কুমিল্লার আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানকে তিন দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
রোববার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই-এর পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম তাকে আদালতে হাজির করলে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল আমান এই নির্দেশ দেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মামলার অন্য দুই প্রধান সন্দেহভাজন সার্জেন্ট জাহিদ ও সৈনিক শাহীন আলমকে গ্রেপ্তারে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বর্তমানে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৫২ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর রহমান তনুকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়ে আসতেন এবং তার মাধ্যমেই তনুর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যাতায়াত শুরু হয়।
পিবিআই কর্মকর্তাদের মতে, হাফিজুর রহমান এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাক্রমের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। যদিও তিনি অত্যন্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং ডিজিএফআই-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় তার কাছ থেকে তথ্য বের করা বেশ জটিল ছিল, তবুও রিমান্ডে তার কাছ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে বলে জানা গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সেসব তথ্যের বিস্তারিত এখনই প্রকাশ করতে রাজি হননি কর্মকর্তারা।
এদিকে মামলার অপর দুই সন্দেহভাজন সার্জেন্ট জাহিদ ও সৈনিক শাহীন আলমের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। পিবিআই ধারণা করছে, তাদের মধ্যে একজন ইতিমধ্যে দেশের বাইরে চলে গেছেন এবং অন্যজন দেশেই আত্মগোপনে আছেন। দেশে থাকা অভিযুক্তকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে বিশেষ দল।
তবে এই দুইজনের নাম নিয়ে তনুর পরিবার ও তদন্ত সংস্থার মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। তনুর বাবার দাবি, অভিযুক্ত সৈনিকের নাম জাহিদ; কিন্তু পিবিআই-এর তদন্তে শাহীন আলম নামে এক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শাহীন ও জাহিদ দুজন সম্পূর্ণ আলাদা ব্যক্তি এবং তদন্তের মাধ্যমেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রিমান্ডে প্রাপ্ত তথ্যগুলো যাচাইবাছাই করে পরে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম বলেন, রিমান্ডে আমরা আসামিকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো এখন যাচাইবাছাই করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে সবকিছু এই মুহূর্তে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এছাড়া তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এর আগে, গত বুধবার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোমিনুল হকের আদালত হাফিজুর রহমানের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে পিবিআইয়ের একটি দল অভিযান চালিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ ১০ বছর পর এই মামলায় এটিই প্রথম কোনো গ্রেপ্তার নতুন করে আলোচনায় এনেছে তনু হত্যাকাণ্ডকে।
এই মামলার মূল ভরসা এখন ডিএনএ রিপোর্ট। ২০১৭ সালে সিআইডির পরীক্ষায় তনুর পোশাক থেকে তিনজন পুরুষের ডিএনএ নমুনার অস্তিত্ব মিলেছিল। বর্তমানে আদালতের অনুমতি নিয়ে হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, যা ক্রস ম্যাচিংয়ের জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই মামলার পরবর্তী মোড় নির্ধারিত হবে।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ এপ্রিল মামলার সপ্তম তদন্ত কর্মকর্তা তিন সন্দেহভাজন-অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান এবং সৈনিক শাহিনুল আলমের ডিএনএ নমুনা ক্রস-ম্যাচ করার জন্য আদালতের অনুমতি চান। আদালতের নির্দেশনার পর তদন্তে গতি আসে এবং পরে গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রক্রিয়ায় বয়েছে। এ পর্যন্ত চারটি সংস্থার সাতজন তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটি পরিচালনা করেছেন। ইতিমধ্যে অন্তত ৮০টি ধার্য তারিখ পার হলেও হত্যাকাণ্ডের মূলবহস্য উদঘাটনে দীর্ঘ সময় ধরে অগ্রগতি ছিল না।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতর টিউশনি শেষে ফেরার পথে তনুর লাশ উদ্ধার করা হয়।
দীর্ঘ সময় পর বর্তমান সরকারের আমলে সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার ও ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও সাধারণ মানুষ।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি কাইমুল হক রিংকু বলেন, দীর্ঘদিন এই মামলা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হলেও এখন প্রমাণিত হচ্ছে যে আইন সবার জন্য সমান। দ্রুত ডিএনএ প্রতিবেদনের মাধ্যমে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত খুনিরা শনাক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এক দশক পর এসে প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার ও ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ মামলাটিকে নতুন মোড় দিয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পলাতক দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ডিএনএ রিপোর্টই মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টদের আশা, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর এবার এই মামলার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন হবে।








