রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক মাসে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের একাধিক ঘটনা এবং বাংলাদেশে আল কায়েদার তৎপরতা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের পর দেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই বলে দাবি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বলছে, এই মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তারা দেখছে না। তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল কায়েদার স্থায়ী ঘাঁটি ও গোপন সেল গড়ে তোলার চেষ্টার যে তথ্য এসেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিবিসি বাংলা এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, এখনো বড় কোনো জঙ্গি হামলার ঘটনা না ঘটলেও সাম্প্রতিক সময়ে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার, নব্য জেএমবির তৎপরতার অভিযোগ এবং আল কায়েদা নিয়ে জাতিসংঘের বার্তা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। তাই গোয়েন্দা নজরদারিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
তবে এসব তৎপরতার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কোনো কৌশল রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন কয়েকজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আল কায়েদা নিয়ে যা বলা হয়েছে
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (একিউআইএস) নিয়ে নতুন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একিউআইএস একটি খণ্ডিত গোষ্ঠী থেকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনে রূপান্তরিত হচ্ছে। বড় ইউনিটের পরিবর্তে সংগঠনটি এখন বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট সেলের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এর পাশাপাশি সংগঠনটি শক্তিশালী লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
একিউআইএসের কর্মকাণ্ডের উদাহরণ হিসেবে দিল্লির লাল কেল্লায় হামলার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে হওয়া ওই হামলার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটিকে দায়ী করা হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, একিউআইএস বাংলাদেশে নিজেদের সেল গঠনের চেষ্টা করছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একিউআইএসের শীর্ষ নেতৃত্ব আফগানিস্তানের কাবুলে অবস্থান করছে। তাদের তালেবানের দেওয়া তাজকিরা বা পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৯ জুন পর্যন্ত আল কায়েদা ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনায় বাড়ছে আলোচনা
জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের বেশ কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে।
এর মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির কার্যক্রম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নব্য জেএমবির একটি চক্রের বিষয়ে নতুন তথ্য পেয়েছে বলে জানা গেছে।
গত ১২ আগস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় তিনতলা একটি বাড়ি ঘিরে অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। সেখান থেকে ৯টি বিস্ফোরক এবং বিপুল পরিমাণ গানপাউডারসহ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
এর আগে গত ৩০ জুলাই সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদিদোকানে ফেলে যাওয়া ভ্রমণ ব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি একটি বোমা উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ছাড়া ২৪ জুলাই ঢাকার মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি ছাতার ভেতরে রাখা বোমা উদ্ধার করা হয়।
এসব ঘটনার মধ্যেই কয়েক দিন আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যানবাহনে হামলার আশঙ্কায় সারা দেশে সতর্কতা জারি করেছিল পুলিশ সদর দপ্তর।
গত এপ্রিলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই। তবে সম্প্রতি সাভারে একটি বাড়িতে অভিযানকে ঘিরে নিষিদ্ধ জেএমবির তৎপরতার তথ্য এবং বাংলাদেশে আল কায়েদার সেল গঠনের চেষ্টা নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদন নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
আতঙ্কিত হওয়ার কারণ দেখছে না সিটিটিসি
পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক বলছেন, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে জঙ্গি তৎপরতা বা নাশকতার কোনো শঙ্কা নেই।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমরা তো প্রতিটা ঘটনাই তদন্ত করছি। আমরা বলছি যে আতঙ্কিত হওয়ার কিংবা নাশকতার আমরা কোনো আশঙ্কা দেখছি না।’
সম্প্রতি বোমা বা বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোর সঙ্গে আল কায়েদার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
‘আল কায়েদার কোনো যোগসূত্র আছে কি না সেটাও আমরা দেখছি। তদন্ত চলছে, তদন্তের পরই বলা যাবে,’ বলেন সিটিটিসি প্রধান।
তবে বাংলাদেশে আল কায়েদার তৎপরতা বা সেল গঠনের চেষ্টা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
তার ভাষ্য, ‘আল কায়েদা ইস্যুতে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে তা নিয়ে আমাদের বলার কিছু নেই, এটা সরকার কমেন্ট করবে।’
এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
জঙ্গি তৎপরতা আছে কি নেই, প্রশ্ন বিশ্লেষকদের
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের আলোচনা নতুন নয়। ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের সময় সিরিজ বোমা হামলাসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের তৎপরতার বিষয়টি সামনে এসেছিল। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও বিভিন্ন পর্যায়ে জঙ্গি তৎপরতার তথ্য এসেছে।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারাগার থেকে কয়েকজন সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ ছাড়া জঙ্গিবাদের মামলায় আটক কয়েকজন পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, সম্প্রতি বোমা বা বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন বা তুলনামূলক ছোট ঘটনা মনে হলেও এখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে আল কায়েদা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বার্তাটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. নাসির উদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, ‘ওইভাবে বড় ঘটনা এখনো ঘটেনি। প্রেশার কুকার, ছাতা, পাইপ এগুলোতে আনকনভেনশনাল ওয়েতে তৈরি এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো দেখে বোঝা যায় যে অর্থের জোগান দিচ্ছে বাইরে থেকে।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, বর্তমান সময়ে জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদ বিশ্বজুড়ে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে কোনো দেশই পুরোপুরি এর বাইরে থাকতে পারে না।
বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিকভাবে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা দেশে বিভিন্ন দেশের নানামুখী স্বার্থ জড়িত থাকায় বিভিন্ন ধরনের তৎপরতার ঝুঁকিও রয়েছে।
প্রক্সি যুদ্ধের আশঙ্কার কথাও বলছেন বিশ্লেষক
ড. নাসির উদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রক্সি যুদ্ধের যে প্রবণতা চলছে, তাতে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দেশগুলো অন্য দেশের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে।
তিনি বলেন, ‘ইরান সরাসরি যুদ্ধ না করে হুথি, হেজবুল্লাহর মতো সংগঠনকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। একইভাবে যারা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে চাপে ফেলতে চায় তারা কোনো সংগঠনের পেছনে অর্থায়ন করবে এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করবে এটাও অস্বাভাবিক নয়।’
ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনের চেষ্টা চলছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
ড. নাসির উদ্দিন আহমদের ভাষায়, ‘ইসলাম প্রতিষ্ঠার একটা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মূলত সরকারবিরোধী এবং বিশৃঙ্খলা তৈরির যে অপচেষ্টা, সেটাকে সাধন করার একটি চেষ্টা থাকতে পারে।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে উগ্র গোষ্ঠী
জঙ্গিবাদ নিয়ে গবেষণা করেছেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। তার মতে, ৫ আগস্টের ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে যে ত্রুটিবিচ্যুতি তৈরি হয়েছে, তার সুযোগ নিতে পারে উগ্র গোষ্ঠীগুলো।
‘বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা নেই, এটি বলার সুযোগ নেই,’ মনে করেন তিনি।
নূর খান লিটন বলেন, ৫ আগস্টের পর কারাগার ভেঙে কিংবা জামিনে এমন কিছু ব্যক্তি বের হয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই উগ্র গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল।
তার ভাষায়, ‘কেবল ধর্মীয় উগ্রবাদ নয়, এর বাইরেও যে উগ্রবাদ রয়েছে, তাদের বিচরণের একটা মোক্ষম সময় হিসেবে এটিকে (আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতাকে) বেছে নিতে পারে।’
এ ছাড়া অতীতে নিষিদ্ধ করা রাজনৈতিক বা উগ্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়ভাবে ফিরে আসারও একটি প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
পুলিশের কার্যক্রম নিয়েও এখনো সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন এই মানবাধিকারকর্মী।
বড় হামলা না হলেও নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ
সাম্প্রতিক বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোর সঙ্গে এখন পর্যন্ত আল কায়েদার সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। সিটিটিসিও বিষয়টি তদন্ত করছে বলে জানিয়েছে।
তবে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার, নব্য জেএমবির তৎপরতার অভিযোগ এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল কায়েদার সেল গঠনের চেষ্টার তথ্য, সব মিলিয়ে বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, বড় কোনো ঘটনা ঘটার অপেক্ষায় না থেকে গোয়েন্দা নজরদারি, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ, বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোর তদন্ত এবং জঙ্গি অর্থায়নের উৎস শনাক্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।








