙ্গে নিজের আচরণ নিয়ে ভাবার এবং ভবিষ্যতে আরও সচেতন হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে ক্ষমা চাওয়ার সময় অজুহাত দেওয়া, অন্যের ওপর দোষ চাপানো কিংবা সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা করার জন্য চাপ দেওয়া উচিত নয়। বরং নিজের ভুল স্বীকার করে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে অপর ব্যক্তিকে সময় দিতে হবে।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সব সময় কে জিতল আর কে হারল, সেই হিসাব জরুরি নয়। কখনো একটি ছোট্ট ‘স্যরি’ অনেক বড় দূরত্ব কমানোর সূচনা হতে পারে। কারণ, প্রিয় মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়া আত্মসম্মান হারানো নয়; বরং তাঁর অনুভূতি ও সম্পর্কের প্রতি সম্মান দেখানো।






