পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে সেনাশাসন ছিল সবচেয়ে বেশি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রয়েছে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী আস্থার সম্পর্ক। পাক-ভারত আলাদা হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আস্থাভাজন মনে করেন মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধানরা।
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধর সময় পাকিস্তান সরকারকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
সম্প্রতি ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়ন করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বলেছেন, তিনি আসিম মুনিরকে নিয়ে গর্বিত। এমনকি পাকিস্তান ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়নও দিয়েছে। ঠিক একইভাবে পাকিস্তানের বর্তনাম সেনাপ্রধানও মনে করেন, সেনাবাহিনীকে পাকিস্তানে ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে আমেরিকা।
কিন্তু কেন আমেরিকান রাষ্ট্রপতিরা আসিম মুনিরের মতো শক্তিশালী পাকিস্তানি সেনাপ্রধানদের ভালোবাসেন?
টাইমস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে এর বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল: ‘হোয়াই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট লাভ স্ট্রংম্যান লাইক আসিম মুনির’।
লেখা শুরু হয় লেখক মোহাম্মদ হানিফের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে। তিনি বলেন, ১৯৫৯ সালে আমার জন্মের ছয় বছর আগে পাকিস্তান এমন এক জেনারেল দ্বারা শাসিত হচ্ছিল, যিনি একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। তিনি নিজেকে সেনাবাহিনীর উচ্চপদ ফিল্ড মার্শাল হিসেবে উন্নীত করেছিলেন।
ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের ক্ষমতার অন্যতম প্রধান দাবি ছিল তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আইয়ুব খান একটি বইও লিখেছেন, যার শিরোনাম- ফ্রেন্ডস, নট মাস্টার্স।
লেখকের মতে, আসলে পাকিস্তান কৃষিভিত্তিক দেশ হওয়ায় আমেরিকার সাহায্য প্রয়োজন ছিল না। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের জন্য বেশি প্রয়োজন ছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এবং সেনাবাহিনীকে দেখাতে যে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
অপরদিকে, লিন্ডন জনসন বিনিময়ে কী চেয়েছিলেন? সামরিক স্বৈরশাসক ও করাচির উটগাড়ি চালকের সঙ্গে বন্ধুত্বের পাশাপাশি শীতল যুদ্ধের ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা, যা পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে একটি বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করে সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর নজরদারি ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ দেয়।
লেখক বলেন, আমার জীবনের ৬০তম বছরে প্রবেশের সাথে সাথে পাকিস্তানের দ্বিতীয় ফিল্ড মার্শাল হয়েছে। মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত ও বিপজ্জনক সংঘাতের পর, পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেওয়া জেনারেল আসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শালের পদমর্যাদায় উন্নীত করা হয়েছে। তিনি প্রথম পাকিস্তান সেনাপ্রধান যিনি অভ্যুত্থান না ঘটিয়েও হোয়াইট হাউসে সরকারি লাঞ্চে আমন্ত্রণ পেয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি তাকে নিয়ে গর্বিত। অন্যদিকে পাকিস্তান ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়নও দিয়েছে।
লেখক মনে করেন, পাকিস্তানে গণতন্ত্রের সব চিহ্ন আছে—একটি সংসদ, প্রধানমন্ত্রী, বিচার বিভাগ, শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম, কিন্তু দুই বছর আগে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা ইমরান খানকে কারাগারে পাঠানোর পর সেনাবাহিনী সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, ট্রাম্প সাধারণ সরকারি ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সময় নষ্ট না করে সেই ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছেন, যিনি আসলে গুরুত্বপূর্ণ।
আমেরিকা সবসময় পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসকদের প্রতি কোমল ছিল, কারণ তারা তাদেরকে এক জায়গা দিয়ে গোপন এবং প্রকাশ্য কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ দেখেছিল। ১৯৮০’র দশকে, আমেরিকা জেনারেল জিয়াউল হকের নির্মম সামরিক শাসনকে অর্থায়ন করেছিল, কারণ তিনি আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের পরাজিত করতে ওয়াশিংটনকে সাহায্য করছিলেন। জেনারেল পারভেজ মোশাররাফ ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করলেন, এরপর তিনি আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত হয়ে যান।
২০০১ সালে আমেরিকার আক্রমণের পর বুশ প্রশাসন জেনারেল মোশাররাফের কাছে ভর করলো, যখন আফগানিস্তানে অভিযান চালানোর জন্য তার সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। এই নতুন সম্পর্কের সূচনা ছিল স্বাভাবিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান প্রেমকাহিনী মতো।
মোশাররফ দাবি করেছিলেন, একজন উচ্চস্তরের আমেরিকান কর্মকর্তা হুমকি দিয়েছিলেন, পাকিস্তান যদি না মেনে চলে তবে তাকে পাথরের যুগে পরিণত করা হবে। জেনারেল কী করবেন? তিনি সম্পূর্ণ সহযোগিতা দেন এবং আফগানিস্তানে তালেবান ভাইদের বোমা মাড়ানোর জন্য পাকিস্তানের বিমানঘাঁটিতে আমেরিকানদের প্রবেশাধিকার দেন।
এরপরই সম্পর্কটি আরও গভীর হয়। মোশাররফ ওয়াশিংটনের জন্য শিকারি হয়ে যান। তালেবান নেতাদের, এমনকি তাদের পাকিস্তানস্থ রাষ্ট্রদূতকেও হুড, গ্যাগ ও হাতকড়া পরিয়ে গোপন বন্দিশালায় পাঠানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সংখ্যার জন্য নির্দোষ পাকিস্তানি নাগরিকদেরও তুলে দেওয়া হতো।
পাকিস্তানে সাধারণত যখন নাগরিকদের ভোটের গণতান্ত্রিক সরকার থাকে, তখনই আমেরিকা ও পাকিস্তানের সম্পর্ক শীতল হয়ে যায়। বৈদেশিক বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা এই জটিল সম্পর্ক বর্ণনা করতে বিভিন্ন উপমা ব্যবহার করেন—প্রতারণা করা, ব্যবহার করা, পরিত্যক্ত, প্রেমে অবহেলা—সবকিছুই এই বিষাক্ত মিশ্রণে রয়েছে। হিলারি ক্লিনটন যখন ইসলামাবাদে ভ্রমণ করেছিলেন এবং স্থানীয়দের ‘পিছনের আঙিনায় সাপ রাখার’ শিক্ষা দিয়েছিলেন, তখন আমেরিকাকে “সৎ মায়ের” সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল, যিনি কখনো সন্তুষ্ট হন না।
এমনকি ট্রাম্প প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম মেয়াদে পাকিস্তান নিয়ে খুশি ছিলেন না। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আমেরিকা ও পাকিস্তানের পুরনো ভালোবাসা পুনরায় জাগ্রত হয়েছে- যা তাদেরকে একত্রিত করেছিল।
ট্রাম্প জাতিসংঘে তার ভাষণে পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরও বিশ্বাস করেন যে, আমেরিকার সঙ্গে কিছুটা নিয়ন্ত্রক, কিছুটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও সেনাবাহিনীকে পাকিস্তানে ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।







