পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট দেশ বুরকিনা ফাসো গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক সংকট, নিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। এই পটভূমিতেই উঠে এসেছেন এক তরুণ, সাহসী নেতা ইব্রাহিম ট্রাওরে। তিনি দেশের তরুণদের আশার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
বুরকিনা ফাসোর সেনাবাহিনীর ছোট একটি বিদ্রোহী অংশের নেতৃত্ব দেওয়া ট্রাওরে দেশটির সাবেক জান্তা শাসক লে. কর্নেল পল–হেনরি সান্দাওগো দামিবাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশটির ক্ষমতা দখল করেন। পল–হেনরি সান্দাওগোও অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বুরকিনা ফাসোর ক্ষমতা দখল করেন। অভ্যুত্থানের পর নিজেকে বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন ট্রাওরে। তিনি ওই ঘোষণায় দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং রাষ্ট্রীয় বিধি–বিধান জারি রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।
ট্রাওরের কথা শুধু বুরকিনা ফাসোতেই নয়, ছড়িয়ে পড়েছে গোটা আফ্রিকায়, এমনকি আফ্রিকার বাইরেও। অনেকেই মনে করেন, তিনি আফ্রিকার বীরদের পথেই হাঁটছেন। ভক্তরা তাকে তুলনা করেন বুরকিনা ফাসোরই আরেক কিংবদন্তি নেতা টমাস সাঙ্কারার সঙ্গে, যিনি ছিলেন একজন মার্কসবাদী বিপ্লবী এবং অনেকের চোখে ‘আফ্রিকার চে গুয়েভারা’।
আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কন্ট্রোল রিস্কসের জ্যেষ্ঠ গবেষক বেভারলি ওচেং বিবিসিকে বলেন, ট্রাওরের প্রভাব অনেক।আমি এমনকি কেনিয়া থেকেও রাজনীতিক ও লেখকদের বলতে শুনেছি—এই তো সেই মানুষ, যাকে আমরা খুঁজছিলাম।

২০২২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর ক্যাপ্টেন ট্রাওরে ফ্রান্সের সঙ্গে পুরোনো ঔপনিবেশিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এর বদলে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোট গড়ে তোলেন—যার অংশ হিসেবে একটি রুশ প্যারামিলিটারি বাহিনীও বুরকিনা ফাসোতে মোতায়েন করা হয়। একইসঙ্গে তার সরকার বাম ঘরানার অর্থনৈতিক নীতির পথে হাঁটে।
এই নীতির আওতায় গঠন করা হয় রাষ্ট্রায়ত্ত খনি প্রতিষ্ঠান। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়— দেশটিতে ব্যবসা করতে চাইলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারকে ১৫ শতাংশ অংশীদারত্ব দিতে হবে। শুধু তাই নয়, তাদের শিখিয়ে দিতে হবে সেসব প্রযুক্তি ও দক্ষতা, যাতে দেশের লোকজন নিজেরাই একদিন সবকিছু পরিচালনা করতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক এনোক র্যান্ডি আইকিনস বিবিসিকে বলেন, ট্রাওরের এই সংস্কার আফ্রিকাজুড়ে তার জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়েছে । তার মতে, ট্রাওরে এখন সম্ভবত আফ্রিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রপ্রধান। ট্রাওরের জনপ্রিয়তা বাড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। এতে অবশ্য অনেক ভুয়া তথ্য বা পোস্ট ছড়ানো হচ্ছে। এসব পোস্ট মূলত তার বিপ্লবী ইমেজকে শক্তিশালী করার জন্যই তৈরি।
ওচেং বলেন, ট্রাওরের কথা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে নিয়ে প্রচারণা অনেক দূর-দূরান্তে ছড়িয়েছে। আফ্রিকান-আমেরিকান এবং ব্রিটিশ কৃষ্ণাঙ্গরাও তাকে অনেক পছন্দ করে। তিনি আরও বলেন, যারা বর্ণবাদ, দাসপ্রথা এবং উপনিবেশবাদের শিকার হয়েছেন, তারা ট্রাওরের কথায় নিজেদের দেখতে পান।
ইব্রাহিম ট্রাওরে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮৮ সালে বুরকিনা ফাসোর উত্তরের একটি গ্রামে। তার পরিবার ছিল দরিদ্র কৃষক পরিবার। ছোটবেলা থেকেই তিনি শিক্ষা এবং নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান, পড়েন রাজধানী ওয়াগাদুগুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে।
![]()
ইব্রাহিম ট্রাওরের গ্রাম ডজি-গাওয়া, উত্তর বুরকিনা ফাসোতে, যেখানে প্রতিদিন ছিল পানির সংকট, খাদ্যাভাব এবং সশস্ত্র হামলার ভয়। বাবা ছিলেন এক কৃষক, মা একটি ছোট বাজারে সবজি বিক্রি করতেন। পাঁচ ভাই-বোনের সংসারে খাদ্য জোটানোই ছিল প্রতিদিনের যুদ্ধ।
ট্রাওরে বলেন, আমি প্রথম প্রতিবাদ করেছিলাম তখন, যখন আমার ছোট বোন স্কুলে যেতে না পেরে বিয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল—মাত্র ১২ বছর বয়সে।” এ ঘটনার পর তিনি স্থানীয় স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তার বোনকে স্কুলে ফেরান। এখানেই শুরু হয় তার সচেতন রাজনৈতিক যাত্রা
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তিনি ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় নেতা হয়ে ওঠেন। বুরকিনা ফাসোর দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক অব্যবস্থার বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলে ধরেন। তখন থেকেই তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়।

২০২২ সালে যখন সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তাহীনতা চরমে পৌঁছে, তখন ইব্রাহিম তাওরে বেসামরিক সাহসিকতা দেখিয়ে উত্তরাঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিরক্ষা ইউনিট গঠনের নেতৃত্ব নেন। তিনি গ্রামে গ্রামে গিয়ে যুবকদের সংগঠিত করেন, সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
তাওরের সাহসিকতা সবার নজর কাড়লেও, এর ফলে তিনি চরমপন্থীদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন। দুইবার তার ওপর প্রাণঘাতী হামলার চেষ্টা হয়। তাওরের ভাষায়, “আমি জানি মৃত্যুর ঝুঁকি আছে। কিন্তু যদি আমরা না দাঁড়াই, তাহলে আর কে দাঁড়াবে?” তিনি রাজনৈতিক শক্তি থেকেও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। অনেক সময়ই তাকে “অভিজ্ঞতাহীন”, “উগ্র” বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি তার অবস্থানে অনড় থেকেছেন—যেখানে জনগণের চাহিদা, সংহতি এবং দেশপ্রেম অগ্রাধিকার পায়।
ইব্রাহিম ট্রাওরে মনে করেন, আফ্রিকার তরুণরাই পরবর্তী বিপ্লবের চালক হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা পশ্চিমা মডেল কপি করতে চাই না। আমরা আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বাস্তবতাকে মাথায় রেখে নতুন এক বিকল্প গড়তে চাই।’
ইব্রাহিম ট্রাওরে এখনও বুরকিনা ফাসোর কোনও নির্বাচিত নেতা নন। তবে মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন, বিশেষ করে তরুণ সমাজের। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়—লড়াই, সাহস, ত্যাগ এবং নেতৃত্বের গল্প আমাদের শেখায় কীভাবে একজন তরুণ নিজের ভেতর থেকে আলো জ্বালিয়ে একটি জাতিকে আলোকিত করতে পারে।








