বাংলাদেশ

সাব-রেজিস্ট্রারদের পোস্টিংয়ে লটারি কেন?

সাব-রেজিস্ট্রারদের পোস্টিংয়ে লটারি কেন?

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি-পদায়ন নিয়ে দীর্ঘদিনের নানা অভিযোগের মধ্যে এবার নতুন পদ্ধতির পথে হাঁটছে আইন মন্ত্রণালয়। গুরুত্বপূর্ণ ও কথিত ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেবে পরিচিত স্টেশনগুলোতে কর্মকর্তাদের পদায়নে তদবিরের সুযোগ কমিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে লটারির মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রার নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রথম ধাপে ঢাকার ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদায়নের জন্য দেশের ‘এ’ ক্যাটাগরির ১৩১ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে ১৮ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। নির্বাচিত কর্মকর্তাদের আগামী সাত দিনের মধ্যে পদায়ন আদেশ দেওয়া হবে।

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পত্তি নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়। এসব কাজের সঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন জড়িত থাকায় কোনো কোনো অফিসকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দালালচক্রের প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু কর্মস্থলকে কর্মকর্তাদের কাছে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেবে বিবেচনা করার ধারণাও রয়েছে।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, জনমনে যেসব এলাকাকে দুর্নীতির আখড়া হিসেবে দেখা হয়, সেসব স্টেশনের সিন্ডিকেট ভাঙতেই লটারি পদ্ধতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকার পোস্টিংকে সাব-রেজিস্ট্রারদের জন্য প্রাইজ পোস্টিং হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই প্রথম ধাপে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোর পদায়নে লটারির মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

লটারির মূল উদ্দেশ্য হলো পছন্দের কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য ব্যক্তিগত তদবির বা প্রভাব খাটানোর সুযোগ কমানো। অর্থাৎ কে কোন গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে দায়িত্ব পাবেন, সেই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যোগাযোগের বদলে একটি নির্ধারিত ও দৃশ্যমান প্রক্রিয়া অনুসরণ করা।

এখন পর্যন্ত পদায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন কিংবা অন্যান্য বিবেচনা কাজ করলেও গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে পোস্টিংকে ঘিরে তদবিরের অভিযোগ থাকলে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। লটারির মাধ্যমে অন্তত নির্বাচনের প্রাথমিক ধাপটি ব্যক্তিনির্ভর না রেখে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির আওতায় আনা হচ্ছে।

তবে লটারিতে শুধু কর্মকর্তা নির্বাচন হলেই পুরো প্রক্রিয়া শেষ হচ্ছে না। আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, লটারিতে নির্বাচিত ১৮ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। তাদের দক্ষতা এবং কাজের চাপ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করে ঢাকার ১৮টি স্টেশনের মধ্যে উপযুক্ত জায়গায় পদায়ন বণ্টন করা হবে।

আইন মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য বলা হচ্ছে কথিত সিন্ডিকেট ভাঙা। কোনো নির্দিষ্ট অফিসে দীর্ঘদিন ধরে কর্মকর্তা, কর্মচারী, দালাল বা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের একটি যোগসূত্র তৈরি হলে সেখানে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে। নতুন কর্মকর্তাদের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পদায়ন করে এ ধরনের পুরোনো সম্পর্ক বা প্রভাববলয় ভাঙার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে শুধু কর্মকর্তা বদলালেই সিন্ডিকেট পুরোপুরি ভেঙে যাবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ অনিয়মের সঙ্গে যদি দালাল, অফিসের অন্যান্য কর্মচারী কিংবা বাইরের কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী যুক্ত থাকে, তাহলে শুধু সাব-রেজিস্ট্রার পরিবর্তন করে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।

এ কারণে নতুন কর্মকর্তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের কার্যক্রম কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, সেটিই হবে এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, লটারির মাধ্যমে পদায়ন পাওয়া কর্মকর্তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, তা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিংয়ের আওতায় রাখা হবে। এই নজরদারি বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়,
তার ওপরও উদ্যোগটির সাফল্য অনেকটা নির্ভর করবে।

কারণ পদায়নের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হলেও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনিয়ম হলে লটারির উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। একইভাবে একজন কর্মকর্তা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, দালালদের প্রভাব থেকে মুক্ত আছেন কি না এবং নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় সেবাগ্রহীতারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন কি না এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

আইনমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, উদ্যোগটি শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। পর্যায়ক্রমে দেশের যেসব জায়গাকে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং যেখানে দুর্নীতির শিকড় গজানোর অভিযোগ রয়েছে, সেসব জায়গায়ও পদায়নে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বর্তমানে সারা দেশে ৩৭২ জন সাব-রেজিস্ট্রার কর্মরত আছেন। এর বাইরে প্রায় ১৩৯টি পদ শূন্য রয়েছে। ‘এ’ ক্যাটাগরির সাব-রেজিস্ট্রারের সংখ্যা ১৩১ জন। তাদের মধ্য থেকেই এবার ঢাকার ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনের জন্য ১৮ জনকে লটারিতে নির্বাচিত করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ের ভূমি কর্মকর্তাদের পদায়নে সাম্প্রতিক সময়েও লটারি পদ্ধতির নজির রয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে ঢাকার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ১২ জন কানুনগোকে লটারির মাধ্যমে পদায়ন করা হয়। এর মাধ্যমে কর্মকর্তাদের পদায়নে ব্যক্তিগত তদবিরের সুযোগ কমিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

এর আগে কানুনগো ও উপ-সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তাদের বদলির ক্ষেত্রেও লটারি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১৯ সালে কয়েক শ কর্মকর্তাকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়। তখন ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বদলি প্রক্রিয়ায় তদবির বাণিজ্য বন্ধের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাব-রেজিস্ট্রার, কানুনগো, উপ-সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা এবং মাঠপর্যায়ের ভূমি কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়নে লটারি স্বচ্ছতা আনার একটি পদ্ধতি হতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে ভূমি অফিসের কার্যক্রম আরও বেশি ডিজিটালাইজেশন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে একাধিক স্তরের নজরদারি এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত ও নিষ্পত্তি জরুরি। এতে পদায়নের ক্ষেত্রে তদবিরের সুযোগ কমানোর পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় রাখা সম্ভব হবে।

এছাড়াও লটারির মাধ্যমে পদায়নকে একটি প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এর সঙ্গে ডিজিটাল সেবা, নিয়মিত অডিট, অভিযোগ যাচাই এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা যুক্ত হলে ভূমি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী হবে। ফলে লটারির উদ্যোগের মূল সাফল্য শুধু কে কোথায় পোস্টিং পেলেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং নতুন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা কতটা নিরপেক্ষ, সেবামুখী ও জবাবদিহিমূলক থাকছেন, সেটিও হয়ে উঠবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিষয়:১৮ কর্মকর্তা আইনমন্ত্রী পোস্টিংয়ে লটারি সাব রেজিস্ট্রার

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…